০৮:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মহেশখালীতে ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমদ হত্যা মামলায় ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা

মহেশখালীতে পিটিয়ে ও গুলি করে ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমদকে খুনের ঘটনায় প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিহতের ভাই তারেক আজিজ বাদী হয়ে করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সা.সম্পাদক ও কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (আত্মগোপনে) তারেক বিন ওসমান শরীফকে। এ ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়-২৩ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টা থেকে ২৪ আগস্ট ভোর ৫টার মধ্যে চিংড়ি প্রজেক্টে হামলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে হামলাকারীরা ‘আট জইন্যা ঘোনা’ নামে প্রায় সাড়ে তিনশ একরের এ মাছের প্রকল্প থেকে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা না পেয়ে দুইটি নৌকায় করে হামলাকারীরা ২৩ আগস্ট রাতে এ চিংড়ি প্রকল্পে গিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ে, শ্রমিকদের থাকার ঘর ভেঙে দেয় এবং বিপুল টাকার মাছ লুট করে নেয়। এতে তোফায়েল বাধা দিলে তার পায়ে গুলি করা হয়, পরে বন্দুকের বাট দিয়ে তাকে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এক পর্যায়ে অর্ধমৃত অবস্থায় তোফায়েলকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে লাশ গুম করার চেষ্টা করে এবং প্রধান সড়কের কাল্লোর বাঁশডোয়া এলাকায় ফেলে যায়। পরদিন ভোরে পুলিশ ওই স্থান থেকে তোফায়েলের লাশ উদ্ধার করে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্ত শেষে ওইদিন সন্ধ্যায় তাকে দাফন করা হয়। তোফায়েল ইউনিয়নের মোহাম্মদ শাহ ঘোনা এলাকার মৃত সিদ্দিক আহমদের ছেলে। তিনি একজন ব্যবসায়ী।
মামলায় তারেক বিন ওসমান শরীফ ছাড়াও তার ভাই এড. নোমান শরীফ, নুরুল আলম ওরফে কালাবদা, জাহাঙ্গীর ওরফে কালা জাহাঙ্গীরসহ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়, অজ্ঞাত ব্যক্তি দেখানো হয় আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে। মামলার বাদী তারেক আজিজ বলেন- এরা সকলে মিলে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, অপহরণ ও খুনের মতো অপরাধে লিপ্ত। তাদের বিরুদ্ধে খুন ও ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে- নিহত তোফায়েলের পরিবার বিএনপি সমর্থিত ও মামলার আসামিরা আওয়ামী লীগ সমর্থিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তোফায়েলের গোষ্ঠীর লোকজন ১৬ বছর ধরে এলাকাছাড়া ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তারা এলাকায় ফিরে আসেন এবং মাছের চাষাবাদ শুরু করেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত লোকজন এলাকাছাড়া হয়ে যায় এবং এলাকায় আধিপত্য ও ঘের দখল-বেদখল ইস্যুতে বিরোধ শুরু হয়। তাছাড়া জুলাই আন্দোলনে শহীদ এই পরিবারের সন্তান চট্টগ্রামের আশেকান ডিগ্রি কলেজের ছাত্র তানভীর সিদ্দিকী হত্যা মামলায় শেখ হাসিনার সাথে এই তারেক বিন ওসমান শরীফও আসামি হন। নিহত তোফায়েল শহীদ তানভীর সিদ্দিকীর চাচাতো চাচা।
নিহতের পরিবার, প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে- রাতে মাছের ঘের থেকে তোফায়েলকে অপহরণ করে ৩ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে পুলিশ ও কোস্টগার্ড দীর্ঘ তল্লাশি করেও তার সন্ধান পায়নি। পরে ভোরে গুলিতে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। বাহিনী একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করলেও সড়কে ডাকাতি থামানো যায়নি। অবশেষে ওই স্থানেই মিলল ব্যবসায়ী তোফায়েলের লাশ।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তোফায়েলের জানাজা শেষে এক প্রতিবাদ সভা থেকে এলাকার এমন পরিস্থিতির জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দোষারোপ করেও বক্তব্য আসে।
এদিকে গত এক বছরে এই ইউনিয়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং একাধিক ব্যক্তি খুন হয়। গত কিছুদিন ধরে সড়কের ‘কাল্লোর বাঁশডোয়া’ এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে ডাকাতি চলছিল।
মহেশখালী থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মঞ্জুরুল হক জানিয়েছেন- নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার এজাহার আসতে কিছুটা দেরি হয়েছে, মহেশখালীতে টানা বিদ্যুৎ না থাকা ও সার্ভার ত্রুটির কারণে ঘটনার পর দেরিতে মামলা রেকর্ড হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে, তাদেরকে রিমান্ড চাওয়া হবে। ঘটনার পর এলাকার পুলিশের উপস্থিতি ও টহল বাড়ানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে। আসামিদের গ্রেপ্তার করতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।

এসএস/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডাকাতি মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

মহেশখালীতে ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমদ হত্যা মামলায় ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আপডেট সময় : ০৬:২২:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫

মহেশখালীতে পিটিয়ে ও গুলি করে ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমদকে খুনের ঘটনায় প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিহতের ভাই তারেক আজিজ বাদী হয়ে করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সা.সম্পাদক ও কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (আত্মগোপনে) তারেক বিন ওসমান শরীফকে। এ ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়-২৩ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টা থেকে ২৪ আগস্ট ভোর ৫টার মধ্যে চিংড়ি প্রজেক্টে হামলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে হামলাকারীরা ‘আট জইন্যা ঘোনা’ নামে প্রায় সাড়ে তিনশ একরের এ মাছের প্রকল্প থেকে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা না পেয়ে দুইটি নৌকায় করে হামলাকারীরা ২৩ আগস্ট রাতে এ চিংড়ি প্রকল্পে গিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ে, শ্রমিকদের থাকার ঘর ভেঙে দেয় এবং বিপুল টাকার মাছ লুট করে নেয়। এতে তোফায়েল বাধা দিলে তার পায়ে গুলি করা হয়, পরে বন্দুকের বাট দিয়ে তাকে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এক পর্যায়ে অর্ধমৃত অবস্থায় তোফায়েলকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে লাশ গুম করার চেষ্টা করে এবং প্রধান সড়কের কাল্লোর বাঁশডোয়া এলাকায় ফেলে যায়। পরদিন ভোরে পুলিশ ওই স্থান থেকে তোফায়েলের লাশ উদ্ধার করে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্ত শেষে ওইদিন সন্ধ্যায় তাকে দাফন করা হয়। তোফায়েল ইউনিয়নের মোহাম্মদ শাহ ঘোনা এলাকার মৃত সিদ্দিক আহমদের ছেলে। তিনি একজন ব্যবসায়ী।
মামলায় তারেক বিন ওসমান শরীফ ছাড়াও তার ভাই এড. নোমান শরীফ, নুরুল আলম ওরফে কালাবদা, জাহাঙ্গীর ওরফে কালা জাহাঙ্গীরসহ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়, অজ্ঞাত ব্যক্তি দেখানো হয় আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে। মামলার বাদী তারেক আজিজ বলেন- এরা সকলে মিলে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, অপহরণ ও খুনের মতো অপরাধে লিপ্ত। তাদের বিরুদ্ধে খুন ও ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে- নিহত তোফায়েলের পরিবার বিএনপি সমর্থিত ও মামলার আসামিরা আওয়ামী লীগ সমর্থিত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তোফায়েলের গোষ্ঠীর লোকজন ১৬ বছর ধরে এলাকাছাড়া ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তারা এলাকায় ফিরে আসেন এবং মাছের চাষাবাদ শুরু করেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত লোকজন এলাকাছাড়া হয়ে যায় এবং এলাকায় আধিপত্য ও ঘের দখল-বেদখল ইস্যুতে বিরোধ শুরু হয়। তাছাড়া জুলাই আন্দোলনে শহীদ এই পরিবারের সন্তান চট্টগ্রামের আশেকান ডিগ্রি কলেজের ছাত্র তানভীর সিদ্দিকী হত্যা মামলায় শেখ হাসিনার সাথে এই তারেক বিন ওসমান শরীফও আসামি হন। নিহত তোফায়েল শহীদ তানভীর সিদ্দিকীর চাচাতো চাচা।
নিহতের পরিবার, প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে- রাতে মাছের ঘের থেকে তোফায়েলকে অপহরণ করে ৩ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে পুলিশ ও কোস্টগার্ড দীর্ঘ তল্লাশি করেও তার সন্ধান পায়নি। পরে ভোরে গুলিতে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। বাহিনী একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার করলেও সড়কে ডাকাতি থামানো যায়নি। অবশেষে ওই স্থানেই মিলল ব্যবসায়ী তোফায়েলের লাশ।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তোফায়েলের জানাজা শেষে এক প্রতিবাদ সভা থেকে এলাকার এমন পরিস্থিতির জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দোষারোপ করেও বক্তব্য আসে।
এদিকে গত এক বছরে এই ইউনিয়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং একাধিক ব্যক্তি খুন হয়। গত কিছুদিন ধরে সড়কের ‘কাল্লোর বাঁশডোয়া’ এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে ডাকাতি চলছিল।
মহেশখালী থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মঞ্জুরুল হক জানিয়েছেন- নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার এজাহার আসতে কিছুটা দেরি হয়েছে, মহেশখালীতে টানা বিদ্যুৎ না থাকা ও সার্ভার ত্রুটির কারণে ঘটনার পর দেরিতে মামলা রেকর্ড হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে, তাদেরকে রিমান্ড চাওয়া হবে। ঘটনার পর এলাকার পুলিশের উপস্থিতি ও টহল বাড়ানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে। আসামিদের গ্রেপ্তার করতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।

এসএস/সবা