- দেশীয় উদ্যোগ ও কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা
- বাস্তবায়নে ৩ লাখ পরিবার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে
- সরকারের দাবি গ্রাহকের খরচ কমাতে নতুন নীতিমালা
গত এপ্রিলে সরকার টেলিযোগাযোগ খাতের টেলিযোগাযোগ খাতের লাইসেন্স কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের জন্য টলিকম নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং রেজিম রিফর্ম পলিসি-২০২৫-এর খসড়া প্রকাশ করে। উদ্দেশ্য ছিল খাতকে আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও সুরক্ষার পাশাপাশি সাশ্রয়ী করা। তবে খসড়া প্রকাশের কিছু দিনের মধ্যেই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। ছোট-স্থানীয় অপারেটর থেকে বিএনপিসহ রাজনৈতিক মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যার অন্যতম কারণ দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বাধার মুখে পড়বে, আর গ্রাহক উপকৃত হবে কতটুকু, সেটাও নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
খসড়ায় টেলিকম খাতের লাইসেন্স কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এক্ষেত্রে সেলুলার মোবাইল সার্ভিস ও ফিক্সড টেলিকম সার্ভিসের জন্য পৃথক একটি অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রোভাইডার (এএনএসপি) লাইসেন্স দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এএনএসপিগুলো গ্রাহক পর্যায়েও সেবা দেয়ার জন্য দায়বদ্ধ থাকবে। জাতীয় পর্যায়ে অবকাঠামো ও ট্রান্সমিশন সেবা যেমন ফাইবার, টাওয়ার ও নেটওয়ার্ক ট্রান্সমিশন পরিচালনার জন্য ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (এনআইসিএসপি) লাইসেন্স দেয়া হবে। আন্তর্জাতিক ভয়েস, ইন্টারনেট ও ডাটা সংযোগের জন্য নিতে হবে ইন্টারন্যাশনাল কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (আইসিএসপি) লাইসেন্স। স্যাটেলাইট, নন-টিরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্কস (এনটিএন) ও হাই-অলটিটিউড প্লাটফর্মস (এইচএপি) ভিত্তিক সেবার জন্য নন-টিরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্কস অ্যান্ড সার্ভিস প্রোভাইডার (এনটিএনএসপি) লাইসেন্স নিতে হবে। তাছাড়া এসএমএস এগ্রিগেটর, ওটিটি ইত্যাদি সেবার জন্য টেলিকম এনাবলড সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে হবে। নতুন এ পলিসি কার্যকর হওয়ার পর আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্স, এনআইএক্স, এমএনপি লাইসেন্সগুলো ধীরে ধীরে বাতিল হয়ে যাবে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা করতে হলে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নতুন কাঠামো অনুসারে লাইসেন্স নিতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এ পলিসি বাস্তবায়ন হলে দেশে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানকারী ২৩টি আইজিডব্লিউ এবং আন্তঃঅপারেটর সেবাদানকারী ২৪টি আইসিএক্স প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অথচ আইসিএক্স অপারেটররা তাদের আয়ের অর্ধেকই সরকারকে দেয়। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরকার রাজস্বও পায়। নতুন পলিসি অনুসারে এটি স্থানান্তরিত হয়ে চলে যাবে মোবাইল অপারেটরদের কাছে। এতে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাবে স্থানীয় এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসাও। কর্মহীন হয়ে পড়বে কয়েক লাখ লোক। তাছাড়া টেলিকম খাতে ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন এ খাতের জন্য সহায়ক নয় বলেও মনে করছেন তারা।
প্রস্তাবিত এ পলিসিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি মালিকানার সীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে এএনএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ বিদেশি মালিকানা থাকতে পারবে। এনআইসিএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ বিদেশি মালিকানার সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আইসিএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদেশি মালিকানার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ। নতুন এ পলিসিতে মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমভিএনও) চালুর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি এসএমপি (সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার) প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে সেজন্য এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া ব্যয় কমানো ও সেবার পরিধি বাড়াতে অবকাঠামো ভাগাভাগি করা হয়েছে বাধ্যতামূলক। এ পলিসি অনুসারে সাইবার নিরাপত্তা আইন, জাতীয় তথ্য আইন ও ডাটা সুরক্ষা নীতিমালা মেনে চলতে হবে। আইনি অনুমোদনের ভিত্তিতে আড়িপাতার সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে এতে। শুধু শহরে সেবা চালুর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে গ্রাম ও অনুন্নত এলাকায়ও সেবা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ভর্তুকি, ছাড় ও বিশেষ তহবিলের সুবিধা পাওয়া যাবে।
টেলিকম পলিসির খসড়া প্রকাশ হওয়ার পরই এ বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগ জানায় অ্যাসোসিয়েশন অব আইসিএক্স অপারেটরস অব বাংলাদেশ। সংগঠনটির মতে, এ নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ খাতের সহস্রাধিক প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যমান আইএলডিটিএস নীতিমালার আওতায় গড়ে ওঠা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত টিকে থাকতে পারবে না। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রণ মূলত বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাবে। যার ফলে ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করে বিদেশি কোম্পানিগুলোর নির্ভরতা কমানোর আর কোনো সুযোগ থাকবে না।
খসড়া নীতিমালার সম্ভাব্য সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের দিক তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বৃহস্পতিবার বলেন, একাধিক সেবা খাতে মালিকানা রাখার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে বড় মোবাইল অপারেটররা একাধিক খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা কমে যাবে এবং ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে পড়বে। এসএমই আর্থিক সংকটে পড়বে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ডি-রেগুলেশনের (নিয়ন্ত্রণ শিথিল) পর এসএমই, বিশেষ করে স্থানীয় আইএসপি বা ছোট টেলিকম অপারেটরদের সম্পদ ও দায়বদ্ধতা নিয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় তারা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। বিদেশি মালিকানার সীমা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে, যা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং এ খাতের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে পারে। এছাড়া ক্রস-ওনারশিপের (যৌথ মালিকানা) ফাঁকফোকরে বড় কোম্পানিগুলো আরো বাজার দখল করে নিতে পারে। এ ধরনের জাতীয় পর্যায়ের টেলিকম নীতি প্রণয়নে অবশ্যই সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। নীতিতে নতুন প্রযুক্তির বিষয়ে দিকনির্দেশনা নেই বলেও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড বা নতুন ডিজিটাল সেবা নিয়ে নীতিতে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, যা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করতে পারে। এন্টারপ্রাইজ সার্ভিসের সীমা অস্পষ্ট। মোবাইল অপারেটরদের ফাইবারভিত্তিক ব্যবসা সংযোগ সেবার সীমাবদ্ধতা কোথায়, তা নীতিমালায় স্পষ্ট নয়। ফলে বিবাদ ও অসাম্য তৈরি হতে পারে।’
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, আমরা আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার চাই। বিএনপি চায়, টেকনোলজি সামনের দিকে যাবে কিন্তু তার সুফলটা যেন জনগণ পায়। এখানে বড় মোবাইল অপারেটররা বিরাট সুবিধা পাবে। আর যারা বাংলাদেশের ভেতরে বড় রকমের বিনিয়োগ করতে পারবে, তারা সুবিধা পাবে। সুবিধার লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক সমাজের সাধারণ মানুষ যাতে সুফলটা পায়। কিন্তু আমরা যতটুকু জানি, প্রস্তাবিত নীতিমালায় তা অনুপস্থিত। আমরা এমন নীতিমালা করব, যে নীতিমালার সুফল দেশের মানুষ পায়।
এবিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব একটি গণমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের বিষয়ে মতামত দিচ্ছে এটিকে স্বাগত জানাই। তবে দলগুলোর নীতিসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে যারা কাজ করেন তাদেরকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছিল কিন্তু তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মতামত দেননি। সম্ভবত কোনো গোষ্ঠী প্রভাবিত করে বিএনপি মহাসচিবকে দিয়ে একটি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, যার সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্ক কম। বিনিয়োগে সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে এফডিআই প্রবাহে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে বিদেশিরা আমাদের কাছে অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন যে সবকিছু বিদেশিদের দিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে এখানে প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে যে কোনো পক্ষই সঠিক না, বরং আমরা একটি মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছি।
সারা বিশ্বে একটি প্রতিষ্ঠানকে সবকিছু করতে দেয়া হলেও মনোপলি হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় বাংলাদেশে এ ধরনের কিছু করা হচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তিনি বলেন, পলিসিতে আমরা বলেছি যে যারা সেলুলার সেবা দেবে তারা এনটিটিএন সেবা দিতে পারবে না। এনটিটিএন সেবা দিতে হলে নতুন প্রতিষ্ঠান লাগবে এবং নতুনভাবে শনাক্তকৃত এনটিএন লাগবে, এটি পলিসিতে বলা আছে। এসএমইদের ক্ষেত্রে আমরা চাইছি যে লাইসেন্স তুলে দিতে অর্থাৎ স্থানীয় আইএসপি যারা তাদের কোনো লাইসেন্স লাগবে না। জাতীয় পর্যায়ে আইএসপি ব্যবসা করতে হলে তখন লাইসেন্স লাগবে। কিন্তু তারা এটি মানতে চায় না কারণ ব্যাংক ঋণের সঙ্গে লাইসেন্সের সম্পর্ক রয়েছে। আমরা তাদের বলেছি যে একটা লাইট টাচ লাইসেন্স দেয়া হবে যেটিতে টাকা কম লাগবে।
























