১১:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মুহুর্মুহু মর্টারশেলে কাঁপছে তমব্রু সীমান্ত

 

মিয়ানমারে যুদ্ধাবস্থার জের

🔰  মর্টারশেল-গুলিতে নারীসহ আহত ৫, বন্ধ ৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

🔰  আতঙ্কে বাড়িছাড়া দুই এলাকার অর্ধশত পরিবার গুলিবিদ্ধ ১০ জনসহ মিয়ানমারের ৬৬  সীমান্তরক্ষীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ

🔰  বিজিবির সঙ্গে কাজ করছে পুলিশ : আইজিপি

🔰  সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক বিজিবি, নৌপথে কোস্টগার্ড

 

দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে থেমে থেমে যুদ্ধ চলছে। মিয়ানমারে আরকান আর্মি যোদ্ধারা হঠাৎ করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠায় দেশটির আরকান রাজ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আরকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার মধ্যে নিয়মিত হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। এই যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলা ও মর্টারশেল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু সীমান্তের লোকালয়ে এসে পড়ছে। এতে তিনজন গুলিবিদ্ধ ও নারীসহ পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মুহুর্মুহু মর্টারশেল বিষ্ফোরণ আর গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠছে ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্ত এলাকা। এর ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় সীমান্তবর্তী এলাকার ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। আতঙ্কিত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দুই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারের প্রায় ৩ হাজার সদস্য নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি যোদ্ধাদের তোপের মুখে টিকতে না পেরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে মিয়ানমার সীমান্ত বাহিনীর (বিজিপি) সশস্ত্র ১৪ সদস্য। তারা বিজিবি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বলেছেন, মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাজুড়ে বিজিবির সঙ্গে কাজ করছে পুলিশ। বিজিবি বলছে, এমন পরিস্থিতিতে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ও সহিংস ঘটনা এড়াতে মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক প্রহরায় রয়েছে বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। অপরদিকে নৌ-পথে নৌ-পুলিশসহ সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে কোস্টগার্ড। গতকাল রোববার বিজিবি-পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, গত দুই সপ্তাহেরও অধিক সময় ধরে আরাকান আর্মি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সামরিক জান্তা কঠোর অবস্থান নিয়ে অভিযান শুরু করে। এতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার আক্রমণ প্রতিরোধে আরকান আর্মি যোদ্ধারা তাদের অবস্থানকে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষসহ প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবার রাতে আরাকান আর্মি যোদ্ধাদের ভয়াবহ আক্রমণে দাঁড়াতে না পেরে গতকাল রোববার সকাল ৮টার দিকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) সশস্ত্র ১৪ সদস্য প্রাণভয়ে পালিয়ে মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখা পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে প্রাণ রক্ষা করেছেন। এ সময় তারা নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের তমব্রু এলাকার বিজিবি ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করে আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনায় সীমান্ত এলাকার হিন্দুপাড়ার ৩ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধসহ ৫ জন আহত হয়েছেন। তারা হলেন- তমব্রু এলাকার হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা রবীন্দ্র ধর, প্রবীন্দ্র ধর, কোনারপাড়ার বাসিন্দা শামসুল আলম ও একজন নারী এবং গত শনিবার রাতে আরেকজন বাংলাদেশি পুরুষ আহত হয়েছেন। ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ি তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মাহাফুজ ইমতিয়াজ ভূঁইয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সীমান্তবাসীরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে মিয়ানমারের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর সংঘাত চলছে। গত শনিবার রাতে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ৩৪ নম্বর রাইট ক্যাম্প দখলে নিতে আরাকান আর্মি হামলা চালায়। এরপর শুরু হয় দুইপক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াই। দুইপক্ষের হাজার হাজার গোলাগুলি ও মর্টারশেল নিক্ষেপের শব্দ শোনা যায়। হামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক।
এসব গোলাবারুদ আর বিস্ফোরকের বিকট শব্দে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের সীমান্ত এলাকা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের ওপারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির একের পর এক সশস্ত্র হামলায় গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ৬৬ জন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী পালিয়ে এসে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। তারা বিজিবির তমব্রু ফাঁড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তমব্রু কোনারপাড়ার বাসিন্দা ভুলু সবুজ বাংলাকে বলেন, গত শনিবার রাত ১১টার দিকে মর্টারশেলের বিস্ফোরিত অংশ আমার ঘরের চাল ভেদ করে ভেতরে পড়েছে। একটুর জন্য আমাদের পরিবার প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। আমরা খুব ভয়ে আছি, ঘরেও নিরাপদে থাকতে পারছি না। ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তিন নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মো. আনোয়ার বলেন, রাত ৩টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। ভোরে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সামনে তমব্রু রাইট ক্যাম্প থেকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৪ থেকে ১৫ সদস্য বিজিবির তমব্রু ক্যাম্পে এসে আশ্রয় নেওয়ার কথা শুনেছি। ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ভোর থেকে মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছে। এতে বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে, ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্তবর্তী এলাকা। এলাকাবাসীদের বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত মিয়ানমারের ছোঁড়া দুটি মর্টারশেল ও একাধিক গুলি এসে পড়েছে তমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে হতাহতের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দুই গ্রামের অর্ধশত পরিবার নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। খবর পেয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন ও পুলিশ সুপার সৈকত শাহিন ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ স্থানীয় প্রশাসনকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন সবুজ বাংলাকে বলেন, এ ঘটনায় আমরা সীমান্তের কয়েকটি সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল সীমিত করে দিয়েছি এবং সীমান্ত লাগায়ো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। তিনি আরো বলেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসনের পাশাপাশি বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল মান্নান সবুজ বাংলাকে বলেন, গতকাল সকাল থেকে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার অভ্যন্তরে গোলাগুলি বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্ত এলাকার বাইশ ফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাজা বনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম কুল তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিজিবি-৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মাশরোকি বলেন, মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের সঙ্গে থেমে থেমে সেনাবাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ চলছে। মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের ফাঁড়ি দখলে নিয়েছে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির যোদ্ধারা। এসময় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিবিদ্ধ ১০ জনসহ এপর্যন্ত ৬৬ জন সশস্ত্র সদস্য সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে উদ্ধার করে ঘুমধুম সীমান্ত বিওপিতে আনা হয়েছে। তাদের থেকে অস্ত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সীমান্তে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি। বিজিবির ৩৪, টেকনাফ ব্যাটালিয়ন প্রধান লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি বিজিবির সেক্টর ও বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এদিকে গতকাল সকালে চট্টগ্রামের ডাঙ্গারচর নৌ-তদন্ত কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, সীমান্তের বিষয়টি নিয়ে বিজিবি কাজ করছে। আমরা বিজিবির সঙ্গে কাজ করছি। বিজিবি আমাদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পাবে, আইনানুগভাবে আমরা সেই সহযোগিতা বিজিবিকে দেব। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে বন্দর আছে। সেজন্য বন্দর থানার পাশাপাশি বন্দর ডিভিশন আছে। শুধু বন্দরের নিরাপত্তা করবে তা না, বন্দর এলাকার নৌ-পথের নিরাপত্তার জন্য সিএমপির সঙ্গে এই ইউনিটের (নৌ পুলিশ) সমন্বয় থাকা দরকার। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়ে আমরা চীনের হস্তক্ষেপ চেয়েছি-কাদের: সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের রেশ বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে। এর ফলে মিয়ানমারে আরাকান আর্মিদের সঙ্গে কনফ্লিক্টের (দ্বন্দ্ব) জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে চায়না একটি ভূমিকা নিতে পারে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টি আমাদের দেশে যাতে প্রভাব না পড়ে সেজন্য আমরা চীনের সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপ আশা করছি। গতকাল রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চায়না একটি ভূমিকা নিতে পারে। রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য একটি বিরাট বোঝা। এমনিতেই বৈশ্বিক কারণে আমরা সংকটে আছি। এদের জন্য যে সাহায্য আসতো সেটিও আগের থেকে অনেক কমে গেছে। তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীন ভূমিকা পালন করতে পারে। সেই বিষয়ে আমি বলেছি। তিনি বলেন, এখন মিয়ানমারের যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আমাদের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত এর রেশ এসে গেছে। আমাদের সীমান্ত থেকে প্রায়শই গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। একটা আতঙ্ক তো ছড়ায়। আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, যুদ্ধটা তাদের অভ্যন্তরীণ। এ বিষয়ে আমরা তাদের (চীন) হস্তক্ষেপ আশা করেছি। চীনের রাষ্ট্রদূত সব কিছুতেই ইতিবাচকভাবে জবাব দিয়েছে বলেও জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরই মধ্যে মিয়ানমারে ১৪ জন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য বাংলাদেশ বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়ির বিজিবির তমব্রু ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, আমি এগুলো নিয়েই বলেছি। ভূ-রাজনীতিতে ভারত এবং চীনের একটা শক্তি, বলয় রয়েছে। তাদের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট আছে। ওগুলোর মধ্যে আমরা নাক গলাতে যাই না। আমাদের ওগুলোর দরকার নাই। আমরা আমাদের স্বার্থ নিয়ে বলব। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা যেন তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হই। আমাদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। এখন মিয়ানমারে আরাকান আর্মিদের সঙ্গে কনফ্লিক্টের জন্য আমরা যে ক্ষতিগ্রস্ত। কিছু কিছু ক্ষতি তো আমাদের হচ্ছেই। কোনো কোনো সময় আমাদের আকাশ সীমা তারা অতিক্রম করছে, এমন রিপোর্টও আছে। মন্ত্রী বলেন, সেই বিষয়গুলোতে তাদের একটু বেশি করে মনোযোগ দেওয়া উচিত। যেহেতু মিয়ানমারের সঙ্গে চায়নার একটা চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। সেজন্য চীন এখানে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে কি না, করলে আমরা উপকৃত হব। এটাই বলেছি। আশ্রয় নেওয়া ১৪ বিজিপি সদস্যকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মিয়ানমারের ভেতরে ভয়াবহ গোলাগুলির মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) ১৪ জন সদস্যকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে ভয়াবহ গোলাগুলি চলছে। ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলমান গোলাগুলিতে প্রকম্পিত পুরো সীমান্ত এলাকা। গোলাগুলির ভয়াবহতা দেখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমারের ১৪ জন বিজিপি সদস্য। তিনি বলেন, বিজিপির একের পর এক ঘাঁটি দখল করে নিচ্ছে আরাকান আর্মি। আমাদের বর্ডারের কাছে যেগুলো ছিল সেগুলো দখল করে নিয়েছে। বিজিপি আত্মরক্ষার্থে আমাদের দেশের ভেতরে ঢুকে সহযোগিতা চেয়েছে। বিজিবি তাদের অবরুদ্ধ করেছেন তাদের অস্ত্র নিয়ে এক জায়গায় আটক করে রাখা হয়েছে। এরা মোট সংখ্যায় ১৪ জন। আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। যাতে তারা এদের নিয়ে যান। মন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমি আশাকরি, খুব শিগগির এদের পাঠিয়ে দেব। আমরা কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাই না। যুদ্ধও চাই না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের সবসময় সেই নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। তবে আমরা সবসময় তৈরি আছি। তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমার সীমান্তে শক্তি বৃদ্ধি করেছি। আমরা পুলিশকে বলে দিয়েছি, কোস্টগার্ডকেও আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। যাতে কোনোভাবেই কেউ আমাদের সীমানায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে। সেই ব্যাপারে আমরা খুব সতর্ক রয়েছি। যুদ্ধ কতদিন চলে আমরা জানি না। কিন্তু সীমান্ত পার হয়ে কাউকে আসতে দেব না। বিজিবিকে আমরা সেই নির্দেশনাটাই দিয়েছি। আত্মরক্ষার্থে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী বাংলাদেশে ঢুকলে তাদের ধরে আবার ফেরত পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রতিবন্ধকতা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, তার পরও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে সরকারের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

 

 

 

স/ম

জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

মুহুর্মুহু মর্টারশেলে কাঁপছে তমব্রু সীমান্ত

আপডেট সময় : ১২:১০:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

 

মিয়ানমারে যুদ্ধাবস্থার জের

🔰  মর্টারশেল-গুলিতে নারীসহ আহত ৫, বন্ধ ৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

🔰  আতঙ্কে বাড়িছাড়া দুই এলাকার অর্ধশত পরিবার গুলিবিদ্ধ ১০ জনসহ মিয়ানমারের ৬৬  সীমান্তরক্ষীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ

🔰  বিজিবির সঙ্গে কাজ করছে পুলিশ : আইজিপি

🔰  সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক বিজিবি, নৌপথে কোস্টগার্ড

 

দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে থেমে থেমে যুদ্ধ চলছে। মিয়ানমারে আরকান আর্মি যোদ্ধারা হঠাৎ করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠায় দেশটির আরকান রাজ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আরকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার মধ্যে নিয়মিত হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। এই যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলা ও মর্টারশেল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু সীমান্তের লোকালয়ে এসে পড়ছে। এতে তিনজন গুলিবিদ্ধ ও নারীসহ পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মুহুর্মুহু মর্টারশেল বিষ্ফোরণ আর গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠছে ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্ত এলাকা। এর ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় সীমান্তবর্তী এলাকার ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। আতঙ্কিত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দুই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারের প্রায় ৩ হাজার সদস্য নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি যোদ্ধাদের তোপের মুখে টিকতে না পেরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে মিয়ানমার সীমান্ত বাহিনীর (বিজিপি) সশস্ত্র ১৪ সদস্য। তারা বিজিবি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বলেছেন, মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাজুড়ে বিজিবির সঙ্গে কাজ করছে পুলিশ। বিজিবি বলছে, এমন পরিস্থিতিতে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ও সহিংস ঘটনা এড়াতে মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক প্রহরায় রয়েছে বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। অপরদিকে নৌ-পথে নৌ-পুলিশসহ সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে কোস্টগার্ড। গতকাল রোববার বিজিবি-পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, গত দুই সপ্তাহেরও অধিক সময় ধরে আরাকান আর্মি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সামরিক জান্তা কঠোর অবস্থান নিয়ে অভিযান শুরু করে। এতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার আক্রমণ প্রতিরোধে আরকান আর্মি যোদ্ধারা তাদের অবস্থানকে ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষসহ প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবার রাতে আরাকান আর্মি যোদ্ধাদের ভয়াবহ আক্রমণে দাঁড়াতে না পেরে গতকাল রোববার সকাল ৮টার দিকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) সশস্ত্র ১৪ সদস্য প্রাণভয়ে পালিয়ে মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখা পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে প্রাণ রক্ষা করেছেন। এ সময় তারা নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের তমব্রু এলাকার বিজিবি ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করে আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনায় সীমান্ত এলাকার হিন্দুপাড়ার ৩ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধসহ ৫ জন আহত হয়েছেন। তারা হলেন- তমব্রু এলাকার হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা রবীন্দ্র ধর, প্রবীন্দ্র ধর, কোনারপাড়ার বাসিন্দা শামসুল আলম ও একজন নারী এবং গত শনিবার রাতে আরেকজন বাংলাদেশি পুরুষ আহত হয়েছেন। ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ি তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মাহাফুজ ইমতিয়াজ ভূঁইয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সীমান্তবাসীরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে মিয়ানমারের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর সংঘাত চলছে। গত শনিবার রাতে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ৩৪ নম্বর রাইট ক্যাম্প দখলে নিতে আরাকান আর্মি হামলা চালায়। এরপর শুরু হয় দুইপক্ষের মধ্যে তীব্র লড়াই। দুইপক্ষের হাজার হাজার গোলাগুলি ও মর্টারশেল নিক্ষেপের শব্দ শোনা যায়। হামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক।
এসব গোলাবারুদ আর বিস্ফোরকের বিকট শব্দে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের সীমান্ত এলাকা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের ওপারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির একের পর এক সশস্ত্র হামলায় গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ৬৬ জন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী পালিয়ে এসে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। তারা বিজিবির তমব্রু ফাঁড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তমব্রু কোনারপাড়ার বাসিন্দা ভুলু সবুজ বাংলাকে বলেন, গত শনিবার রাত ১১টার দিকে মর্টারশেলের বিস্ফোরিত অংশ আমার ঘরের চাল ভেদ করে ভেতরে পড়েছে। একটুর জন্য আমাদের পরিবার প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। আমরা খুব ভয়ে আছি, ঘরেও নিরাপদে থাকতে পারছি না। ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তিন নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মো. আনোয়ার বলেন, রাত ৩টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। ভোরে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের সামনে তমব্রু রাইট ক্যাম্প থেকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৪ থেকে ১৫ সদস্য বিজিবির তমব্রু ক্যাম্পে এসে আশ্রয় নেওয়ার কথা শুনেছি। ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ভোর থেকে মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছে। এতে বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে, ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্তবর্তী এলাকা। এলাকাবাসীদের বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত মিয়ানমারের ছোঁড়া দুটি মর্টারশেল ও একাধিক গুলি এসে পড়েছে তমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে হতাহতের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দুই গ্রামের অর্ধশত পরিবার নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। খবর পেয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন ও পুলিশ সুপার সৈকত শাহিন ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ স্থানীয় প্রশাসনকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন সবুজ বাংলাকে বলেন, এ ঘটনায় আমরা সীমান্তের কয়েকটি সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল সীমিত করে দিয়েছি এবং সীমান্ত লাগায়ো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। তিনি আরো বলেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসনের পাশাপাশি বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল মান্নান সবুজ বাংলাকে বলেন, গতকাল সকাল থেকে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার অভ্যন্তরে গোলাগুলি বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্ত এলাকার বাইশ ফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাজা বনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম কুল তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিজিবি-৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মাশরোকি বলেন, মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের সঙ্গে থেমে থেমে সেনাবাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ চলছে। মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের ফাঁড়ি দখলে নিয়েছে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির যোদ্ধারা। এসময় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিবিদ্ধ ১০ জনসহ এপর্যন্ত ৬৬ জন সশস্ত্র সদস্য সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে উদ্ধার করে ঘুমধুম সীমান্ত বিওপিতে আনা হয়েছে। তাদের থেকে অস্ত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সীমান্তে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি। বিজিবির ৩৪, টেকনাফ ব্যাটালিয়ন প্রধান লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি বিজিবির সেক্টর ও বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এদিকে গতকাল সকালে চট্টগ্রামের ডাঙ্গারচর নৌ-তদন্ত কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, সীমান্তের বিষয়টি নিয়ে বিজিবি কাজ করছে। আমরা বিজিবির সঙ্গে কাজ করছি। বিজিবি আমাদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পাবে, আইনানুগভাবে আমরা সেই সহযোগিতা বিজিবিকে দেব। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে বন্দর আছে। সেজন্য বন্দর থানার পাশাপাশি বন্দর ডিভিশন আছে। শুধু বন্দরের নিরাপত্তা করবে তা না, বন্দর এলাকার নৌ-পথের নিরাপত্তার জন্য সিএমপির সঙ্গে এই ইউনিটের (নৌ পুলিশ) সমন্বয় থাকা দরকার। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়ে আমরা চীনের হস্তক্ষেপ চেয়েছি-কাদের: সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের রেশ বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে। এর ফলে মিয়ানমারে আরাকান আর্মিদের সঙ্গে কনফ্লিক্টের (দ্বন্দ্ব) জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে চায়না একটি ভূমিকা নিতে পারে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টি আমাদের দেশে যাতে প্রভাব না পড়ে সেজন্য আমরা চীনের সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপ আশা করছি। গতকাল রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চায়না একটি ভূমিকা নিতে পারে। রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য একটি বিরাট বোঝা। এমনিতেই বৈশ্বিক কারণে আমরা সংকটে আছি। এদের জন্য যে সাহায্য আসতো সেটিও আগের থেকে অনেক কমে গেছে। তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীন ভূমিকা পালন করতে পারে। সেই বিষয়ে আমি বলেছি। তিনি বলেন, এখন মিয়ানমারের যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আমাদের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত এর রেশ এসে গেছে। আমাদের সীমান্ত থেকে প্রায়শই গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। একটা আতঙ্ক তো ছড়ায়। আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, যুদ্ধটা তাদের অভ্যন্তরীণ। এ বিষয়ে আমরা তাদের (চীন) হস্তক্ষেপ আশা করেছি। চীনের রাষ্ট্রদূত সব কিছুতেই ইতিবাচকভাবে জবাব দিয়েছে বলেও জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরই মধ্যে মিয়ানমারে ১৪ জন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য বাংলাদেশ বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়ির বিজিবির তমব্রু ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, আমি এগুলো নিয়েই বলেছি। ভূ-রাজনীতিতে ভারত এবং চীনের একটা শক্তি, বলয় রয়েছে। তাদের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট আছে। ওগুলোর মধ্যে আমরা নাক গলাতে যাই না। আমাদের ওগুলোর দরকার নাই। আমরা আমাদের স্বার্থ নিয়ে বলব। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা যেন তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হই। আমাদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। এখন মিয়ানমারে আরাকান আর্মিদের সঙ্গে কনফ্লিক্টের জন্য আমরা যে ক্ষতিগ্রস্ত। কিছু কিছু ক্ষতি তো আমাদের হচ্ছেই। কোনো কোনো সময় আমাদের আকাশ সীমা তারা অতিক্রম করছে, এমন রিপোর্টও আছে। মন্ত্রী বলেন, সেই বিষয়গুলোতে তাদের একটু বেশি করে মনোযোগ দেওয়া উচিত। যেহেতু মিয়ানমারের সঙ্গে চায়নার একটা চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। সেজন্য চীন এখানে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে কি না, করলে আমরা উপকৃত হব। এটাই বলেছি। আশ্রয় নেওয়া ১৪ বিজিপি সদস্যকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মিয়ানমারের ভেতরে ভয়াবহ গোলাগুলির মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) ১৪ জন সদস্যকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে ভয়াবহ গোলাগুলি চলছে। ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলমান গোলাগুলিতে প্রকম্পিত পুরো সীমান্ত এলাকা। গোলাগুলির ভয়াবহতা দেখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমারের ১৪ জন বিজিপি সদস্য। তিনি বলেন, বিজিপির একের পর এক ঘাঁটি দখল করে নিচ্ছে আরাকান আর্মি। আমাদের বর্ডারের কাছে যেগুলো ছিল সেগুলো দখল করে নিয়েছে। বিজিপি আত্মরক্ষার্থে আমাদের দেশের ভেতরে ঢুকে সহযোগিতা চেয়েছে। বিজিবি তাদের অবরুদ্ধ করেছেন তাদের অস্ত্র নিয়ে এক জায়গায় আটক করে রাখা হয়েছে। এরা মোট সংখ্যায় ১৪ জন। আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। যাতে তারা এদের নিয়ে যান। মন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমি আশাকরি, খুব শিগগির এদের পাঠিয়ে দেব। আমরা কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাই না। যুদ্ধও চাই না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের সবসময় সেই নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। তবে আমরা সবসময় তৈরি আছি। তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমার সীমান্তে শক্তি বৃদ্ধি করেছি। আমরা পুলিশকে বলে দিয়েছি, কোস্টগার্ডকেও আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। যাতে কোনোভাবেই কেউ আমাদের সীমানায় অনুপ্রবেশ করতে না পারে। সেই ব্যাপারে আমরা খুব সতর্ক রয়েছি। যুদ্ধ কতদিন চলে আমরা জানি না। কিন্তু সীমান্ত পার হয়ে কাউকে আসতে দেব না। বিজিবিকে আমরা সেই নির্দেশনাটাই দিয়েছি। আত্মরক্ষার্থে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী বাংলাদেশে ঢুকলে তাদের ধরে আবার ফেরত পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রতিবন্ধকতা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, তার পরও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে সরকারের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

 

 

 

স/ম