ফেনী জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন মামুনের বিরুদ্ধে জেলার পতিত ফ্যাসিবাদ দোসরদের লুন্ঠিত হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র হাজী আলাউদ্দিনের পিএস খোকনের ছোট ভাই। পতিত আওয়ামী লীগের পলাকত সাবেক সাংসদ ও ফেনীর কসাই নামে পরিচিত নিজাম উদ্দিন হাজারী ওরফে নিজাম হাজারীর মাধ্যমে সাধারণ জনগণের লুষ্ঠিত সম্পদের পাহাদার হিসাবে সালাউদ্দিন মামুনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা ছাত্রদল নেতা সালাউদ্দিন মামুন। তিনি বলেছেন, দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে প্রতিপক্ষ কোনো মহল আমার দীর্ঘ বছরের সুনাম ক্ষুন্ন করতে মিথ্যা অভিযোগ তুলে এ অপপ্রচার চালাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, ফেনী পৌর ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলের লুৎফর রহমান খোকন ছিলেন সাবেক পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজী আলাউদ্দিনের পিএস। সেই সুবাদে তিনি ছিলেন দখল-চাঁদাবাজি, মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। গত ১৫ বছর খোকন সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন জেলা ছাত্রদল সভাপতি মামুন। ফেনীবাসীর মুখে মুখে গুঞ্জন উঠেছে, পতিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা মিলেমিশে চাঁদাবাজি ও মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনী জেলার মহিপালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতাদের গুলিতে নয়জন নিহত হয়। ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে গণহত্যার অন্যতম সশস্ত্র ক্যাডার ছিলেন খোকন। এর মধ্যে ফেনী মডেল থানায় দায়ের করা পৃথক আটটি হত্যা মামলায় ২ হাজার ৯৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফেনীতে আওয়ামী লীগ নেতা ও বিশেষ ব্যক্তিদের কাছে থাকা ১০০টি অস্ত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত ৯৩টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়েছে। জমার বাকি থাকা সাতটির মধ্যে ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী ও তার স্ত্রীর নামে তিনটি এবং খোকনের কাছে দুইটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
গত ১৭ বছর ফেনী ছিল সন্ত্রাসের জনপদ। এই সন্ত্রাসী জনপদের গডফাদার ছিলেন পতিত ফ্যাসিবাদের দোসর সাবেক সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারী ওরফে নিজাম হাজারী ও সাবেক পৌর মেয়র হাজী আলাউদ্দিন। ৯ বছর আগে ফেনী জেলা যুবদল সভাপতি হন পতিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র হাজী আলাউদ্দিনের পিএস খোকনের ছোট ভাই জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন। ফেনী জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হওয়ায় তদবিরের কারণে ওই মামলায় আসামী তালিকায় নাম নেই খোকনের। তবে রাজনৈতিকভাবে কৌশলী ফেনীর মহিপালের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী-বিএনপি মিলেমিশে কাজ করছে। তাদের একক আধিপত্যের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন মামুন।
৫ আগস্ট গণহত্যা মামলার আসামি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল এবং জিয়াউদ্দিন বাবলুকে নিরাপদে ফেনী হতে সরে যেতে সব ধরনের সহযোগিতা করেছে খোকন। ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট খোকনের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ফেনী থানায় জমা দেওয়ার কাজটি করে সালাউদ্দিন মামুন। গত ১৫ বছর খোকনের চাঁদাবাজি, মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য ছিল এই ছাত্রদল সভাপতি। দীঘদীনর আপরাধ জগতের বিশ্বস্ত সহচর খোকনের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ফেনী থানায় জমা দেওয়ার নামেও মামুন মোট অংকের উৎকোচ আদায় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, ফেনী হচ্ছে মাদক ও চোরাচালান পণ্যের হটস্পট। এই রুট দিয়ে প্রায় ২০০০ হাজার কোটি মাদক ও চোরাচালান হয়। একসময় এই রুটটি পতিত যুবলীগের জিয়াউদ্দিন মিস্টারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। গত বছরের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর এখন সালাউদ্দিন মামুনের নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফেনী জেলা যুবদল নেতা পারিবারিক ঐতিহ্য আগে থেকেই মামুন এ সিন্ডিকেটের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তবে পট পরিবর্তনে এখন প্রধান নিয়ন্ত্রণ তার হাতে।
জেলা পুলিশ সুত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের হয়ে যারা পূর্বে মাদক পারাপারে কাজ করত, এখন তারা মামুনের হয়ে কাজ করে। মাদক ও চোরাচালান পণ্যের কমিশনের টাকা ফেনীতে পতিত আওয়ামী লীগের দোসরদের কাছে পাঠিয়ে দেয় বলে সুত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কাজ ফেলে পালিয়েছেন ঠিকাদারা। আওয়ামী লীগের নেতারা পলায়নের পরও ঠিকাদারি কাজ সম্পন্ন করতে ও বিল পেতে ঢাল হিসেবে কাজ করছে সালাউদ্দিন মামুন।
পুলিশের সূত্রগুলো আরও জানায়, গত বছরের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতাদের গুলিতে নয়জন নিহতের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে ফেনী মডেল থানায় দায়ের করা পৃথক আটটি হত্যা মামলায় ২ হাজার ৯৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ফেনীর তিনজন সাবেক সংসদের, আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, নিজাম উদ্দিন হাজারী ওরফে নিজাম হাজারীর লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নাম রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র হাজী আলাউদ্দিনের পিএস খোকনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তার বক্তব্য মেলেনি। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন বলেন, আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের পক্ষে আমার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। বিগত সরকারের শাসনামলে অন্তত ১৫টি মিথ্যা মামলায় জেল খেটেছি। সুতরাং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমঝোতা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অতীতেও ছিলাম না বর্তমানেও নেই। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর। স্থানীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রতিপক্ষ কোনো মহল ফায়দা লোটার স্বার্থে আমার দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুন্ন করতে এবং দলীয় পদ না পেয়ে মিথ্যা অভিযোগ তুলে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এমআর/সবা
























