১২:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সহসাই হচ্ছে না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

* বাংলাদেশে এ পর্যন্ত শরণার্থী হিসেবে রয়েছে ২২ লাখ রোহিঙ্গা
* বারবার আশ্বাস দিলেও কূটচালে অনাগ্রহী মিয়ানমার
* ভেস্তে যায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলের ৩ দফা উগ্যোগ
* অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আলোচনা করলেও হয়নি সুরাহা

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার কখনোই আগ্রহ দেখায়নি। জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক মনে করছে না। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধানের মাধ্যম’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনীর নির্মম অত্যাচার-জুলুম নিপীড়নে রাখাইন রাজ্যের নিজ ভূমি ছেড়ে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে ১৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। মানবিক কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দিয়েছিল। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আয়োজিত বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। রোহিঙ্গার জনস্রোত ঠেকাতে শেখ হাসিনার সরকার পরবর্তীতে কঠোর হলেও নানা কৌশলে দেশের টেকনাফ-বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা এ দেশে প্রবেশ করতে থাকে। এরপর ঝুঁকি এড়াতে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা নোয়াখালীন হাতিয়া উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল ‘ভাসানচর’ দ্বীপে এ স্থানান্তর করেছে। কিন্তু গেল আট দশক ধরে নির্বাসন ও প্রত্যাবাসনের চক্রেই আটকা পড়ে আছে রোহিঙ্গারা। সবশেষ, অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে এক বৈঠকের মাধ্যমে যে আশার আলো দেখা গিয়েছিল তা-ও নতুন বাস্তবতায় ফিকে হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল বলছেন, মিয়ানমার সরকারের রাজনৈতিক কূটচালে সহসাই হচ্ছে না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। তার মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনে মিয়ানমার কখনোই আগ্রহ দেখায়নি। জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক মনে করছে না। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধানের মাধ্যম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনী দেশটির অভ্যন্তরে রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। পুড়িয়ে ও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন স্থাপনা। সামরিক জান্তা বাহিনীর নির্মম অত্যাচার ও জুলুম-নিপীড়ণে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ-উখিয়া-কুতুপালং ও বান্দবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। তখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনুরোধে মানবিক কারণে শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন। পরবর্তীতে তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় শরণার্থী শিবিরে রাখা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ক্রমেই বাড়তে থাকে রোহিঙ্গাদের ঢল।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দ্বারা শুরু হওয়া গণহত্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রায় ৬ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ৭ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর বিগত তিন দশক ধরে মিয়ানমার সরকারের সহিংস নির্যাতন থেকে ৩ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে অবস্থান নেয়। এ মুহূর্তে কক্সবাজারে সব মিলিয়ে অন্তত ২২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া, ভারতের হায়দ্রাবাদের রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, ফলে মিয়ানমারের মতো তারাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।
তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ৭৩তম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, বাংলাদেশে এখন ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সাম্প্রতিক জনসংখ্যার উপচেপড়া ভিড় তার পরিকাঠামোয় এক চাপ সৃষ্টি করেছে। শরণার্থীদের পরিষেবা, শিক্ষা, খাদ্য, পরিষ্কার জল এবং সঠিক স্যানিটেশনের অ্যাক্সেসের অভাব রয়েছে। তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সংক্রামক রোগ সংক্রমণেও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রাও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এর মধ্যে বিগত শেখ হাসিনার সরকারের শাসনামলেই নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা দুর্গম চরাঞ্চল ভাষানটেক দ্বীপে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে সব সুযোগ-সুবিধাদিসহ স্থানান্তর করা হয়।
তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তালিকা ২০১৮ সালেই পাঠানো হয়েছে। এরপর মিয়ানমার সরকার ১ লাখ ৮০ হাজারের ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করে ফেরত নেওয়ার কথা জানায়। কিন্তু প্রত্যাবাসন নিয়ে ২০১৮, ১৯ ও ২৩ সালের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার জনকে প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করেছে। সবশেষ ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে মিয়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ থান শিউ নিশ্চিত করেছেন।
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ছয় দফায় বাংলাদেশ মিয়ানমারকে ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা প্রদান করেছিল। এর মধ্যে থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার চিহ্নিত করেছে।
এছাড়াও আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই চলছে। তাদের ছবি এবং নামের অতিরিক্ত যাচাই করা হচ্ছে। বাকি ৫ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার যাচাই-বাছাই দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার আশ্বাসও দিয়েছে মিয়ানমার। দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ওই বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি মিয়ানমারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং দুর্যোগে আক্রান্তদের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কিন্তু অদ্যবধি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কোনো সুরাহাই হয়নি।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন নিয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
তিনি বলেন, মিয়ারমার সরকার যে ১ লাখ ৮০ হাজারে রোহিঙ্গা নেবে বলেছে- এটাই অগ্রগতি, এর বাহিরে আর কোনো প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়নি। তাদের তরফ থেকেও আর কোনো প্রক্রিয়া দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনে মিয়ানমান কখনও আগ্রহ দেখায়নি। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক মনে করছে না। তাদের কোনো সৎ মনোভাবও নেই। এটি তাদের রাজনৈতিক কূট কৌশল। রোহিঙ্গাদের জন্য আস্থার জায়াগ তৈরি করতে না পারায় বাংলাদেশের চেষ্টার পরও প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধানের মাধ্যম। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হলে এটি হবে পৃথিবীর প্রথম ঘটনা। তবে এটি পাহাড় সমান একটি কঠিন কাজ বলেও মনে করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

জনপ্রিয় সংবাদ

আজ শেষ হচ্ছে আপিল শুনানি, কাল প্রার্থিতা প্রত্যাহার

সহসাই হচ্ছে না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

আপডেট সময় : ০৮:০৫:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ জুন ২০২৫

* বাংলাদেশে এ পর্যন্ত শরণার্থী হিসেবে রয়েছে ২২ লাখ রোহিঙ্গা
* বারবার আশ্বাস দিলেও কূটচালে অনাগ্রহী মিয়ানমার
* ভেস্তে যায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলের ৩ দফা উগ্যোগ
* অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আলোচনা করলেও হয়নি সুরাহা

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার কখনোই আগ্রহ দেখায়নি। জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক মনে করছে না। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধানের মাধ্যম’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনীর নির্মম অত্যাচার-জুলুম নিপীড়নে রাখাইন রাজ্যের নিজ ভূমি ছেড়ে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে ১৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। মানবিক কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দিয়েছিল। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আয়োজিত বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। রোহিঙ্গার জনস্রোত ঠেকাতে শেখ হাসিনার সরকার পরবর্তীতে কঠোর হলেও নানা কৌশলে দেশের টেকনাফ-বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা এ দেশে প্রবেশ করতে থাকে। এরপর ঝুঁকি এড়াতে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা নোয়াখালীন হাতিয়া উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল ‘ভাসানচর’ দ্বীপে এ স্থানান্তর করেছে। কিন্তু গেল আট দশক ধরে নির্বাসন ও প্রত্যাবাসনের চক্রেই আটকা পড়ে আছে রোহিঙ্গারা। সবশেষ, অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে এক বৈঠকের মাধ্যমে যে আশার আলো দেখা গিয়েছিল তা-ও নতুন বাস্তবতায় ফিকে হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল বলছেন, মিয়ানমার সরকারের রাজনৈতিক কূটচালে সহসাই হচ্ছে না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। তার মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনে মিয়ানমার কখনোই আগ্রহ দেখায়নি। জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক মনে করছে না। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধানের মাধ্যম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনী দেশটির অভ্যন্তরে রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। পুড়িয়ে ও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন স্থাপনা। সামরিক জান্তা বাহিনীর নির্মম অত্যাচার ও জুলুম-নিপীড়ণে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ-উখিয়া-কুতুপালং ও বান্দবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। তখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনুরোধে মানবিক কারণে শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন। পরবর্তীতে তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় শরণার্থী শিবিরে রাখা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ক্রমেই বাড়তে থাকে রোহিঙ্গাদের ঢল।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দ্বারা শুরু হওয়া গণহত্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রায় ৬ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ৭ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর বিগত তিন দশক ধরে মিয়ানমার সরকারের সহিংস নির্যাতন থেকে ৩ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে অবস্থান নেয়। এ মুহূর্তে কক্সবাজারে সব মিলিয়ে অন্তত ২২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া, ভারতের হায়দ্রাবাদের রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, ফলে মিয়ানমারের মতো তারাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।
তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ৭৩তম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, বাংলাদেশে এখন ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সাম্প্রতিক জনসংখ্যার উপচেপড়া ভিড় তার পরিকাঠামোয় এক চাপ সৃষ্টি করেছে। শরণার্থীদের পরিষেবা, শিক্ষা, খাদ্য, পরিষ্কার জল এবং সঠিক স্যানিটেশনের অ্যাক্সেসের অভাব রয়েছে। তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সংক্রামক রোগ সংক্রমণেও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রাও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এর মধ্যে বিগত শেখ হাসিনার সরকারের শাসনামলেই নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা দুর্গম চরাঞ্চল ভাষানটেক দ্বীপে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে সব সুযোগ-সুবিধাদিসহ স্থানান্তর করা হয়।
তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তালিকা ২০১৮ সালেই পাঠানো হয়েছে। এরপর মিয়ানমার সরকার ১ লাখ ৮০ হাজারের ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করে ফেরত নেওয়ার কথা জানায়। কিন্তু প্রত্যাবাসন নিয়ে ২০১৮, ১৯ ও ২৩ সালের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার জনকে প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করেছে। সবশেষ ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে মিয়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ থান শিউ নিশ্চিত করেছেন।
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ছয় দফায় বাংলাদেশ মিয়ানমারকে ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা প্রদান করেছিল। এর মধ্যে থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার চিহ্নিত করেছে।
এছাড়াও আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই চলছে। তাদের ছবি এবং নামের অতিরিক্ত যাচাই করা হচ্ছে। বাকি ৫ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার যাচাই-বাছাই দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার আশ্বাসও দিয়েছে মিয়ানমার। দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ওই বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি মিয়ানমারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং দুর্যোগে আক্রান্তদের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কিন্তু অদ্যবধি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কোনো সুরাহাই হয়নি।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন নিয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
তিনি বলেন, মিয়ারমার সরকার যে ১ লাখ ৮০ হাজারে রোহিঙ্গা নেবে বলেছে- এটাই অগ্রগতি, এর বাহিরে আর কোনো প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়নি। তাদের তরফ থেকেও আর কোনো প্রক্রিয়া দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনে মিয়ানমান কখনও আগ্রহ দেখায়নি। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক মনে করছে না। তাদের কোনো সৎ মনোভাবও নেই। এটি তাদের রাজনৈতিক কূট কৌশল। রোহিঙ্গাদের জন্য আস্থার জায়াগ তৈরি করতে না পারায় বাংলাদেশের চেষ্টার পরও প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধানের মাধ্যম। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হলে এটি হবে পৃথিবীর প্রথম ঘটনা। তবে এটি পাহাড় সমান একটি কঠিন কাজ বলেও মনে করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।