কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই রংপুর বিভাগের আট জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন অন্তত ২০ জন চিকিৎসক। বছরের পর বছর ধরে কেউ বিদেশে বসবাস করছেন, কেউ বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখছেন, আবার কারও বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত নন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া দুই মাসের বেশি সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১০ বছর পার হয়ে গেলেও নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। ফলে পদগুলো কার্যত আটকে থাকায় নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না এবং চিকিৎসক সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪২টি। সেখানে কাগজে-কলমে কর্মরত রয়েছেন ১৯ জন চিকিৎসক। তবে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন মাত্র ১৪ জন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মেডিকেল অফিসার ডা. শাহেদুর রহমান ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি, ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার একই বছরের ৫ মার্চ এবং ডা. আবু সাদাত মো. সায়েদ শরীফ ২৬ এপ্রিল থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. লুৎফুল কবীর বলেন, “এখানে যোগদানের পর থেকেই ওই তিন চিকিৎসককে কর্মস্থলে পাইনি। তাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। তাদের কোনো খোঁজখবরও পাওয়া যায়নি।”
তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার বর্তমানে রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় তার মালিকানাধীন তালুকদার হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখছেন।
সরকারি কর্মস্থলে কেন যাচ্ছেন না—এ প্রশ্নের জবাবে ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার বলেন, “আমাকে দূরে বদলি করা হয়েছিল। পদোন্নতিও দেওয়া হয়নি। এজন্য আর সেখানে যাইনি। সরকার চাইলে যে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে।”
অন্যদিকে, ডা. শাহেদুর রহমানের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পঞ্চগড় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। কর্মস্থলে দেওয়া তার মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া গেছে।
আরেক চিকিৎসক ডা. আবু সাদাত মো. সায়েদ শরীফ পাভেল প্রায় ছয় বছর আগে সপরিবারে কানাডায় চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। তার বোনজামাই এবং দেবীগঞ্জ উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, “শরীফ প্রায় ছয় বছর আগে পরিবার নিয়ে কানাডায় চলে গেছে। বর্তমানে সেখানেই রয়েছে।”
শুধু পঞ্চগড় নয়, একই চিত্র রংপুর বিভাগের অন্যান্য জেলাতেও দেখা গেছে। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. অনন্যা রায় প্রায় ১০ বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। জানা গেছে, তিনি বর্তমানে পরিবারসহ জাপানে অবস্থান করছেন।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আ.ন.ম. কায়সার আনামও ছয় বছর ধরে কর্মস্থলে নেই। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
ডা. আনামের চাচা কামাল তৌফিকুল ইসলাম বলেন, “করোনার সময়ের পর তিনি লন্ডনে গেছেন। যতদূর জানি, আনাম চাকরি থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েই বিদেশে গেছেন।”
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ প্রায় এক বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পারিবারিক কারণে ঢাকায় আছি। প্রয়োজন হলে চাকরি ছেড়ে দেব।”
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন চিকিৎসক।
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া দুই মাসের বেশি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বছরের পর বছর পার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, “বিভাগে প্রায় ২০ জন চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জহিদ রায়হান বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে এত দীর্ঘ সময়েও কেন চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে একদিকে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন, অন্যদিকে শূন্য পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নতুন চিকিৎসক নিয়োগও সম্ভব হবে না। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সংকট আরও গভীর হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, “বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে এসব চিকিৎসক রাষ্ট্রীয় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ফৌজদারি ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে।”
শু/সবা
রংপুর ব্যুরো: 



















