9:27 pm, Friday, 5 June 2026

মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৫, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী-শিশু

মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। পাশাপাশি ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

শুক্রবার মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Support Society (HRSS) প্রকাশিত মে মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সারা দেশে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। ফরিদপুরে গুজব ছড়িয়ে এক যুবককে এবং গাজীপুরে চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় এক যুবককে নির্যাতনের পর গরম পানি ঢেলে হত্যার অভিযোগও উঠে এসেছে।

মানবাধিকার সংগঠনটি সুন্দরবনে বন বিভাগের কর্মীদের গুলিতে এক জেলের মৃত্যু এবং জামালপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক যুবকের মৃত্যুকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২৮টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সংঘটিত ৬৪টি ঘটনায় নিহত ৫ জনের মধ্যে বিএনপির একজন, জামায়াতের একজন, United People’s Democratic Front (UPDF)–এর দুজন এবং একজন সাধারণ নারী রয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে এসব সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস।

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। মে মাসে মোট ৩০৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের শিকারদের প্রায় ৭০ শতাংশই ১৮ বছরের কম বয়সী। ধর্ষণের পর ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন শিশু। এছাড়া ৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের ৪২ জনই শিশু।

প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত তিন মাসে হামের উপসর্গ ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ৬০০–এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর Ad-din Medical College Hospital–এ এক দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হামলায় চার বাংলাদেশি নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন স্থানীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৯৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকি পেয়েছেন। একজন সাংবাদিককে আটকও করা হয়েছে। খাগড়াছড়িতে পুরোনো মামলায় এক সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং চট্টগ্রামে সংঘটিত একটি ঘটনায় দুই সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এইচআরএসএস মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচার এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংগঠনটি।

শু/সবা
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

2 + 9 =

About Author Information

বৈষম্যহীন বাজেটে চাই: হাসনাত আবদুল্লাহ

মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৫, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী-শিশু

Update Time : ০৬:৫১:৪৪ pm, Friday, ৫ জুন ২০২৬

মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। পাশাপাশি ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

শুক্রবার মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Support Society (HRSS) প্রকাশিত মে মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সারা দেশে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। ফরিদপুরে গুজব ছড়িয়ে এক যুবককে এবং গাজীপুরে চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় এক যুবককে নির্যাতনের পর গরম পানি ঢেলে হত্যার অভিযোগও উঠে এসেছে।

মানবাধিকার সংগঠনটি সুন্দরবনে বন বিভাগের কর্মীদের গুলিতে এক জেলের মৃত্যু এবং জামালপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক যুবকের মৃত্যুকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২৮টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সংঘটিত ৬৪টি ঘটনায় নিহত ৫ জনের মধ্যে বিএনপির একজন, জামায়াতের একজন, United People’s Democratic Front (UPDF)–এর দুজন এবং একজন সাধারণ নারী রয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে এসব সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস।

নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। মে মাসে মোট ৩০৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের শিকারদের প্রায় ৭০ শতাংশই ১৮ বছরের কম বয়সী। ধর্ষণের পর ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন শিশু। এছাড়া ৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের ৪২ জনই শিশু।

প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত তিন মাসে হামের উপসর্গ ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ৬০০–এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর Ad-din Medical College Hospital–এ এক দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হামলায় চার বাংলাদেশি নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন স্থানীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৯৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকি পেয়েছেন। একজন সাংবাদিককে আটকও করা হয়েছে। খাগড়াছড়িতে পুরোনো মামলায় এক সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং চট্টগ্রামে সংঘটিত একটি ঘটনায় দুই সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এইচআরএসএস মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচার এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংগঠনটি।

শু/সবা