1:54 am, Saturday, 23 May 2026

শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে সংশয়

রংপুর নগরীর প্রাণ হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল দখল ও দূষণে এখন মৃতপ্রায়। জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি প্রবাহ সচল করতে খাল সংস্কারে প্রায় ১৫ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাই বলছে, বর্তমান পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলবে না। ফলে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, “শ্যামাসুন্দরী খাল পুনঃখনন, দূষণরোধ ও বনায়ন” শীর্ষক প্রকল্পে মোট প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে খাল পুনঃখননে ব্যয় হবে প্রায় ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, দূষণমুক্তকরণ ও স্বাস্থ্যবিধান খাতে ৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং বনায়নের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যা শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে।

বর্তমানে চেকপোস্ট থেকে সাতমাথা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সংস্কারকাজ চলছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্থানে শ্রমিকরা বালতি ও কোদাল দিয়ে কাদা-আবর্জনা তুলে খালের পাড়ে ফেলছেন। বৃষ্টির পানিতে সেসব আবার খালেই ফিরে যাচ্ছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

নুরপুর এলাকার বাসিন্দা হাসান জুবায়ের বলেন, “কোটি কোটি টাকার প্রকল্প অথচ খননের কাজ হচ্ছে বালতি দিয়ে। এভাবে কাজ করলে কোনো উন্নয়ন হবে না, শুধু অর্থ অপচয় হবে।”

একসময় প্রায় ১৫০ ফুট প্রশস্ত শ্যামাসুন্দরী খাল এখন অনেক স্থানে ৩০ ফুটেও নেমে এসেছে। খালের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট ও ভবন। কোথাও কচুরিপানা, কোথাও পলিথিন ও গৃহস্থালি বর্জ্যে পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে।

স্থানীয় বাসিন্দা গোলাপী বেগম বলেন, “বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি উপচে ঘরে ঢুকে পড়ে। খালের দুই পাড়ের দখল না সরালে কোনো কাজেই লাভ হবে না।”

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের মতে, শুধু উপরের আবর্জনা পরিষ্কার করে শ্যামাসুন্দরীকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তারা বলছেন, খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ঘাঘট নদীর সঙ্গে সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং পূর্ণাঙ্গ পুনঃখনন ছাড়া এই প্রকল্প টেকসই হবে না।

১৮৯০ সালে রংপুর পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ডিমলার রাজা জানকি বল্লভ সেন তার মা শ্যামাসুন্দরীর স্মরণে এই খাল খনন করেছিলেন। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল রংপুর নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ঘাঘট নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমানে খালের ওপর রয়েছে ৩৫টি সেতু এবং দুই পাশে চার শতাধিক দখলদারের স্থাপনা।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “শ্যামাসুন্দরী এখন আর খাল নেই, এটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। খাল সম্প্রসারণ এখন অনেকটাই হাইপোথিটিক্যাল। বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে ময়লা সরালে পানি প্রবাহ কিছুটা স্বাভাবিক হবে এবং ডেঙ্গুর উপদ্রব কমতে পারে।”

অন্যদিকে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন বলেছেন, নিয়ম মেনেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে এবং কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ রাখা হবে না।

তবে সচেতন নগরবাসীর প্রশ্ন, দখলমুক্ত না করে এবং পানি প্রবাহের মূল উৎস পুনরুদ্ধার ছাড়া শুধুমাত্র সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ করে আদৌ কি শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচানো সম্ভব?

শু/সবা
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

three × one =

About Author Information

ঈদগাঁওয়ে পৃথক অভিযানে ৬ জন গ্রেফতার

শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে সংশয়

Update Time : ০৭:২৯:১১ pm, Friday, ২২ মে ২০২৬

রংপুর নগরীর প্রাণ হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল দখল ও দূষণে এখন মৃতপ্রায়। জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি প্রবাহ সচল করতে খাল সংস্কারে প্রায় ১৫ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাই বলছে, বর্তমান পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মিলবে না। ফলে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, “শ্যামাসুন্দরী খাল পুনঃখনন, দূষণরোধ ও বনায়ন” শীর্ষক প্রকল্পে মোট প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে খাল পুনঃখননে ব্যয় হবে প্রায় ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, দূষণমুক্তকরণ ও স্বাস্থ্যবিধান খাতে ৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং বনায়নের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যা শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে।

বর্তমানে চেকপোস্ট থেকে সাতমাথা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সংস্কারকাজ চলছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্থানে শ্রমিকরা বালতি ও কোদাল দিয়ে কাদা-আবর্জনা তুলে খালের পাড়ে ফেলছেন। বৃষ্টির পানিতে সেসব আবার খালেই ফিরে যাচ্ছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

নুরপুর এলাকার বাসিন্দা হাসান জুবায়ের বলেন, “কোটি কোটি টাকার প্রকল্প অথচ খননের কাজ হচ্ছে বালতি দিয়ে। এভাবে কাজ করলে কোনো উন্নয়ন হবে না, শুধু অর্থ অপচয় হবে।”

একসময় প্রায় ১৫০ ফুট প্রশস্ত শ্যামাসুন্দরী খাল এখন অনেক স্থানে ৩০ ফুটেও নেমে এসেছে। খালের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট ও ভবন। কোথাও কচুরিপানা, কোথাও পলিথিন ও গৃহস্থালি বর্জ্যে পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে।

স্থানীয় বাসিন্দা গোলাপী বেগম বলেন, “বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি উপচে ঘরে ঢুকে পড়ে। খালের দুই পাড়ের দখল না সরালে কোনো কাজেই লাভ হবে না।”

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের মতে, শুধু উপরের আবর্জনা পরিষ্কার করে শ্যামাসুন্দরীকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তারা বলছেন, খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ঘাঘট নদীর সঙ্গে সংযোগ পুনরুদ্ধার এবং পূর্ণাঙ্গ পুনঃখনন ছাড়া এই প্রকল্প টেকসই হবে না।

১৮৯০ সালে রংপুর পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ডিমলার রাজা জানকি বল্লভ সেন তার মা শ্যামাসুন্দরীর স্মরণে এই খাল খনন করেছিলেন। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল রংপুর নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ঘাঘট নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমানে খালের ওপর রয়েছে ৩৫টি সেতু এবং দুই পাশে চার শতাধিক দখলদারের স্থাপনা।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “শ্যামাসুন্দরী এখন আর খাল নেই, এটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। খাল সম্প্রসারণ এখন অনেকটাই হাইপোথিটিক্যাল। বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে ময়লা সরালে পানি প্রবাহ কিছুটা স্বাভাবিক হবে এবং ডেঙ্গুর উপদ্রব কমতে পারে।”

অন্যদিকে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন বলেছেন, নিয়ম মেনেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে এবং কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ রাখা হবে না।

তবে সচেতন নগরবাসীর প্রশ্ন, দখলমুক্ত না করে এবং পানি প্রবাহের মূল উৎস পুনরুদ্ধার ছাড়া শুধুমাত্র সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ করে আদৌ কি শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচানো সম্ভব?

শু/সবা