বন্দর নগরী চট্টগ্রামে যানজট পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনাও। প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন স্পটে যানজট লেগে থাকে। যানজটের কারণে বিমানের যাত্রী, অ্যাম্বুলেন্সের রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার। অপরিকল্পিত বাসস্ট্যান্ডের কারণে নগরীর চার প্রবেশমুখ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। নগরীর অক্সিজেন মোড়, শাহ আমানত সেতু চত্বর, কাপ্তাই রাস্তার মাথা এবং সিটি গেট-কর্নেল হাটে যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেশিরভাগ সড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখল করে চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য। যত্রতত্র যানবাহন দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী ওঠা-নামা করানোর কারণে প্রতিটি মোড়েই এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। নগরের অভ্যন্তরে দিনে ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ অন্যান্য মালবাহী যানবাহন চলাচল এবং অবৈধ পার্কিং-এর ফলে যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যানবাহন (যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক) চলাচলের ফলে সড়কে গাড়ির চাপ বেড়েছে। ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কলেজ ছাত্রীসহ একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না থাকার জন্য ট্রাফিক পুলিশের অবহেলা ও চাঁদাবাজিকে দায়ী করছেন অনেকে।।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নগরীর মুরাদপুর, জিইসি মোড়, বহদ্দারহাট, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, ওয়াসা, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, বারেক বিল্ডিং মোড়, ফ্রি-পোর্ট, কাস্টমস মোড়, অক্সিজেন, অলংকার, একে খানসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই লেগে থাকে যানজট। এর মধ্যে নগরীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণ এবং ওয়াসাসহ অন্যান্য সেবা সংস্থার চলছে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি। নগরীর ওয়াসা মোড় সংলগ্ন বাউয়া স্কুলের সামনে নির্মাণ করা হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প। এ কারণে ওই সড়কে যানজট যেন লেগেই আছে।
যানযট প্রসঙ্গে নগরীর মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা প্রকৌশলী আবদুল মুবিন চৌধুরী বলেন, এক সময় নগরীর অলি-গলিতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলাচল করতো ব্যাটারিচালিত রিকশা। গত ৫ আগস্টের পর এসব রিকশা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান সড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশকেও এ বিষয়ে তেমন কোনও পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়াও অনুমোদনহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ম্যাক্সিমা, ব্যাটারিচালিত টমটমসহ অন্যান্য যানবাহন নগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তার ওপর সড়কে আছে লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ফিটনেসবিহীন একাধিক বাস, টেম্পুসহ বিভিন্ন গণপরিবহন। এসব গাড়ি সড়কে যানজট বাড়াচ্ছে।
এবিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগরী অটোরিকশা অটোটেম্পু মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক টিটু চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে যানজটের মূল কারণ ছোট আকারের যানবাহন। নগরীর সড়কে ছোট আকারের যানবাহন কমার পরিবর্তে বেড়েছে। নগরীর সড়কে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার অবৈধ যানবাহন ছিল। তার ওপর ৫ আগস্টের পর সড়কে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, নগরীতে কমপক্ষে দশ হাজারের বেশি অবৈধভাবে সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। নগরীর অলি-গলিতে অবৈধ রুট সৃষ্টি করে এসব অটোরিকশা চলাচল করছে। সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একাধিকবার প্রশাসনকে বলেছি। তারা বন্ধে কোনও উদ্যোগ নিচ্ছে না। অবৈধ সিএনজি অটোরিকশার পাশাপাশি, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, টমটম, ব্যাটারিরিকশা, মাহিন্দ্র, ম্যাক্সিমাসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ যানবাহন নগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের (ডিসি-পশ্চিম) নিস্কৃতি চাকমা বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য, চট্টগ্রাম শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা। একটি শহরকে শৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য ২৫ শতাংশ সড়কের প্রয়োজন। তবে চট্টগ্রামে সড়ক আছে মাত্র ১০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে পার্কিংয়ের সংকট। অতি দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে পার্কিং প্লেস নির্ধারণ করা জরুরি।
এবিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীকে যানজটমুক্ত করতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবগুলো সেবা সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হলে যত্রতত্র বাসসহ যেকোনও যানবাহন দাঁড়াতে পারবে না। যাত্রী ছাউনি যেখানে থাকবে সেখানেই দাঁড়াতে হবে। এ জায়গায় আমাদের কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। যত্রতত্র যানবাহন দাঁড়ানোর কারণে কেবল যে যানজট বাড়ছে তা নয়, বরং সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ এই অব্যবস্থাপনা।


























