১১:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাল ভোট দিলে যেসব শাস্তি হতে পারে

ভোটাধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। জনগণের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নির্বাচন রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা নির্ধারণ করে। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে এই অধিকার অপব্যবহার করা হলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাংলাদেশে তাই জাল ভোটকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এ বিষয়ে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।

জাল ভোট কী?

জাল ভোট বলতে এমন ভোটকে বোঝায়, যা প্রকৃত ভোটার নিজ ইচ্ছায় দেননি বা দিতে পারেননি। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত—

  • অন্য কারও পরিচয় ব্যবহার করে ভোট প্রদান

  • ভোটার উপস্থিত না থাকলেও তার নামে ব্যালট বা ইভিএমে ভোট পড়ে যাওয়া

  • ভয়ভীতি, চাপ বা প্রভাব প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা

  • একই ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দেওয়া

  • একাধিক কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করা

সহজভাবে বলা যায়, যেখানে ভোটারের স্বাধীন, স্বতঃস্ফূর্ত ও গোপন মতপ্রকাশের সুযোগ থাকে না, সেখানেই জাল ভোটের ঘটনা ঘটে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জাল ভোটের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও অনাস্থা তৈরি করেছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের ওপর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চাপ সবসময়ই থাকে।

আইনে কী বলা আছে?

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–এর ৭৩ থেকে ৮৭ অনুচ্ছেদে নির্বাচনী অপরাধের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। জাল ভোট ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী—

  • নির্বাচনী অনিয়ম বা জাল ভোট প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

  • ভোটকেন্দ্রে অনধিকার প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।

  • অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড—উভয় শাস্তিই দেওয়া যেতে পারে।

ভোটগ্রহণ চলাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন। ফলে নির্বাচনী অপরাধে জড়িত হলে ঘটনাস্থলেই গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

কোন কাজগুলো জাল ভোট হিসেবে গণ্য

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–এর ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি—

  • কোনো প্রার্থীকে সুবিধা দিতে বা অন্য প্রার্থীকে বাধাগ্রস্ত করতে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার সাহায্য গ্রহণ বা প্ররোচিত করেন

  • ভোট দেওয়ার অযোগ্য জেনেও ভোট প্রদান করেন বা ব্যালট চান

  • একই কেন্দ্রে একাধিকবার ভোট দেন

  • একই নির্বাচনে একাধিক কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেন

  • ভোট চলাকালে ব্যালট পেপার সরিয়ে ফেলেন

  • জ্ঞাতসারে অন্য কাউকে এসব কাজে প্ররোচিত করেন বা সহায়তা করেন

তাহলে তা নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জাল ভোটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা জাল ভোট প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।

কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক মামলা, গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি, সিসিটিভি নজরদারি এবং ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মাধ্যমে অনিয়ম ঠেকানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

গণতন্ত্র রক্ষায় নাগরিক সচেতনতা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ করলেই জাল ভোট বন্ধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। ভোটারদেরও সচেতন থাকতে হবে যাতে কেউ তাদের ভোটাধিকার হরণ করতে না পারে।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভোটারদের স্বাধীন, নির্ভয়ে ও আইনসম্মতভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শু/সবা

জনপ্রিয় সংবাদ

জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে বিএনপি

জাল ভোট দিলে যেসব শাস্তি হতে পারে

আপডেট সময় : ০৫:৫৮:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোটাধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। জনগণের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নির্বাচন রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা নির্ধারণ করে। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে এই অধিকার অপব্যবহার করা হলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাংলাদেশে তাই জাল ভোটকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এ বিষয়ে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।

জাল ভোট কী?

জাল ভোট বলতে এমন ভোটকে বোঝায়, যা প্রকৃত ভোটার নিজ ইচ্ছায় দেননি বা দিতে পারেননি। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত—

  • অন্য কারও পরিচয় ব্যবহার করে ভোট প্রদান

  • ভোটার উপস্থিত না থাকলেও তার নামে ব্যালট বা ইভিএমে ভোট পড়ে যাওয়া

  • ভয়ভীতি, চাপ বা প্রভাব প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা

  • একই ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দেওয়া

  • একাধিক কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করা

সহজভাবে বলা যায়, যেখানে ভোটারের স্বাধীন, স্বতঃস্ফূর্ত ও গোপন মতপ্রকাশের সুযোগ থাকে না, সেখানেই জাল ভোটের ঘটনা ঘটে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জাল ভোটের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও অনাস্থা তৈরি করেছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের ওপর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চাপ সবসময়ই থাকে।

আইনে কী বলা আছে?

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–এর ৭৩ থেকে ৮৭ অনুচ্ছেদে নির্বাচনী অপরাধের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। জাল ভোট ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী—

  • নির্বাচনী অনিয়ম বা জাল ভোট প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

  • ভোটকেন্দ্রে অনধিকার প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।

  • অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড—উভয় শাস্তিই দেওয়া যেতে পারে।

ভোটগ্রহণ চলাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন। ফলে নির্বাচনী অপরাধে জড়িত হলে ঘটনাস্থলেই গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

কোন কাজগুলো জাল ভোট হিসেবে গণ্য

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–এর ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি—

  • কোনো প্রার্থীকে সুবিধা দিতে বা অন্য প্রার্থীকে বাধাগ্রস্ত করতে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার সাহায্য গ্রহণ বা প্ররোচিত করেন

  • ভোট দেওয়ার অযোগ্য জেনেও ভোট প্রদান করেন বা ব্যালট চান

  • একই কেন্দ্রে একাধিকবার ভোট দেন

  • একই নির্বাচনে একাধিক কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেন

  • ভোট চলাকালে ব্যালট পেপার সরিয়ে ফেলেন

  • জ্ঞাতসারে অন্য কাউকে এসব কাজে প্ররোচিত করেন বা সহায়তা করেন

তাহলে তা নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জাল ভোটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা জাল ভোট প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।

কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক মামলা, গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি, সিসিটিভি নজরদারি এবং ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মাধ্যমে অনিয়ম ঠেকানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

গণতন্ত্র রক্ষায় নাগরিক সচেতনতা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ করলেই জাল ভোট বন্ধ করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। ভোটারদেরও সচেতন থাকতে হবে যাতে কেউ তাদের ভোটাধিকার হরণ করতে না পারে।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভোটারদের স্বাধীন, নির্ভয়ে ও আইনসম্মতভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শু/সবা