প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প ছিলো তাঁত । তখনকার সময়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানী যোগ্য প্রধান পন্য ছিলো তাঁত পন্য । সেই ধারাবাধিকতায় দেশের অনেক জেলায় এ তাঁত শিল্প গড়ে ওঠে। আবহমান কাল থেকে তাঁতী সমাজ তাদের নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের মধ্যে সুনামের সহিত পৃথিবী বিখ্যাত তাঁতপন্য তৈরি করে আসছিলো । কিন্তু কালের বিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার অর্থনীতির অপার সম্ভাবনাময় তাঁতশিল্প । বাংলাদেশের তৈরি জামদানী কাপড় সারা বিশ্বে সেইসময়ের রাজা বাদশাদের কাছে সুপরিচিত ছিলো কিন্তু তা আজ শুধু ইতিহাস, এক হিসেব মতে দেখা গেছে আগের তুলনায় এ শিল্পের সাথে জড়িত লোকদের সংখ্যা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ডু উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের তাঁতিরা এক সময় ছিল আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ঐ ঐতিহ্যবাহী পেশা। অনেকটা ক্ষোভ আর লজ্জায় তারা ত্যাগ করছে তাদের আদি পেশা। সুতা রঙ্গিন হলেও তাদের জিবন এখন সাদাকালো । জেলার হরিনাকুন্ডু উপজেলার একতারা মোড় থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার পথ গেলেই ভবানীপুর তাঁতীপাড়া। সেখানে এখন আর খুব বেশী একটা শোনা যায়না সেই তাঁত বুননের ঠুকঠাক শব্দ। যান্ত্রিকতার কাছে হেরে তাঁতী পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়, হাতে বোনা কাপড় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আগামী প্রজন্ম । এমনই একটি প্রশ্নের জবাবে বলেন ভবানীপুর গ্রামের পিন্টু কারিগর ।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায় যে, ভবানীপুর গ্রামে যেখানে ছিলো প্রায় দেড়-দুইশো তাঁত কিনতু সেখানে আছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা তাঁত । তাও পরিচালনা করে নারীরা আর পুরুষরা করে অন্য কর্ম । দৈনিক সবুজ বাংলার প্রতিনিধির প্রশ্নের উত্তরে আসাদ কারিগর বলেন, দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি, মজুরি বেশী, সময়মতো নিকটে সব দ্রব্য না পাওয়ায় জেলা শহর থেকে আনতে অতিরিক্ত খরচ বহন আবার বিক্রির সময় সঠিক মূল্য না পাওয়ায় দিন দিন আমরা এ পেশা থেকে বেড়িয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছি । তারপরও এ পেশা ছাড়তে আমাদের কষ্ট হয় হাজার হলেও আদি পুরুষদের পেশা ।
তিনি আরও বলেন, আমার একটা তাঁত আছে সেটা আমার বউ ও মা চালায় এবং গ্রামের মধ্যে বিক্রি করেন আবার অনেকে শখ করে অর্ডার দিলে সেটা আমরা তৈরি করে দিই । তিনি আরও বলেন, আমাদের এই পাড়ায় আগে তাঁত ছিলো প্রায় দুইশো পরিবারের কিন্তু এখন আছে মাত্র হাতে গোনা আঠারো বা বিশটা পরিবারের মধ্যে, যেমন নজীর কারিগর, জিয়ামত কারিগর, রাজ্জাক কারিগর, কামাল, শফিরদ্দি সহ কয়েকজনের । পরিবর্তিত রুচি ও পছন্দের সাথে সংগতি রেখে তাঁত বস্ত্রেও কিছুটা পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা সামর্থ্য তাঁতী সমাজের কাছে নেই, ফলে তারা সনাতন পদ্ধতিতে সেই সনাতনী মানের কাপড় উৎপাদন করতে বাধ্য হচ্ছে এই জন্যই মূলত তাঁতশিল্পের অবনতি হচ্ছে। তবে আশার কথা হচ্ছে আমার প্রতিষ্ঠান আর.আর.সি ভবানীপুরের কারিগরদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, যেমন অল্প সুদে লোন প্রদান, আর.আর.সির নিজস্ব ডাক্তার দ্বারা তাদের স্বাস্থ্য পরিক্ষা ও বিনা মূল্যে ঔষধ প্রদান সহ ইত্যাদি কাজ করে যাচ্ছে।
তাঁত শিল্পের নানা বিষয় নিয়ে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ৩ নং তাহেরহুদা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজুর রাশেদ সবুজ বাংলাকে বলেন যে, তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত বিভিন্ন উদ্যোক্তরা অস্বচ্ছল। তাই সরকারী উর্ধতন কর্তৃপক্ষ যদি এই শিল্পের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাদেরকে প্রয়োজনীয়ও পুঁজি ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয় তাহলে ঐতিহ্যবাহী এই কুঠির শিল্প আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। আমার ইউনিয়নের মধ্যে বেশ কিছু গ্রামে তাঁতশিল্প আছে যা আজ বিলুপ্তের পথে তাই আমি চেষ্টা করবো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে এদেরকে টিকিয়ে রাখতে ।

























