১২:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ক্ষুধা পেলেই কেন রেগে যাই? ‘হ্যাংরি’ হওয়ার পেছনের বিজ্ঞান কি বলে?

অফিসে দীর্ঘ মিটিং চলছে। দুপুর পেরিয়ে গেছে। একজন সহকর্মী হঠাৎ বিরক্ত হয়ে উঠছেন, কথা কাটাকাটি করছেন। অথচ আরেকজন একই পরিস্থিতিতেও শান্ত। দুজনেরই পেট খালি—তবু পার্থক্য কেন?

আমরা প্রায়ই বলি, ক্ষুধা পেয়েছে বলেই এমন করছে। এ থেকেই এসেছে জনপ্রিয় শব্দ ‘হ্যাংরি’ (Hungry + Angry)। শব্দটি মজার হলেও এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্ক, শরীর ও আবেগের জটিল সম্পর্ক।

‘হ্যাংরি’ শব্দের ইতিহাস

মানুষ বহুদিন ধরেই ক্ষুধা আর রাগের সম্পর্ক বুঝলেও “হ্যাংরি” শব্দটি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে জায়গা পেয়েছে মাত্র ২০১৮ সালে। আশ্চর্যের বিষয়, ক্ষুধা কীভাবে আমাদের মুড বদলায়—তা নিয়ে গবেষণা খুবই সীমিত।

শুধু রক্তে শর্করা কমলেই রাগ?

দীর্ঘদিন ধারণা ছিল, রক্তে শর্করা কমে গেলেই মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

গবেষণায় ৯০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে এক মাস ধরে কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর লাগানো হয়। একই সঙ্গে তারা দিনে দুবার জানাতেন—তারা কতটা ক্ষুধার্ত এবং তাদের মেজাজ কেমন।

গবেষণার চমকপ্রদ ফল

দেখা গেছে, রক্তে শর্করা কম থাকলেই সবার মেজাজ খারাপ হয়নি। বরং যাঁরা নিজেরা বুঝতে পেরেছেন যে তারা ক্ষুধার্ত, তারাই বেশি বিরক্ত বা খারাপ মুডে ছিলেন।

অর্থাৎ ক্ষুধা আর রাগের মাঝখানে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ধাপ—ইন্টারোসেপশন
ইন্টারোসেপশন হলো নিজের শরীরের ভেতরের সংকেত—ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি—কতটা স্পষ্টভাবে আমরা বুঝতে পারি।

মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে?

ক্ষুধার সংকেত প্রথম ধরা পড়ে হাইপোথ্যালামাসে। এরপর ইনসুলা নামের মস্তিষ্কের অংশ আমাদের জানায়—“ক্ষুধা লেগেছে।” এই ইনসুলাই আবার আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও জড়িত।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারোসেপশন ভালো, তারা ক্ষুধার্ত হলেও আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। খিদে পেলেও তারা হঠাৎ রেগে যায় না।

ক্ষুধাজনিত মেজাজ বদলের প্রভাব

ক্ষুধাজনিত রাগ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ে—

  • পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কে

  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়

  • অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি ঝোঁকে

দীর্ঘদিন শরীরের সংকেত উপেক্ষা করলে মানসিক চাপ বাড়ে এবং শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি

ছোট শিশুরা শরীরের সংকেত ঠিকমতো বুঝতে পারে না। খেলাধুলা বা উত্তেজনায় তারা ক্ষুধা টের পায় না। ফলাফল—হঠাৎ কান্না, রাগ বা জেদ। আধুনিক জীবনে ব্যস্ত বড়দের অবস্থাও অনেকটা এমনই।

কীভাবে ‘হ্যাংরি’ হওয়া এড়াবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—

  • নির্দিষ্ট সময় অন্তর খাবার খাওয়া

  • ক্ষুধার প্রাথমিক সংকেত খেয়াল করা

  • পর্যাপ্ত পানি পান করা

  • অতিরিক্ত কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি নেওয়া

এই অভ্যাসগুলো শরীর ও মনের সংযোগকে শক্ত করে।

শেষ কথা

সব মুড খারাপের পেছনে ক্ষুধা দায়ী নয়। তবে একটু সচেতন হলেই অনেক অপ্রয়োজনীয় রাগ, বিরক্তি আর ভুল সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব।

জনপ্রিয় সংবাদ

আপিল শুনানির অষ্টম দিনে ৪৫ আবেদন মঞ্জুর করল ইসি

ক্ষুধা পেলেই কেন রেগে যাই? ‘হ্যাংরি’ হওয়ার পেছনের বিজ্ঞান কি বলে?

আপডেট সময় : ১০:৩৯:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

অফিসে দীর্ঘ মিটিং চলছে। দুপুর পেরিয়ে গেছে। একজন সহকর্মী হঠাৎ বিরক্ত হয়ে উঠছেন, কথা কাটাকাটি করছেন। অথচ আরেকজন একই পরিস্থিতিতেও শান্ত। দুজনেরই পেট খালি—তবু পার্থক্য কেন?

আমরা প্রায়ই বলি, ক্ষুধা পেয়েছে বলেই এমন করছে। এ থেকেই এসেছে জনপ্রিয় শব্দ ‘হ্যাংরি’ (Hungry + Angry)। শব্দটি মজার হলেও এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্ক, শরীর ও আবেগের জটিল সম্পর্ক।

‘হ্যাংরি’ শব্দের ইতিহাস

মানুষ বহুদিন ধরেই ক্ষুধা আর রাগের সম্পর্ক বুঝলেও “হ্যাংরি” শব্দটি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে জায়গা পেয়েছে মাত্র ২০১৮ সালে। আশ্চর্যের বিষয়, ক্ষুধা কীভাবে আমাদের মুড বদলায়—তা নিয়ে গবেষণা খুবই সীমিত।

শুধু রক্তে শর্করা কমলেই রাগ?

দীর্ঘদিন ধারণা ছিল, রক্তে শর্করা কমে গেলেই মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

গবেষণায় ৯০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে এক মাস ধরে কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর লাগানো হয়। একই সঙ্গে তারা দিনে দুবার জানাতেন—তারা কতটা ক্ষুধার্ত এবং তাদের মেজাজ কেমন।

গবেষণার চমকপ্রদ ফল

দেখা গেছে, রক্তে শর্করা কম থাকলেই সবার মেজাজ খারাপ হয়নি। বরং যাঁরা নিজেরা বুঝতে পেরেছেন যে তারা ক্ষুধার্ত, তারাই বেশি বিরক্ত বা খারাপ মুডে ছিলেন।

অর্থাৎ ক্ষুধা আর রাগের মাঝখানে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ধাপ—ইন্টারোসেপশন
ইন্টারোসেপশন হলো নিজের শরীরের ভেতরের সংকেত—ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি—কতটা স্পষ্টভাবে আমরা বুঝতে পারি।

মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে?

ক্ষুধার সংকেত প্রথম ধরা পড়ে হাইপোথ্যালামাসে। এরপর ইনসুলা নামের মস্তিষ্কের অংশ আমাদের জানায়—“ক্ষুধা লেগেছে।” এই ইনসুলাই আবার আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও জড়িত।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারোসেপশন ভালো, তারা ক্ষুধার্ত হলেও আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। খিদে পেলেও তারা হঠাৎ রেগে যায় না।

ক্ষুধাজনিত মেজাজ বদলের প্রভাব

ক্ষুধাজনিত রাগ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ে—

  • পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কে

  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়

  • অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি ঝোঁকে

দীর্ঘদিন শরীরের সংকেত উপেক্ষা করলে মানসিক চাপ বাড়ে এবং শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি

ছোট শিশুরা শরীরের সংকেত ঠিকমতো বুঝতে পারে না। খেলাধুলা বা উত্তেজনায় তারা ক্ষুধা টের পায় না। ফলাফল—হঠাৎ কান্না, রাগ বা জেদ। আধুনিক জীবনে ব্যস্ত বড়দের অবস্থাও অনেকটা এমনই।

কীভাবে ‘হ্যাংরি’ হওয়া এড়াবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—

  • নির্দিষ্ট সময় অন্তর খাবার খাওয়া

  • ক্ষুধার প্রাথমিক সংকেত খেয়াল করা

  • পর্যাপ্ত পানি পান করা

  • অতিরিক্ত কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি নেওয়া

এই অভ্যাসগুলো শরীর ও মনের সংযোগকে শক্ত করে।

শেষ কথা

সব মুড খারাপের পেছনে ক্ষুধা দায়ী নয়। তবে একটু সচেতন হলেই অনেক অপ্রয়োজনীয় রাগ, বিরক্তি আর ভুল সিদ্ধান্ত এড়ানো সম্ভব।