০৪:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কুঁড়ে ঘরে শিকলবন্দী জীবনের সাথে এক বৃদ্ধা

চট্টগ্রাম জেলার রাউজান বাগোয়ান ইউনিয়নের পাঁচখাইন গ্রামে এক বৃদ্ধা মাকে গত দুই বছর ধরে পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। ঝড়াজীর্ণ কুঁড়ে ঘরের নোংরা কক্ষে কাটছে তার বন্দী জীবন। প্রায় ষাট বছর বয়সী এই বৃদ্ধা মায়ের নাম মরিয়ম বেগম। তিনি এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী। পুত্র মোহাম্মদ মামুন প্রবাসী। মেয়ে হ্যাপি বিবাহিত, মেয়ে থাকেন স্বামীর সংসারে।  এই বৃদ্ধা  একজন মানসিক রোগী বলে দাবি একমাত্র পুত্রবধূর। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বৃদ্ধা মরিয়মের প্রবাসী পুত্র মামুনের স্ত্রী–সন্তানের বসবাস কুঁড়ে ঘরের সাথে থাকা সাজানো গোছানো একটি সেমিপাকা বসতঘরে। এলাকার মানুষের কাছ থেকে বৃদ্ধা মায়ের শিকলবন্দী থাকার খবরে সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে কথা হয় প্রবাসী ছেলে মামুনের স্ত্রী জেসমিন আকতারের সাথে। তিনি শাশুড়িকে ‘পাগল’ দাবি করে জানান, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ভয়ে পায়ে শিকল লাগিয়ে রাখা হয়েছে। এমন যুক্তি নিয়ে বাড়ির উঠানে আসেন আশেপাশের আরো বেশ কয়েকজন নারীও। এসব কথাবার্তার মাঝে জেসমিন প্রবাসী স্বামী মামুনকে ভিডিও কলে এনে কথা বলিয়ে দেন এই প্রতিবেদকের সাথে। মামুনও স্ত্রীর সাথে একই যুক্তি তুলে ধরেন। মা মরিয়ম কি অবস্থায় আছে দেখানোর অনুরোধ করলে প্রথমে মামুনের স্ত্রী জেসমিন বলেন, “‘পাগল’ শাশুড়ি দরজা খুলেই যাকে দেখে তাকে মারধর করবে, বেরিয়ে আসতে পারলে জিনিষপত্র ভাঙচুর করবে।” তাকে অভয় দিয়ে আবারও অনুরোধ করলে তিনি দরজা খুলেন। ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখা যায় কুঁড়ের ঘরের ভাঙা নোংরা একটি কক্ষে নিজের মত করে সাজানো বিছানায় শুয়ে আছেন এই বৃদ্ধা। এই সময় পুত্রবধূসহ সংবাদকর্মীদের দেখে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসতেই নিজের পরনের কাপড়চোপড় ঠিকঠাক করে নেন বৃদ্ধা মরিয়ম। শান্ত–স্বভাবে মেহমানদের বসতে চেয়ার দিতে বলেন পুত্রবধূকে। চা–নাস্তাও দিতে বলেন। কেমন আছেন – জানতে চাইলে কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে অভিযোগ করেন তাকে জোর করে এখানে বেঁধে রাখা হয়েছে। এসময় একটি রংয়ের খালি ড্রামের উপর শিকল বাঁধা পা দেখিয়ে বলেন ওরা আমাকে বেঁধে রেখেছে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। এরই মধ্যে শান্তভাবে নিজের পরিচয়ও দেন সাধু ভাষায়। তবে কিছুক্ষণ পর বলতে থাকেন অসংলগ্ন কথাবার্তা। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে তার কথা শুনে ধারণা করা যায় তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত। তবে তার মধ্যে দেখা যায়নি উচ্ছৃঙ্খল কোনো ধরনের আচরণ। মানসিক ভাবে অসুস্থ হলেও সে পাগল নয়, তা স্পষ্ট বোঝা গেছে। শাশুড়িকে ভাল করতে কোনো চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে পুত্রবধূ ঘর থেকে খুঁজে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মানসিক রোগের চিকিৎসক ডা.মহীউদ্দীন এ. শিকদারের একটি ব্যবস্থাপত্র দেখান এবং ওই নির্দেশনা মতো এখনো ওষুধ খাওয়াচ্ছেন বলে জানান। এলাকাবাসীর দাবি ওই বৃদ্ধাকে ঠিকমত চিকিৎসা দিলে ভালো হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখন যেই পরিবেশে তাকে রাখা হয়েছে সেটিও ‘অমানবিক’ বলে তাদের অভিমত। তারা বলেন, সুন্দর পরিবেশে রেখে চিকিৎসা করালে, ভালো খাবার এবং একটু যত্ন নিলে ভালো হয়ে যাবেন তিনি এমন মন্তব্য এলাকাবাসির। প্রতিবেশি ইউপি মেম্বার আবদুল খালেক বলেন, ওই পরিবারকে অনেকবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বৃদ্ধা এই মাকে সুন্দর পরিবেশে রেখে ভালমত চিকিৎসা করাতে। কিন্তু পরিবারটি সেই পরামর্শ আমলে নেয়নি। এলাকাবাসির অভিযোগ গ্রামে এখন প্রচণ্ড শীত। এই শীতের মধ্যে একটি কুঁড়ে ঘরে কিভাবে রাখা সম্ভব। এই পরিবেশে থাকলে শীতের তীব্রতা বাড়লে এই বৃদ্ধা মহিলা ঠাণ্ডায় মরে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
জনপ্রিয় সংবাদ

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডাকাতি মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

কুঁড়ে ঘরে শিকলবন্দী জীবনের সাথে এক বৃদ্ধা

আপডেট সময় : ০৫:৫২:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩
চট্টগ্রাম জেলার রাউজান বাগোয়ান ইউনিয়নের পাঁচখাইন গ্রামে এক বৃদ্ধা মাকে গত দুই বছর ধরে পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। ঝড়াজীর্ণ কুঁড়ে ঘরের নোংরা কক্ষে কাটছে তার বন্দী জীবন। প্রায় ষাট বছর বয়সী এই বৃদ্ধা মায়ের নাম মরিয়ম বেগম। তিনি এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী। পুত্র মোহাম্মদ মামুন প্রবাসী। মেয়ে হ্যাপি বিবাহিত, মেয়ে থাকেন স্বামীর সংসারে।  এই বৃদ্ধা  একজন মানসিক রোগী বলে দাবি একমাত্র পুত্রবধূর। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বৃদ্ধা মরিয়মের প্রবাসী পুত্র মামুনের স্ত্রী–সন্তানের বসবাস কুঁড়ে ঘরের সাথে থাকা সাজানো গোছানো একটি সেমিপাকা বসতঘরে। এলাকার মানুষের কাছ থেকে বৃদ্ধা মায়ের শিকলবন্দী থাকার খবরে সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে কথা হয় প্রবাসী ছেলে মামুনের স্ত্রী জেসমিন আকতারের সাথে। তিনি শাশুড়িকে ‘পাগল’ দাবি করে জানান, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ভয়ে পায়ে শিকল লাগিয়ে রাখা হয়েছে। এমন যুক্তি নিয়ে বাড়ির উঠানে আসেন আশেপাশের আরো বেশ কয়েকজন নারীও। এসব কথাবার্তার মাঝে জেসমিন প্রবাসী স্বামী মামুনকে ভিডিও কলে এনে কথা বলিয়ে দেন এই প্রতিবেদকের সাথে। মামুনও স্ত্রীর সাথে একই যুক্তি তুলে ধরেন। মা মরিয়ম কি অবস্থায় আছে দেখানোর অনুরোধ করলে প্রথমে মামুনের স্ত্রী জেসমিন বলেন, “‘পাগল’ শাশুড়ি দরজা খুলেই যাকে দেখে তাকে মারধর করবে, বেরিয়ে আসতে পারলে জিনিষপত্র ভাঙচুর করবে।” তাকে অভয় দিয়ে আবারও অনুরোধ করলে তিনি দরজা খুলেন। ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখা যায় কুঁড়ের ঘরের ভাঙা নোংরা একটি কক্ষে নিজের মত করে সাজানো বিছানায় শুয়ে আছেন এই বৃদ্ধা। এই সময় পুত্রবধূসহ সংবাদকর্মীদের দেখে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসতেই নিজের পরনের কাপড়চোপড় ঠিকঠাক করে নেন বৃদ্ধা মরিয়ম। শান্ত–স্বভাবে মেহমানদের বসতে চেয়ার দিতে বলেন পুত্রবধূকে। চা–নাস্তাও দিতে বলেন। কেমন আছেন – জানতে চাইলে কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে অভিযোগ করেন তাকে জোর করে এখানে বেঁধে রাখা হয়েছে। এসময় একটি রংয়ের খালি ড্রামের উপর শিকল বাঁধা পা দেখিয়ে বলেন ওরা আমাকে বেঁধে রেখেছে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। এরই মধ্যে শান্তভাবে নিজের পরিচয়ও দেন সাধু ভাষায়। তবে কিছুক্ষণ পর বলতে থাকেন অসংলগ্ন কথাবার্তা। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে তার কথা শুনে ধারণা করা যায় তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত। তবে তার মধ্যে দেখা যায়নি উচ্ছৃঙ্খল কোনো ধরনের আচরণ। মানসিক ভাবে অসুস্থ হলেও সে পাগল নয়, তা স্পষ্ট বোঝা গেছে। শাশুড়িকে ভাল করতে কোনো চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে পুত্রবধূ ঘর থেকে খুঁজে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মানসিক রোগের চিকিৎসক ডা.মহীউদ্দীন এ. শিকদারের একটি ব্যবস্থাপত্র দেখান এবং ওই নির্দেশনা মতো এখনো ওষুধ খাওয়াচ্ছেন বলে জানান। এলাকাবাসীর দাবি ওই বৃদ্ধাকে ঠিকমত চিকিৎসা দিলে ভালো হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখন যেই পরিবেশে তাকে রাখা হয়েছে সেটিও ‘অমানবিক’ বলে তাদের অভিমত। তারা বলেন, সুন্দর পরিবেশে রেখে চিকিৎসা করালে, ভালো খাবার এবং একটু যত্ন নিলে ভালো হয়ে যাবেন তিনি এমন মন্তব্য এলাকাবাসির। প্রতিবেশি ইউপি মেম্বার আবদুল খালেক বলেন, ওই পরিবারকে অনেকবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বৃদ্ধা এই মাকে সুন্দর পরিবেশে রেখে ভালমত চিকিৎসা করাতে। কিন্তু পরিবারটি সেই পরামর্শ আমলে নেয়নি। এলাকাবাসির অভিযোগ গ্রামে এখন প্রচণ্ড শীত। এই শীতের মধ্যে একটি কুঁড়ে ঘরে কিভাবে রাখা সম্ভব। এই পরিবেশে থাকলে শীতের তীব্রতা বাড়লে এই বৃদ্ধা মহিলা ঠাণ্ডায় মরে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।