গাইবান্ধা শহরের বুক চিরে একসময় প্রবাহিত হতো ঘাঘট নদী। শহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত এই জলধারা ছিল মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর দুই তীরে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য, জেলেদের জাল ফেলা, শিশুদের সাঁতার আর নৌকার আনাগোনা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ঘাঘট আজ পরিণত হয়েছে কচুরিপানায় ঢেকে থাকা এক মৃতপ্রায় জলাশয়ে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ঘিরে যখন পরিবেশ রক্ষার নানা প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হচ্ছে, তখন গাইবান্ধার ঘাঘট লেকের বর্তমান অবস্থা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে পরিবেশ সংরক্ষণে বাস্তব উদ্যোগ নিয়ে।
১৯৯০ সালে নদীর একটি বাঁক কেটে মূল প্রবাহ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার পর ঘাঘটের প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রবাহহীন এই অংশ ধীরে ধীরে স্থির জলাশয়ে রূপ নেয়। আর সেই স্থির জলই হয়ে ওঠে দূষণ, পলি জমা ও কচুরিপানার বিস্তারের উপযুক্ত ক্ষেত্র। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে লেকটির পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে ঘাঘট লেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। শুরুতে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প পরে বেড়ে প্রায় ২৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। প্রকল্পের আওতায় সেতু, ওয়াকওয়ে, সিঁড়িঘাট, আলোকসজ্জা, বৃক্ষরোপণসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অনেক কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। দুই পাড়ে অবৈধ দখলদারদের কারণে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় উন্নয়নকাজই করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে লেকের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। কিছু স্থানে সেতু ও ওয়াকওয়ে থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট। সিঁড়িঘাটে শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে, বেঞ্চগুলো নষ্ট হওয়ার পথে এবং সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলোর অভাবে এলাকাগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পুরো লেকজুড়ে ছড়িয়ে আছে কচুরিপানার বিশাল স্তর, যার নিচে জমে আছে প্লাস্টিক, পলিথিন ও পচনশীল বর্জ্য।
প্রকল্পে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অসমাপ্ত কাজের পরও কীভাবে অর্থ ছাড় হলো, কেন প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ হয়নি—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্ব বদলের কথা উল্লেখ করে দায় এড়ালেও নাগরিকদের হতাশা কমেনি।
লেকটি পরিষ্কার করতে প্রশাসনের উদ্যোগও স্থায়ী ফল দিতে পারেনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়। পরিবেশ রক্ষা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন পরই সেই কার্যক্রম থেমে যায়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে আবারও একই ধরনের কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। নতুন প্রতিশ্রুতি, নতুন বক্তব্য, নতুন ছবি—কিন্তু লেকের বাস্তব চিত্র অপরিবর্তিত থেকে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত পরিচর্যার কোনো ব্যবস্থা নেই। কচুরিপানা অপসারণের জন্য নেই স্থায়ী জনবল বা যন্ত্রপাতি। ফলে সাময়িকভাবে পরিষ্কার করা হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় লেক।
পরিবেশবিদদের মতে, ঘাঘট লেকের সংকটের বড় কারণ অবৈধ দখল ও অনিয়ন্ত্রিত দূষণ। বছরের পর বছর ধরে লেকের দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে গৃহস্থালি বর্জ্য, বাজারের আবর্জনা এবং বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য প্রতিদিন লেকে ফেলা হচ্ছে। কার্যকর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় দূষণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বাড়ছে, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একসময় মাছসমৃদ্ধ ঘাঘট এখন প্রায় প্রাণহীন। জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঘাঘট লেককে বাঁচাতে হলে কেবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বা প্রতীকী পরিচ্ছন্নতা অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অবৈধ দখল উচ্ছেদে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিয়মিত বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক পদ্ধতিতে কচুরিপানা অপসারণ, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী বাজেট এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা কর্মসূচি।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশ রক্ষার নানা শপথ উচ্চারিত হলেও গাইবান্ধার ঘাঘট লেক যেন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষার জায়গা। একসময় যে জলধারা শহরের প্রাণ ছিল, আজ তা কচুরিপানার সবুজ কাফনে ঢাকা পড়ে নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন একটাই—ঘাঘটকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা কি সত্যিই আছে?
শু/সবা
রংপুর ব্যুরো: 























