- সিসা দূষণে বিপন্ন হচ্ছে কৃষিকাজ, শিশুস্বাস্থ্য, জনজীবন
- ব্যাটারি শিল্প ও দূষণে ঝুঁকিতে কোটি শিশুর জীবন
- শিশুর শারীরিক-মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
- অভ্যন্তরীণ ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ে সিসার ভয়াবহ বিস্তার
‘সিসার মতো নিরব দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর কারণে পুষ্টির অভাব, অপুষ্টি এবং এমনকি মস্তিষ্কের বিকাশেও সমস্যা হয়।’ – ড. তাহমিদ আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, আইসিডিডিআর,বি
বাংলাদেশে সিসা দূষণ এখন কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, এটি পরিণত হয়েছে জনস্বাস্থ্যের গভীর সংকটে। দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু উচ্চমাত্রার সিসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত যা দক্ষিণ এশিয়ায় মোট আক্রান্ত শিশুর ৬০ শতাংশ। এই সংকটের মূল উৎস দুইটি: ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও ভেজাল হলুদ গুঁড়া। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিকাজ, শিশুস্বাস্থ্য, জনজীবনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত এই সমস্যার বিস্তার রোধ করা না গেলে সিসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা তিন থেকে চারগুণ বাড়বে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বাংলাদেশের শহর ও গ্রামজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এই যানে ব্যবহৃত ব্যাটারির চাহিদা মেটাতে অনানুষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত রিসাইক্লিং কারখানার সংখ্যা বেড়ে চলেছে। একটি গবেষণা অনুসারে, দেশে এ ধরনের অন্তত ২৬৫টি অননুমোদিত কারখানা রয়েছে, যারা পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে খোলা আকাশের নিচে সিসা গলিয়ে তা পুনঃব্যবহার করে। এর ফলে বায়ু, পানি ও মাটি দূষণের শিকার হয়। শিশু জুনায়েদ আকতার, যার শরীরের সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। ১২ বছর বয়সী জুনায়েদ দেখতে অনেকটাই ছোট, মানসিকভাবে দুর্বল, পড়াশোনায় আগ্রহহীন এবং আচরণগত সমস্যায় আক্রান্ত। স্থানীয়রা জানান, কারখানার ধোঁয়া ও অ্যাসিডযুক্ত বর্জ্যে শুধু মানুষ নয়, গাছপালা, পশুপাখি ও কৃষিজমিও আক্রান্ত হয়েছে।
ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের বাজারটি ছোট নয়। বাংলাদেশের ৪০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং বৈদ্যুতিক মোটর সংযুক্ত অন্যান্য যানবাহনের ব্যাটারি ও মোটরের বাজারের পরিমাণ সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে আছে নীরব স্বাস্থ্য বিপর্যয়। এদিকে আরেক বড় সিসার উৎস ছিল ভেজাল হলুদের গুঁড়া। রঙ ও দৃশ্যমান মান বাড়ানোর জন্য লেড ক্রোমেট নামক সিসা-যুক্ত উপাদান মেশানো হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এর গবেষণার ভিত্তিতে সরকারের হস্তক্ষেপে এ আমদানি বন্ধ হলে হলুদের ভেতর সিসার উপস্থিতি ২৭ শতাংশ থেকে শূন্য শতাংশে নেমে আসে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
সিসা বিষক্রিয়া শুধু শরীরকে দুর্বল করে না, এটি শিশুর মানসিক বিকাশ, বুদ্ধিমত্তা ও স্নায়ুবিক স্বাস্থ্যের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিসার কারণে শিশুদের মধ্যে রক্তাল্পতা, বামনত্ব এবং আজীবন স্নায়ুজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের ফলে কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে ১৫ শতাংশ হিট এক্সেনশন ও ১০ শতাংশ হিট স্ট্রোকের ঘটনা ঘটছে। আইসিডিডিআর,বি এক অনুষ্ঠানে জানায়, ইটভাটার ধোঁয়া কমাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে কয়লার ব্যবহার ২৩ শতাংশ এবং কার্বন ও বায়ুদূষণ ২০ শতাংশ কমেছে। যদিও এটি একটি ইতিবাচক দিক, সারা দেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত সীমিত।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, এভাবে চলতে থাকলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি জাতীয় অর্থনীতির প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের শক্ত অবস্থান নেওয়া জরুরি। কঠোর আইন প্রয়োগ, অনানুষ্ঠানিক কারখানাগুলোকে বৈধ কাঠামোর মধ্যে আনা এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির প্রচলন ছাড়া এই দুর্দশা বন্ধ সম্ভব নয়। জনসচেতনতা বাড়ানো, প্লাস্টিক ও সিসাযুক্ত পণ্যের বিকল্প ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ দেওয়া এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যবান ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মুহাম্মদ আনোয়ার সাদাত সতর্ক করে বলেন, দেশ এই সমস্যার ব্যাপকতা উপেক্ষা করতে পারে না। তিনি বলেন, যদি আমরা কিছু না করি। আগামী দুই বছরে (সিসা বিষক্রিয়ায়) আক্রান্তের সংখ্যা তিন থেকে চারগুণ বাড়বে। আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, আমাদের গবেষণা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা আবর্জনার স্তূপ এবং সিসার মতো নিরব দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর কারণে পুষ্টির অভাব, অপুষ্টি এবং এমনকি মস্তিষ্কের বিকাশেও সমস্যা হয়। তাই মানুষের ভালো থাকার জন্য এসব পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি।

























