◉ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে দেশটি
◉ ছেড়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে ব্যক্তি খাতে লিজ দিয়েও সুফল পায়নি সরকার
◉ দুর্নীতি আর বিজেএমসি’র অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছে বিশ্লেষকরা
↪ রাষ্ট্রীয় নিয়মে চলবে পাটকলগুলো, তবে কেন দেশের বাইরের রাষ্ট্রকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। আমরা বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার পক্ষে নই Ñঅ্যাড. কুদরত-ই খুদা, সভাপতি, সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ
↪ পাকিস্তান যদি বিনিয়োগ করে এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সমস্যা নেই Ñমো. নাসিমুল ইসলাম, মুখ্য পরিচালন কর্মকতা, বিজেএমসি
পাট চাষ ও পাট শিল্পের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জড়িত। প্রাচীনকাল থেকে আমাদের পাট শিল্প ছিল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। একসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার ছিল এই পাট। এমনকি স্বাধীনতার পরেও দুয়েক বছর আমাদের পাট শিল্পের গৌরব ছিল অক্ষত। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সেই পাটশিল্পের গৌরব আজ নানাবিধ কারণে ম্লান হতে বসেছে। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে এই শিল্পের অগ্রগতির বিকল্প ছিল না আজও নেই। পাটের সোনালি আঁশ কাজে লাগিয়ে কীভাবে রপ্তানি বৃদ্ধি করা যায় সেটি নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। পাটজাত পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে বিশ্বের নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি ও রপ্তানি বৃদ্ধি করে এই গৌরভময় শিল্পকে ফিরে আনতে হবে। বিগত আওয়ামী সরকারের সময় এই শিল্পকে নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা মুখে বললেও তার কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি লোকসানের কথা বলে বিভিন্ন পাটকল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল আওয়ামী সরকার। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই বন্ধ পাটকলে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। তার ধারবাহিকতায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি কারখানা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে পাকিস্তান। দেশটির কয়েকটি ব্যক্তিমালিকানার কোম্পানি প্রতিষ্ঠানগুলো লিজ নেবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) ও বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) তাদের মালিকানাধীন পাটকল ও বস্ত্রকলগুলো পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মিল-কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার তার মালিকানায় নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। সরকারও এগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়। ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থাভাব, অতিরিক্ত লোকবল, অস্বাভাবিক হারে পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ। প্রথমদিকে রীতিমতো লুটপাট চলে। লাভজনক পর্যায়ে নেওয়া তো দূরের কথা, শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি, বেতন-ভাতাদি প্রদানই সম্ভব হয়নি। নিরুপায় হয়ে একে একে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শ্রমিক-কর্মচারীদের পরিচালনা-ব্যবস্থাপনার নামে মিলগুলোতে লুটতরাজ শুরু হয়। শেষ পর্যায়ে সরকার ব্যক্তি খাতে দীর্ঘ মেয়াদে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন সময়ে মিলের মধ্যে ৩০টি লিজ দেওয়া হয়। ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়। কিন্তু লিজগ্রহীতারা ফ্যাক্টরিগুলো পরিচালনা করতেই পারেননি। রাষ্ট্রায়ত্ত থেকে ব্যক্তি খাতে লিজ দেওয়ার আগে মিলগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বিদায় করা হয়। মজুরি, বেতন, বকেয়া পাওনা বিশাল অঙ্কের অর্থের বোঝা সরকারকে টানতে হয়। ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার পর অভিজ্ঞ, দক্ষ শ্রমিকদের কাজে নিয়োগের শর্ত রাখা হয় সরকারের দিক থেকে। কিন্তু কোনো একজন ক্রেতাও এই শর্ত রাখেননি। অভিজ্ঞ, দক্ষ শ্রমিকদের সাময়িকভাবে স্বল্প মজুরিতে কাজে নেওয়া হয়। কিছুদিন পরই তাদের বাদ দেওয়া হয়। সামগ্রিকভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শ্রমিক-কর্মচারীরা সরকারের জন্য বড় রকমের বোঝা হয়ে ওঠে।
মিল-ফ্যাক্টরিগুলোর মেশিনারি অনেক পুরোনো, ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে অনেক আগেই। নতুন আধুনিক মেশিন দিয়ে পুনঃস্থাপন জরুরি হলেও সরকার তা করতে পারেনি অর্থাভাবে। ব্যক্তি খাতে লিজ দেওয়ার পর তারাও সুবিধা করতে পারেননি। মিল-কারখানাগুলো নিয়ে নানা ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্টের পর এগুলো সরকারের ঘাড়ে বোঝা হয়েই রয়েছে।
নতুন অন্তর্বর্তী সরকার আর কোনো রকম এক্সপেরিমেন্ট না করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করতে চাচ্ছে। তাদের প্রয়োজন, চাহিদা অনুযায়ী সব রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। ঢাকাস্থ পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তার দেশের আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের আনার অনুরোধ করা হয়েছে। পাকিস্তানে বেসরকারি খাত যথেষ্ট দক্ষ, অভিজ্ঞ। বস্ত্র ও পাটশিল্পে বিনিয়োগে তারা আগ্রহী হবে মনে করেই মিলগুলো তাদের হাতে ছাড়তে চাচ্ছে। রীতিমতো দায়মুক্তির পথ খুঁজছে সরকার। প্রথম পর্যায়ে পাট খাতে দুটি ও বস্ত্র খাতে দুটি ফ্যাক্টরি পাকিস্তানের শিল্পপতিদের কাছে দেওয়া হবে। তারা পরে আগ্রহী হলে তাদের চাহিদা অনুযায়ী আরও কয়েকটি মিল তাদের কাছে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত বলেন, বাংলাদেশে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত বস্ত্র ও পাটকলগুলোয় পাকিস্তানি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারে। বিনিয়োগকারীরা এসব মিলে ও বস্ত্রসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করতে পারে।
পাটকলগুলোতে বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের সভাপতি অ্যাড. কুদরত-ই খুদা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তীত রাজনীতিতে এই মুহূর্তে তার সঙ্গে সেন্টিমেন্ট জড়িত আছে। যার ফলে বিষয়টিকে সরলিকরণ করা যাচ্ছে না। তবে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা রয়েছে এ বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা থাকলেও তাদের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক এবং সম্পর্কটি কী হবে? তারপর নির্ভর করবে যে তাদের বিনিযোগ কতটুকু যৌক্তিক।
পাটকলে এই অবস্থার জন্য সরকারের বিজেএমসির অদক্ষতাকে দায়ি করে তিনি বলেন, সরকারি পাটকল চলবে সরকারি মতো। সরকারিভাবে পাটকলগুলো চললে যেভাবে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা হয়, বেসরকারিভাবে চললে সেভাবে হয় না। পাটকলগুলো বেসরকারিভাবে চালানোর পক্ষে, এ কারণেই আমরা নই। পাটকলে লোকসানের কারণে বন্ধের কথা বলা হলেও তার জন্য শ্রমিকরা দায়ী নয়, এজন্য দায়ী বিজেএমসির ভুল সিদ্ধান্ত আর দুর্নীতি। মিলগুলো পুনরায় সরকারিভাবে চালানোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুট মিলস্ করপোরেশনের মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা মো. নাসিমুল ইসলাম বলেন, পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সেক্ষেত্রে কিছু মিলস্ লিজের কথা বলা হয়েছে। আমাদের মিলগুলো পড়ে আছে, তারা যদি বিনিয়োগ করে তাহলে আমাদের জন্য কোনো সমস্যা নেই। এই বিষয়টি আরও বিস্তারিত জানা যাবে মন্ত্রণালয় থেকে যখন বিস্তারিত সিদ্ধান্ত প্রদান করা হবে।


























