০৭:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মুখ দেখলে যে স্বামীর অমঙ্গল হবে

স্বামীর মুখ দেখলে যে অমঙ্গল হবে এমন বিশ্বাস থেকে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে ভাদর কাটানি
ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালিত হচ্ছে। আদি যুগ থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ভাদর কাটানি উৎসব
গ্রামাঞ্চলে নিরবে পালন করা হচ্ছে। ভাদ্র মাসের শুরুতে গ্রামে গ্রামে শুরু হয় ভাদর কাটানি
উৎসব। স্বামীর মঙ্গল কামনার লক্ষ্যে ভাদর কাটানি উৎসব পালন করার জন্য বাবার বাড়ীতে যায়
নববিবাহিতা বধূরা। শহরে ভাদর কাটানির প্রভাব কম থাকলেও গ্রামে গ্রামে পালন করা হয় এ
উৎসব। আধুনিক যুগে এ উৎসবে শিথিলতা এলেও মুছে যায়নি। তবে নিরবে চলছে ভাদর কাটানি
উৎসব। গত বছরের আশ্বিন থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত বিবাহিত মেয়েদের অনেকে বাবার বাড়ি
ফিরছেন। ভাদর কাটানি উৎসব মূলত উত্তরাঞ্চলে প্রচলিত একটি প্রথা, যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে,
বিয়ের পর প্রথম ভাদ্র মাসে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের মুখ দেখলে স্বামীর অমঙ্গল হতে পারে। এই ধারণার
বশবর্তী হয়ে নববধূরা শ্রাবণ মাসের শেষদিকে বাবার বাড়ি যান। এই সময়ে তারা অন্তত তিন
থেকে দশ দিন স্বামীর মুখ দর্শন থেকে বিরত থাকেন। অনেকেই ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকে ১৫
তারিখ পর্যন্ত স্বামীর মুখ দর্শন থেকে বিরত থাকেন, আবার অনেকেই ভাদ্র মাসে স্বামীর মুখ দর্শন
থেকে বিরত থাকেন। আনুষ্ঠানিক ও লৌকিক লোকাচার রীতি মেনে তাঁরা যাচ্ছেন বাবার বাড়ি।
নববধূকে বাবার বাড়ীতে নেওয়ার রেওয়াজটি স্থানীয়দের কাছে ভাদর কাটানী উৎসব নামে পরিচিত।
এ উৎসবের নিয়ম অনুযায়ী ভাদ্র মাসের প্রথম দিন হতে কমপক্ষে দশ দিন পর্যন্ত স্বামীর মঙ্গল কামনায়
কোন নববধূ তার স্বামীর মুখ দর্শন করবেন না। মুখ দেখলে অমঙ্গল হবে। আধুনিক যুগে বা ধর্মীয়
দৃষ্টিকোণ থেকে ভাদর কাটানির কোন ব্যাখ্যা না থাকলেও রংপুর, গাইাবান্ধা, কুড়িগ্রাম,
লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরে আদি প্রথা অনুযায়ী ভাদ্র মাসের পয়লা
তারিখ থেকে শুরু হয়ে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে এ উৎসব। যারা মনে প্রাণে বাঙ্গালি
যারা বাঙ্গালির রীতিনীতি ও প্রথা মেনে চলার চেষ্টা করেন তাদের নিয়মের ভিতরেই রয়েছে ভাদর
কাটানি প্রথা। তাছাড়া ভাদ্র মাসে সনাতন ধর্মের লোকেরা বিয়ের কোন আয়োজন করে না।
প্রচলিত প্রথাটি যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে হিন্দুু-মুসলিমদের মধ্যে চলে আসছে। রংপুর,
গাইাবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর অঞ্চলে এবং
ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিনাজপুর মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের কোন কোন অংশে ভাদর কাটানি প্রথা
চালু আছে বলে জানা যায়। নিয়ম অনুযায়ী কনে পক্ষ শ্রাবণ মাসের দু-একদিন বাকি থাকতেই
বরপক্ষের বাড়িতে সাধ্যমতো বিভিন্ন রকমের ফল, মিষ্টি, পায়েসসহ নানা রকম পিঠা-পুলি নিয়ে
যায়। বরপক্ষও সাধ্যমতো তাদের আপ্যায়ন করে। বাড়িতে কনে পক্ষের লোকজন আসায় চারদিকে একটা
উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। কোন এলাকায় এমন নিয়মও রয়েছে, ভাদ্র মাসে মামির হাতে ভাত
খেতে হয়। এখনও ভাগ্নেরা মামার বাড়ি গিয়ে মামির হাতে ভাত খায়। কারণ ভাদ্র মাসে নানা ধরনের
অসুখ বিসুখ লেগে থাকে। তাই বড়দের মতে, মামির হাতে ভাত খেলে বাকি ১১মাস ভালো থাকা
যায়। দিনাজপুরের কাহারোলের সোহাগ বলেন, বউ গেছে তার বাপের বাড়ীতে। বৌকে বিদায় দিতে
হবে কিংবা কনের বাড়ির লোকজন দলবেঁধে কন্যাকে নিতে আসবে। বাড়িতে অতিথি আসলে
বাড়ির লোকজনরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে হাত মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা, গামছা তোয়ালের ব্যবস্থা তারপর
খড়ম স্যান্ডেল ধুতি, লুঙ্গির ব্যবস্থা যেন পরিপূর্ণ করা হয়। তারপরে খাওয়ার জন্য ছাগল, মুরগি,
ডিম, দুধ, কলা, দই, চিড়া, মুড়ি, পায়েশ, পুলি, পিঠা, আয়োজনের মধ্যে সবই থাকে বাঙ্গালী
সমাজে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রবিউল ইসলাম বলেন, ভাদর কাটানি মুসলিম সম্প্রদায়ের
কোনো ধর্মীয় বিষয় না হলেও প্রথাটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। একসময় হিন্দু সম্প্রদায় ভাদর
কাটানি উৎসবকে জাকজঁমকভাবে পালন করত। তাদের রেওয়াজ বা রীতি বংশানুক্রমে উত্তরাঞ্চলের
মানুষকে প্রভাবিত করে। এক পর্যায়ে উৎসবটি এ অঞ্চলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি
সাংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়, ভাদর কাটানি উৎসব। আগে গরু গাড়ীতেই বেশী
যাতায়াত করতো, যদিও এখন ভিন্ন ভিন্ন যানবাহনে চলাচল করে নববধুরা। এখন কম দেখা গেলেও
মুছে যায়নি।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিপিএলে শেষের নাটকীয়তার পর ৫ রানে জিতল রাজশাহী

মুখ দেখলে যে স্বামীর অমঙ্গল হবে

আপডেট সময় : ০২:৩৭:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৫

স্বামীর মুখ দেখলে যে অমঙ্গল হবে এমন বিশ্বাস থেকে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে ভাদর কাটানি
ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালিত হচ্ছে। আদি যুগ থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ভাদর কাটানি উৎসব
গ্রামাঞ্চলে নিরবে পালন করা হচ্ছে। ভাদ্র মাসের শুরুতে গ্রামে গ্রামে শুরু হয় ভাদর কাটানি
উৎসব। স্বামীর মঙ্গল কামনার লক্ষ্যে ভাদর কাটানি উৎসব পালন করার জন্য বাবার বাড়ীতে যায়
নববিবাহিতা বধূরা। শহরে ভাদর কাটানির প্রভাব কম থাকলেও গ্রামে গ্রামে পালন করা হয় এ
উৎসব। আধুনিক যুগে এ উৎসবে শিথিলতা এলেও মুছে যায়নি। তবে নিরবে চলছে ভাদর কাটানি
উৎসব। গত বছরের আশ্বিন থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত বিবাহিত মেয়েদের অনেকে বাবার বাড়ি
ফিরছেন। ভাদর কাটানি উৎসব মূলত উত্তরাঞ্চলে প্রচলিত একটি প্রথা, যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে,
বিয়ের পর প্রথম ভাদ্র মাসে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের মুখ দেখলে স্বামীর অমঙ্গল হতে পারে। এই ধারণার
বশবর্তী হয়ে নববধূরা শ্রাবণ মাসের শেষদিকে বাবার বাড়ি যান। এই সময়ে তারা অন্তত তিন
থেকে দশ দিন স্বামীর মুখ দর্শন থেকে বিরত থাকেন। অনেকেই ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকে ১৫
তারিখ পর্যন্ত স্বামীর মুখ দর্শন থেকে বিরত থাকেন, আবার অনেকেই ভাদ্র মাসে স্বামীর মুখ দর্শন
থেকে বিরত থাকেন। আনুষ্ঠানিক ও লৌকিক লোকাচার রীতি মেনে তাঁরা যাচ্ছেন বাবার বাড়ি।
নববধূকে বাবার বাড়ীতে নেওয়ার রেওয়াজটি স্থানীয়দের কাছে ভাদর কাটানী উৎসব নামে পরিচিত।
এ উৎসবের নিয়ম অনুযায়ী ভাদ্র মাসের প্রথম দিন হতে কমপক্ষে দশ দিন পর্যন্ত স্বামীর মঙ্গল কামনায়
কোন নববধূ তার স্বামীর মুখ দর্শন করবেন না। মুখ দেখলে অমঙ্গল হবে। আধুনিক যুগে বা ধর্মীয়
দৃষ্টিকোণ থেকে ভাদর কাটানির কোন ব্যাখ্যা না থাকলেও রংপুর, গাইাবান্ধা, কুড়িগ্রাম,
লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরে আদি প্রথা অনুযায়ী ভাদ্র মাসের পয়লা
তারিখ থেকে শুরু হয়ে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে এ উৎসব। যারা মনে প্রাণে বাঙ্গালি
যারা বাঙ্গালির রীতিনীতি ও প্রথা মেনে চলার চেষ্টা করেন তাদের নিয়মের ভিতরেই রয়েছে ভাদর
কাটানি প্রথা। তাছাড়া ভাদ্র মাসে সনাতন ধর্মের লোকেরা বিয়ের কোন আয়োজন করে না।
প্রচলিত প্রথাটি যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে হিন্দুু-মুসলিমদের মধ্যে চলে আসছে। রংপুর,
গাইাবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর অঞ্চলে এবং
ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিনাজপুর মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের কোন কোন অংশে ভাদর কাটানি প্রথা
চালু আছে বলে জানা যায়। নিয়ম অনুযায়ী কনে পক্ষ শ্রাবণ মাসের দু-একদিন বাকি থাকতেই
বরপক্ষের বাড়িতে সাধ্যমতো বিভিন্ন রকমের ফল, মিষ্টি, পায়েসসহ নানা রকম পিঠা-পুলি নিয়ে
যায়। বরপক্ষও সাধ্যমতো তাদের আপ্যায়ন করে। বাড়িতে কনে পক্ষের লোকজন আসায় চারদিকে একটা
উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। কোন এলাকায় এমন নিয়মও রয়েছে, ভাদ্র মাসে মামির হাতে ভাত
খেতে হয়। এখনও ভাগ্নেরা মামার বাড়ি গিয়ে মামির হাতে ভাত খায়। কারণ ভাদ্র মাসে নানা ধরনের
অসুখ বিসুখ লেগে থাকে। তাই বড়দের মতে, মামির হাতে ভাত খেলে বাকি ১১মাস ভালো থাকা
যায়। দিনাজপুরের কাহারোলের সোহাগ বলেন, বউ গেছে তার বাপের বাড়ীতে। বৌকে বিদায় দিতে
হবে কিংবা কনের বাড়ির লোকজন দলবেঁধে কন্যাকে নিতে আসবে। বাড়িতে অতিথি আসলে
বাড়ির লোকজনরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে হাত মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা, গামছা তোয়ালের ব্যবস্থা তারপর
খড়ম স্যান্ডেল ধুতি, লুঙ্গির ব্যবস্থা যেন পরিপূর্ণ করা হয়। তারপরে খাওয়ার জন্য ছাগল, মুরগি,
ডিম, দুধ, কলা, দই, চিড়া, মুড়ি, পায়েশ, পুলি, পিঠা, আয়োজনের মধ্যে সবই থাকে বাঙ্গালী
সমাজে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রবিউল ইসলাম বলেন, ভাদর কাটানি মুসলিম সম্প্রদায়ের
কোনো ধর্মীয় বিষয় না হলেও প্রথাটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। একসময় হিন্দু সম্প্রদায় ভাদর
কাটানি উৎসবকে জাকজঁমকভাবে পালন করত। তাদের রেওয়াজ বা রীতি বংশানুক্রমে উত্তরাঞ্চলের
মানুষকে প্রভাবিত করে। এক পর্যায়ে উৎসবটি এ অঞ্চলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি
সাংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়, ভাদর কাটানি উৎসব। আগে গরু গাড়ীতেই বেশী
যাতায়াত করতো, যদিও এখন ভিন্ন ভিন্ন যানবাহনে চলাচল করে নববধুরা। এখন কম দেখা গেলেও
মুছে যায়নি।