০৮:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অপরাধে জড়াচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাকরিচ্যুত-অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা!

প্রতীকি ছবি

  • র‌্যাব-পুলিশ ও সেনা পরিচয়ে ঘটাচ্ছে ছিনতাই-ডাকাতি
  • গত ৮ মাসে রাজধানীতেই ঘটেছে ৪৭টি ডাকাতির ঘটনা
  • তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিভিন্ন বাহিনীর ৩৬ সদস্য ও সোর্সের নাম

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাগত দায়িত্ব পালনে শিথিলতার সুযোগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইসহ সামাজিক অপরাধ বেড়েই চলছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ভুয়া পুলিশের দৌরাত্ম্য। ভুয়া পরিচয়ে ছিনতাই-ডাকাতির নেপথ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা থেকে চারকিচ্যুত ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ভুয়া পরিচয়ধারী সদস্যদের অপরাধের লাগাম টানতে প্রতিনিয়তই হিমশিম খাচ্ছেন। গত ৮ মাসে খোদ রাজধানীতেই ৪৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সাবেক ৩৬ সদস্য ও সোর্সের নাম পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে যোগ বা মদদ দিচ্ছেন বিভিন্ন বাহিনীর বর্তমান সদস্য ও তাদের সোর্সরা। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, এমন ঘটনা কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটেনি, বহু আগ থেকেই হয়ে আসছে। এই শ্রেণির অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা খুবই চ্যালেঞ্জের। তবে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। তবে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, অপরাধী যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে জড়াচ্ছে কিনা তা নজরদারি করা হচ্ছে। এছাড়া অপরাধী ধরতে ভুক্ত ভোগীদের ৯৯৯ এ কল দেওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মেইন গেটের উত্তর পার্শ্বের যাত্রী ছাউনির সামনে অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জন ডাকাত দল মুখোশ পরিহিত দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একটি প্রাইভেট কারের গতিরোধ করে। এরপর তারা অস্ত্রের মুখে মেসার্স এম এম আয়াত ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস’র নগদ ৪ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৪০০ ওমানী রিয়াল, ৩০ কুয়েতী দিনার এবং ১২ হাজার ৩৫০ সংযুক্ত আরব আমিরাত দিরহাম যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ডাকাতি করে নিয়ে যায়। এরপর খবর পেয়ে ডিবি ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশের বেশকিছু সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহের পর বিশ্লেষণ শেষে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ঘটনায় সম্পৃক্ত ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরবর্তীতে জানতে পারে, বেশকিছু দিন ধরেই তারা ডাকাতির নাটক সাজিয়ে আসছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন সন্ধ্যায় রাইড শেয়ার উবার প্রাইভেট কারের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা ভর্তি লাগেজ নিয়ে উত্তরা যাবার পথে তার লাইভ লোকেশন হোয়াটসঅ্যাপে অন্যান্য সহযোগীদের শেয়ার করে রাখে। পূর্বপরিকল্পনা মাফিক অন্যান্য আসামিরা হোয়াটসঅ্যাপ লোকেশনের ভিত্তিতে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মেইন গেটের উত্তর পার্শ্বের যাত্রী ছাউনির সামনে এসে উক্ত প্রাইভেট কারের পথরোধ করে পরস্পর যোগসাজশে উক্ত বিদেশি মুদ্রা ভর্তি লাগেজ নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সকল আসামিরা লুণ্ঠিত বিদেশি মুদ্রাসমূহ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে আত্মগোপনে চলে যায়।
এরপর তার দেওয়ার তথ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তালহা নূর, শারমিন, মো. শাহিন শিকদার, ইয়াসিন আরাফাত, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শুভ হাওলাদারসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তারসহ তাদের নিকট হতে লুন্ঠিত অর্থের ২ লাখ ৬৯ হাজার ২৪০ সৌদি রিয়াল যার বাংলাদেশি টাকায় ৮৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়। এরপর গত ৪ জুলাই গোপন সংবাদে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ডিবি ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার যৌথ দল রাজধানীর গ্রীন রোড, ভোলার চরফ্যাশন এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন, আরিয়ান, সাব্বির হোসেন, জাহিদুল ইসলাম সোহাগ, জয় ও বিজয় নামে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ডাকাতির ঘটনায় লুণ্ঠিত এক লাখ ৩০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারমূলে জব্দ করা হয়েছে। এ নিয়ে সর্বমোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অপর ঘটনায় পুলিশ জানায়, গত ৪ জুলাই গোপন সংবাদে মতিঝিল বিভাগের গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী এবং গাজীপুরের গাছা এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা হলেন- মো. আব্দুল মান্নান দুলাল ওরফে জাহাঙ্গীর, মো. নাসিম হাসান লাভলু ও ইলিয়াস শিকদার ওরফে বেলায়েত। গ্রেপ্তারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। দুইটি ল্যাপটপ, একটি ট্যাব, ৫২টি মোবাইল ফোন সেট, ১৯০টি সিম কার্ড, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামীয় আটটি সীল, ছবি ও নাম ঠিকানাসহ ২০টি ডিরেক্টরি, পাঁচটি ভুয়া আইডি কার্ড এবং নগদ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
এদিকে গত ১৪ জুন রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাবের পোশাকে একটি বেসরকারি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীর গতিরোধ করা হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় সঙ্গে থাকা ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ভর্তি ব্যাগ। প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটলেও র‌্যাব ভেবে কেউ সামনে এগিয়ে যাননি। পরবর্তীতে সিসিটিভিতে ধারণকৃত একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে ঘটনার তদন্তে নামে পুলিশ-র‌্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম। এরপর এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় নগদ ২২ লাখ টাকা। তদন্তে জানা যায়, চাকরিচ্যুত পুলিশ ও সেনা সদস্যদের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে ডাকাতির এ ঘটনা ঘটে।
এছাড়া গত বছর অক্টোবরেও যৌথবাহিনীর সদস্য সেজে মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে ৭০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও ৭৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে এই ঘটনায় চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ১১ সদস্য জড়িত ছিলেন।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৬টি, নভেম্বরে ২টি, ডিসেম্বরে ১০টি, জানুয়ারিতে ৮টি, ফেব্রিয়ারিতে ৬টি, মার্চে ৩টি, এপ্রিলে ৭টি এবং মে মাসে ৫টি। তদন্তে নেমে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ৩৬ সদস্য ও সোর্সের নাম পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৫ জন।
এদিকে গত ৩ জুলাই রাতে বোরকার নিচে পুলিশের পোশাক পরে নিজেকে এসআই পদমর্যাদার নারী পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় কনস্টেবলকে স্যার বলে অভিযোগ দাখিলের সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ভুয়া পুলিশ সদস্যা তানিয়া। নিজের ফেসবুক আইডিতেও পুলিশের পোশাক পরে ছবি ছাড়েন ও নিজ এলাকায় ঘুরে বেড়ান তানিয়া।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয়দেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তৌহিদ আহমেদ বলেন, তানিয়া নামে এক ভুয়া নারী পুলিশকে আটক করা হয়েছে। ৪ জুলাই দুপুরে তাকে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তার উদ্দেশ্য কী ছিল, পুলিশের পোশাক কোথা থেকে পেয়েছে বা কোনো অপরাধে জড়িত ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান ওসি।
এর আগে গত ২০ এপ্রিল দুপুর ২টার দিকে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার আলিহাট গাজী আমিনিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ঢুকে মো. ওমর ফারুক নামে এক যুবক নিজেকে ডিএসবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে এক শিক্ষকের নিকট টাকা দাবি করেন। বিষয়টি সন্দেহ হলে স্থানীয়রা তাকে আটক করে থানায় জানায়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে পরবর্তীতে আদালতে পাঠায়।
এর আগে গত বছরের ২ ডিসেম্বর ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের মাছিমপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার ১২০৯/৫-এস এর কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গামারীতলা এলাকা থেকে ভুয়া পুলিশ সদস্য বাকির হোসেন ও তার গাড়ি চালক তবারক হোসেনকে আটক করে বিজিবি।
সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়া কাদির জানান, মাছিমপুর বিওপির সদস্যরা তাদেরকে আটক করে থানায় মামলা করা হয়েছে।
এরও আগে গত বছরের ২১ অক্টোবর নরসিংদীর শিবপুর মডেল থানার কলেজ গেট এলাকা থেকে তিন ভুয়া পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এরা হলেন- শিবপুরের বাঘাব গ্রামের রমিজ উদ্দিনের ছেলে মো. আরিফুল ইসলাম, নগর গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে মো. দুলাল মিয়া ও কামরাব গ্রামের মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে মো. স্বাধীন। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি প্রিমিও প্রাইভেটকার ও একটি হ্যান্ডকাফ, হ্যান্ডকাফের চাবিসহ পুলিশের ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি এই শ্রেণির অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা আরও চ্যালেঞ্জের। এমন ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি, এমন ঘটনা বহু আগে থেকেই ঘটছে। সংখ্যার তারতম্য আছে। গত ১০ মাসে এমন অপরাধের সংখ্যাটা বেশি।
তিনি বলেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সে যেখানেই চাকরি করুক, সেখানকার সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, যিনি কোনো অপরাধ করেন, তাকে আমরা অপরাধী হিসেবেই গণ্য করি। তিনি কোনো বাহিনীর সদস্য হলেও তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। অপরাধী যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে জড়াচ্ছে কিনা, তা নজরদারি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কেউ অভিযানে গেলে ভুক্তভোগীদের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ বা নিকটস্থ থানায় ফোনকল দেওয়ার পরামর্শ দেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

জনপ্রিয় সংবাদ

দাঁড়িপাল্লা-মাহফিল নিয়ে দেওয়া আরেক জামায়াত নেতার বক্তব্য ভাইরাল

অপরাধে জড়াচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাকরিচ্যুত-অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা!

আপডেট সময় : ০৭:১০:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫
  • র‌্যাব-পুলিশ ও সেনা পরিচয়ে ঘটাচ্ছে ছিনতাই-ডাকাতি
  • গত ৮ মাসে রাজধানীতেই ঘটেছে ৪৭টি ডাকাতির ঘটনা
  • তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিভিন্ন বাহিনীর ৩৬ সদস্য ও সোর্সের নাম

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাগত দায়িত্ব পালনে শিথিলতার সুযোগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইসহ সামাজিক অপরাধ বেড়েই চলছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ভুয়া পুলিশের দৌরাত্ম্য। ভুয়া পরিচয়ে ছিনতাই-ডাকাতির নেপথ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা থেকে চারকিচ্যুত ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ভুয়া পরিচয়ধারী সদস্যদের অপরাধের লাগাম টানতে প্রতিনিয়তই হিমশিম খাচ্ছেন। গত ৮ মাসে খোদ রাজধানীতেই ৪৭টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সাবেক ৩৬ সদস্য ও সোর্সের নাম পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে যোগ বা মদদ দিচ্ছেন বিভিন্ন বাহিনীর বর্তমান সদস্য ও তাদের সোর্সরা। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, এমন ঘটনা কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটেনি, বহু আগ থেকেই হয়ে আসছে। এই শ্রেণির অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা খুবই চ্যালেঞ্জের। তবে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। তবে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, অপরাধী যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে জড়াচ্ছে কিনা তা নজরদারি করা হচ্ছে। এছাড়া অপরাধী ধরতে ভুক্ত ভোগীদের ৯৯৯ এ কল দেওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মেইন গেটের উত্তর পার্শ্বের যাত্রী ছাউনির সামনে অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জন ডাকাত দল মুখোশ পরিহিত দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একটি প্রাইভেট কারের গতিরোধ করে। এরপর তারা অস্ত্রের মুখে মেসার্স এম এম আয়াত ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস’র নগদ ৪ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৪০০ ওমানী রিয়াল, ৩০ কুয়েতী দিনার এবং ১২ হাজার ৩৫০ সংযুক্ত আরব আমিরাত দিরহাম যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ডাকাতি করে নিয়ে যায়। এরপর খবর পেয়ে ডিবি ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশের বেশকিছু সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহের পর বিশ্লেষণ শেষে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ঘটনায় সম্পৃক্ত ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরবর্তীতে জানতে পারে, বেশকিছু দিন ধরেই তারা ডাকাতির নাটক সাজিয়ে আসছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন সন্ধ্যায় রাইড শেয়ার উবার প্রাইভেট কারের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা ভর্তি লাগেজ নিয়ে উত্তরা যাবার পথে তার লাইভ লোকেশন হোয়াটসঅ্যাপে অন্যান্য সহযোগীদের শেয়ার করে রাখে। পূর্বপরিকল্পনা মাফিক অন্যান্য আসামিরা হোয়াটসঅ্যাপ লোকেশনের ভিত্তিতে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মেইন গেটের উত্তর পার্শ্বের যাত্রী ছাউনির সামনে এসে উক্ত প্রাইভেট কারের পথরোধ করে পরস্পর যোগসাজশে উক্ত বিদেশি মুদ্রা ভর্তি লাগেজ নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সকল আসামিরা লুণ্ঠিত বিদেশি মুদ্রাসমূহ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে আত্মগোপনে চলে যায়।
এরপর তার দেওয়ার তথ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তালহা নূর, শারমিন, মো. শাহিন শিকদার, ইয়াসিন আরাফাত, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শুভ হাওলাদারসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তারসহ তাদের নিকট হতে লুন্ঠিত অর্থের ২ লাখ ৬৯ হাজার ২৪০ সৌদি রিয়াল যার বাংলাদেশি টাকায় ৮৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়। এরপর গত ৪ জুলাই গোপন সংবাদে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ডিবি ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার যৌথ দল রাজধানীর গ্রীন রোড, ভোলার চরফ্যাশন এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন, আরিয়ান, সাব্বির হোসেন, জাহিদুল ইসলাম সোহাগ, জয় ও বিজয় নামে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ডাকাতির ঘটনায় লুণ্ঠিত এক লাখ ৩০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারমূলে জব্দ করা হয়েছে। এ নিয়ে সর্বমোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অপর ঘটনায় পুলিশ জানায়, গত ৪ জুলাই গোপন সংবাদে মতিঝিল বিভাগের গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী এবং গাজীপুরের গাছা এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা হলেন- মো. আব্দুল মান্নান দুলাল ওরফে জাহাঙ্গীর, মো. নাসিম হাসান লাভলু ও ইলিয়াস শিকদার ওরফে বেলায়েত। গ্রেপ্তারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। দুইটি ল্যাপটপ, একটি ট্যাব, ৫২টি মোবাইল ফোন সেট, ১৯০টি সিম কার্ড, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামীয় আটটি সীল, ছবি ও নাম ঠিকানাসহ ২০টি ডিরেক্টরি, পাঁচটি ভুয়া আইডি কার্ড এবং নগদ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
এদিকে গত ১৪ জুন রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাবের পোশাকে একটি বেসরকারি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীর গতিরোধ করা হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় সঙ্গে থাকা ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ভর্তি ব্যাগ। প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটলেও র‌্যাব ভেবে কেউ সামনে এগিয়ে যাননি। পরবর্তীতে সিসিটিভিতে ধারণকৃত একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে ঘটনার তদন্তে নামে পুলিশ-র‌্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম। এরপর এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় নগদ ২২ লাখ টাকা। তদন্তে জানা যায়, চাকরিচ্যুত পুলিশ ও সেনা সদস্যদের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে ডাকাতির এ ঘটনা ঘটে।
এছাড়া গত বছর অক্টোবরেও যৌথবাহিনীর সদস্য সেজে মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে ৭০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও ৭৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে এই ঘটনায় চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ১১ সদস্য জড়িত ছিলেন।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৬টি, নভেম্বরে ২টি, ডিসেম্বরে ১০টি, জানুয়ারিতে ৮টি, ফেব্রিয়ারিতে ৬টি, মার্চে ৩টি, এপ্রিলে ৭টি এবং মে মাসে ৫টি। তদন্তে নেমে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ৩৬ সদস্য ও সোর্সের নাম পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৫ জন।
এদিকে গত ৩ জুলাই রাতে বোরকার নিচে পুলিশের পোশাক পরে নিজেকে এসআই পদমর্যাদার নারী পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় কনস্টেবলকে স্যার বলে অভিযোগ দাখিলের সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ভুয়া পুলিশ সদস্যা তানিয়া। নিজের ফেসবুক আইডিতেও পুলিশের পোশাক পরে ছবি ছাড়েন ও নিজ এলাকায় ঘুরে বেড়ান তানিয়া।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয়দেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তৌহিদ আহমেদ বলেন, তানিয়া নামে এক ভুয়া নারী পুলিশকে আটক করা হয়েছে। ৪ জুলাই দুপুরে তাকে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তার উদ্দেশ্য কী ছিল, পুলিশের পোশাক কোথা থেকে পেয়েছে বা কোনো অপরাধে জড়িত ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান ওসি।
এর আগে গত ২০ এপ্রিল দুপুর ২টার দিকে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার আলিহাট গাজী আমিনিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ঢুকে মো. ওমর ফারুক নামে এক যুবক নিজেকে ডিএসবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে এক শিক্ষকের নিকট টাকা দাবি করেন। বিষয়টি সন্দেহ হলে স্থানীয়রা তাকে আটক করে থানায় জানায়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে পরবর্তীতে আদালতে পাঠায়।
এর আগে গত বছরের ২ ডিসেম্বর ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের মাছিমপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার ১২০৯/৫-এস এর কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গামারীতলা এলাকা থেকে ভুয়া পুলিশ সদস্য বাকির হোসেন ও তার গাড়ি চালক তবারক হোসেনকে আটক করে বিজিবি।
সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়া কাদির জানান, মাছিমপুর বিওপির সদস্যরা তাদেরকে আটক করে থানায় মামলা করা হয়েছে।
এরও আগে গত বছরের ২১ অক্টোবর নরসিংদীর শিবপুর মডেল থানার কলেজ গেট এলাকা থেকে তিন ভুয়া পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এরা হলেন- শিবপুরের বাঘাব গ্রামের রমিজ উদ্দিনের ছেলে মো. আরিফুল ইসলাম, নগর গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে মো. দুলাল মিয়া ও কামরাব গ্রামের মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে মো. স্বাধীন। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি প্রিমিও প্রাইভেটকার ও একটি হ্যান্ডকাফ, হ্যান্ডকাফের চাবিসহ পুলিশের ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি এই শ্রেণির অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা আরও চ্যালেঞ্জের। এমন ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি, এমন ঘটনা বহু আগে থেকেই ঘটছে। সংখ্যার তারতম্য আছে। গত ১০ মাসে এমন অপরাধের সংখ্যাটা বেশি।
তিনি বলেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সে যেখানেই চাকরি করুক, সেখানকার সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, যিনি কোনো অপরাধ করেন, তাকে আমরা অপরাধী হিসেবেই গণ্য করি। তিনি কোনো বাহিনীর সদস্য হলেও তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। অপরাধী যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে জড়াচ্ছে কিনা, তা নজরদারি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কেউ অভিযানে গেলে ভুক্তভোগীদের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ বা নিকটস্থ থানায় ফোনকল দেওয়ার পরামর্শ দেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।