চট্টগ্রামের ‘ক্রাইম জোন’ খ্যাত রাউজান উপজেলা-এ হত্যা, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ ও সহিংসতার লাগাম কিছুতেই টানা যাচ্ছে না। ২৪৬ দশমিক ৫৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। পাহাড়, নদী ও খালবেষ্টিত রাউজানে বসবাস করেন প্রায় ৩ লাখ ৯৬ হাজার মানুষ। শিক্ষার হার প্রায় ৮৫ শতাংশ হলেও কয়েকটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যে পুরো উপজেলা এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাউজানে ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ ঘটনায় দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে। অথচ এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগেরই রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি; মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রকাশ্যে গুলি, আতঙ্কে জনজীবন
একই সময়ে উপজেলায় শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, গুলিবর্ষণ ও হামলা এখন রাউজানের নিত্যদিনের চিত্র। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বালু-মাটি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় এবং অপহরণকে কেন্দ্র করে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছে।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড
সর্বশেষ বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলমিয়া হাট বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ (৫০)-কে। তিনি পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মুখোশধারী একদল অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, আবদুল মজিদের চোখের ওপর, বুকে ও কোমরে মোট তিনটি গুলি লাগে। নিহতের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বলেন, “এর আগেও আমার স্বামীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। এবার আর রক্ষা হলো না। আমি হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
এর আগে একই ইউনিয়নে গত ৫ জানুয়ারি রাতে মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা জানে আলম সিকদার (৫০)। পুলিশ বলছে, দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে একই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম বাবুল অভিযোগ করে বলেন,
“একই ইউনিয়নে, একই কায়দায় দুটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল, অথচ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত কেন্দ্রের কাছেই এসব ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেই।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুলিশ সক্রিয় না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
তবে পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ দপ্তিষ দাশ বলেন,
“মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তদের শনাক্তে কাজ চলছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তালিকা দীর্ঘ
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে রাউজানে সংঘটিত ২১ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৫টিই রাজনৈতিক। নিহতদের মধ্যে ১০ জন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী, চারজন আওয়ামী লীগ-এর সঙ্গে যুক্ত এবং একজন ব্যবসায়ী। অন্যরা সাধারণ নাগরিক।
যৌথ অভিযানের দাবি
উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুস সবুর বলেন,
“রাউজানে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একযোগে যৌথ অভিযান চালাতে হবে। তা না হলে খুন-চাঁদাবাজি কমবে না।”
প্রশাসনের বক্তব্য
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন,
“সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক, তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম জানান, “ইতোমধ্যে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে।”
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল বলেন, “অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”


























