১০:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বইমেলায় আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর অনুবাদ বই ‘তাহমাসনামা’

বইমেলার নতুন অনুবাদ বই ‘তাহমাসনামা’। ফারসি ভাষার মূল লেখক তাহমাস বেগ খান থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেন সেতু মাধব রাও (১৯৬৭)। বাংলা ভাষান্তরে আনলেন লেখক ও অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। নান্দনিক প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশ করছে বাতিঘর। বইমেলায় ১১৭-১২০ নম্বর স্টলে বইটি পাওয়া যাবে। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৪৮০ টাকা।

‘বাতিঘর’ থেকে প্রকাশিত আমার অনূদিত আরো দুটি বই নোবেল বিজয়ী ওরহান পামুকের ‘ইস্তাম্বুল’ এবং খুশবন্ত সিং এর ‘বারিয়্যাল অ্যাট সী’ পাওয়া যাবে।

এক মোগল ক্রীতদাস তাহমাস বেগ খানের আত্মজীবনী “তাহমাসনামা” সম্পর্কে জানতে পারি পঁচিশ বছর আগে। মোগল ইতিহাসের ওপর গ্রন্থ অনুবাদে আমার আগ্রহ সম্পর্কে কবি বন্ধু ও সহকর্মী আবদুল হাই শিকদার অবগত। তিনি আমাকে অনুরোধ করেন ‘তাহমাসনামা’ অনুবাদ করতে। দীর্ঘদিন পূর্বে বইটি ভারতে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হলেও সেটি সহজে পাওয়ার উপায় ছিল না। বিভিন্ন সূত্র থেকে বইটির পর্যালোচনা পাঠ করার মধ্যেই আমাকে তৃপ্ত থাকতে হয়েছে। বইটি যখন আমার হাতে আসে, তখন সেটি অনুবাদ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনেককে বলেছিলামও যে বইটি আমি অনুবাদ করব না। কিন্তু পঁচিশ বছর পর কিছুটা কষ্ট এবং কিছুটা অপমানবোধ থেকেই বইটির অনুবাদে হাত দেই।

বই নিয়ে আলাপ
পারস্যের শাসক নাদির শাহের সেনাবাহিনীতে উজবেকদেরও অংশগ্রহণ ছিল। বৃহত্তর তুরস্কের আর্মেনিয়া অথবা কুর্দিস্তানে উজবেকদের কোনো এক অভিযানের সময় বেশ কিছুসংখ্যক শিশুর সঙ্গে সাত বছর বয়স্ক তাহমাস বেগ খানকেও অপহরণ করে হিন্দুস্থানে এনে পাঞ্জাবের সুবেদার মুইন-উল-মুলককে (১৭৪৮-১৭৫৩) উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। তিনি তাহমাসকে সামরিক প্রশিক্ষণ দান করেন। তাহমাস খানের মা বাবার স্মৃতি ছিল না, জন্মস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না তার। এক পর্যায়ে তিনি সৈনিকের জীবন বেছে নেন এবং মোগলদের অধীনস্থ বেশ ক’জন আঞ্চলিক শাসক ও সেনাপতির অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

জীবনের পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাহমাস খান তার স্মৃতিকথা লেখার উদ্যোগ নিয়ে নয় মাসের মধ্যে সেটি শেষ করেন। এটি ‘তাহমাসনামা’ নামে বহুল পরিচিত হলেও বিভিন্ন বিবরণীতে এটিকে ‘তাহমাসপনামাহ,’ ‘তাজকিরাহি তাহমাসপ,’ ‘হিকায়াত তাহমাস মিসকিন.’ অথবা ‘কিসসা তাহমাস মিসকিন,’ নামও পাওয়া যায়। ‘তাহমাসনামা’র মূল ফারসি পাণ্ডুলিপি লন্ডনে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। ভারতের পাটনায় ওরিয়েন্টাল পাবলিক (খোদাবখশ) লাইব্রেরি এবং অমৃতসরে খালসা কলেজের শিখ হিস্টরি রিসার্চ ডিপার্টমেন্টে এই পাণ্ডুলিপির ফটোকপি রয়েছে। তাহমাস খানের হাতে লেখা ফারসি পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৫৪। আত্মজীবনীর ধাঁচে লেখা স্মৃতিকথায় কোনো তারিখ উল্লেখ করা হয়নি এবং এলোমেলোভাবে ১০৮টি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে।

‘তাহমাস নামা’ ফারসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন,  ‘পাগদি সেতুমাধব রাও,’ এটি মূল ‘তাহমাসনামা’র সংক্ষিপ্ত রূপ। এতে অষ্টাদশ শতাব্দির পাঞ্জাবের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা উঠে এসেছে। পাশাপাশি মোগল রাজধানী দিল্লির ঘটনাবলী ও সেখানে বিরাজমান অবস্থা, আহমদ শাহ আবদালির কয়েক দফা হামলার ঘটনা সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে, যা লেখক স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেছেন অথবা সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। মূল লেখক যদিও তার বিবরণীতে কোনো তারিখ বা সময় উল্লেখ করেননি, কিন্তু ইংরেজি অনুবাদক বিশ্বস্ততার সঙ্গে মূল ফারসি বর্ণনায় কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে অত্যন্ত ধৈর্য্যের সঙ্গে প্রযোজ্য স্থানে তারিখ ও সময়কাল যোগ করে গ্রন্থটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন।

ইংরেজি অনুবাদক গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ১৯৬৭ সালে ইংরেজিতে ‘তাহমাসনামা’ অনুবাদ করার আগেও মূল ফারসি গ্রন্থকে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন স্যার যদুনাথ সরকার, হরি রাম গুপ্ত, গোবিন্দ সিং এবং অন্যান্য খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ। দক্ষিণ ভারতে খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ ড. পি এম জোশি ‘তাহমাসনামা’র একটি কপি তাকে দেন। কাজটি আকারে বৃহৎ হওয়ায় তিনি এর বিস্তারিত অনুবাদ করেননি। তবে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বাদ না দিয়ে সংক্ষিপ্ত করেছেন।

আশা করি, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস পাঠে আগ্রহী পাঠক গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ গ্রহণ করবেন। ‘তাহমাসনামা’ প্রকাশের ব্যবস্থা করায় আমি প্রকাশনা সংস্থা ‘বাতিঘর’ এর সত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাস এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবি জাফর আহমদ রাশেদের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রচ্ছদ শিল্পীকেও ধন্যবাদ যিনি গ্রন্থটির চমৎকার পরিচ্ছন্ন প্রচ্ছদ করেছেন।

 

 

 

স/মিফা

বইমেলায় আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর অনুবাদ বই ‘তাহমাসনামা’

আপডেট সময় : ০৬:৪৩:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

বইমেলার নতুন অনুবাদ বই ‘তাহমাসনামা’। ফারসি ভাষার মূল লেখক তাহমাস বেগ খান থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেন সেতু মাধব রাও (১৯৬৭)। বাংলা ভাষান্তরে আনলেন লেখক ও অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। নান্দনিক প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশ করছে বাতিঘর। বইমেলায় ১১৭-১২০ নম্বর স্টলে বইটি পাওয়া যাবে। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৪৮০ টাকা।

‘বাতিঘর’ থেকে প্রকাশিত আমার অনূদিত আরো দুটি বই নোবেল বিজয়ী ওরহান পামুকের ‘ইস্তাম্বুল’ এবং খুশবন্ত সিং এর ‘বারিয়্যাল অ্যাট সী’ পাওয়া যাবে।

এক মোগল ক্রীতদাস তাহমাস বেগ খানের আত্মজীবনী “তাহমাসনামা” সম্পর্কে জানতে পারি পঁচিশ বছর আগে। মোগল ইতিহাসের ওপর গ্রন্থ অনুবাদে আমার আগ্রহ সম্পর্কে কবি বন্ধু ও সহকর্মী আবদুল হাই শিকদার অবগত। তিনি আমাকে অনুরোধ করেন ‘তাহমাসনামা’ অনুবাদ করতে। দীর্ঘদিন পূর্বে বইটি ভারতে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হলেও সেটি সহজে পাওয়ার উপায় ছিল না। বিভিন্ন সূত্র থেকে বইটির পর্যালোচনা পাঠ করার মধ্যেই আমাকে তৃপ্ত থাকতে হয়েছে। বইটি যখন আমার হাতে আসে, তখন সেটি অনুবাদ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনেককে বলেছিলামও যে বইটি আমি অনুবাদ করব না। কিন্তু পঁচিশ বছর পর কিছুটা কষ্ট এবং কিছুটা অপমানবোধ থেকেই বইটির অনুবাদে হাত দেই।

বই নিয়ে আলাপ
পারস্যের শাসক নাদির শাহের সেনাবাহিনীতে উজবেকদেরও অংশগ্রহণ ছিল। বৃহত্তর তুরস্কের আর্মেনিয়া অথবা কুর্দিস্তানে উজবেকদের কোনো এক অভিযানের সময় বেশ কিছুসংখ্যক শিশুর সঙ্গে সাত বছর বয়স্ক তাহমাস বেগ খানকেও অপহরণ করে হিন্দুস্থানে এনে পাঞ্জাবের সুবেদার মুইন-উল-মুলককে (১৭৪৮-১৭৫৩) উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। তিনি তাহমাসকে সামরিক প্রশিক্ষণ দান করেন। তাহমাস খানের মা বাবার স্মৃতি ছিল না, জন্মস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না তার। এক পর্যায়ে তিনি সৈনিকের জীবন বেছে নেন এবং মোগলদের অধীনস্থ বেশ ক’জন আঞ্চলিক শাসক ও সেনাপতির অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

জীবনের পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাহমাস খান তার স্মৃতিকথা লেখার উদ্যোগ নিয়ে নয় মাসের মধ্যে সেটি শেষ করেন। এটি ‘তাহমাসনামা’ নামে বহুল পরিচিত হলেও বিভিন্ন বিবরণীতে এটিকে ‘তাহমাসপনামাহ,’ ‘তাজকিরাহি তাহমাসপ,’ ‘হিকায়াত তাহমাস মিসকিন.’ অথবা ‘কিসসা তাহমাস মিসকিন,’ নামও পাওয়া যায়। ‘তাহমাসনামা’র মূল ফারসি পাণ্ডুলিপি লন্ডনে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। ভারতের পাটনায় ওরিয়েন্টাল পাবলিক (খোদাবখশ) লাইব্রেরি এবং অমৃতসরে খালসা কলেজের শিখ হিস্টরি রিসার্চ ডিপার্টমেন্টে এই পাণ্ডুলিপির ফটোকপি রয়েছে। তাহমাস খানের হাতে লেখা ফারসি পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৫৪। আত্মজীবনীর ধাঁচে লেখা স্মৃতিকথায় কোনো তারিখ উল্লেখ করা হয়নি এবং এলোমেলোভাবে ১০৮টি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে।

‘তাহমাস নামা’ ফারসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন,  ‘পাগদি সেতুমাধব রাও,’ এটি মূল ‘তাহমাসনামা’র সংক্ষিপ্ত রূপ। এতে অষ্টাদশ শতাব্দির পাঞ্জাবের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা উঠে এসেছে। পাশাপাশি মোগল রাজধানী দিল্লির ঘটনাবলী ও সেখানে বিরাজমান অবস্থা, আহমদ শাহ আবদালির কয়েক দফা হামলার ঘটনা সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে, যা লেখক স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেছেন অথবা সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। মূল লেখক যদিও তার বিবরণীতে কোনো তারিখ বা সময় উল্লেখ করেননি, কিন্তু ইংরেজি অনুবাদক বিশ্বস্ততার সঙ্গে মূল ফারসি বর্ণনায় কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে অত্যন্ত ধৈর্য্যের সঙ্গে প্রযোজ্য স্থানে তারিখ ও সময়কাল যোগ করে গ্রন্থটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন।

ইংরেজি অনুবাদক গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ১৯৬৭ সালে ইংরেজিতে ‘তাহমাসনামা’ অনুবাদ করার আগেও মূল ফারসি গ্রন্থকে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন স্যার যদুনাথ সরকার, হরি রাম গুপ্ত, গোবিন্দ সিং এবং অন্যান্য খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ। দক্ষিণ ভারতে খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ ড. পি এম জোশি ‘তাহমাসনামা’র একটি কপি তাকে দেন। কাজটি আকারে বৃহৎ হওয়ায় তিনি এর বিস্তারিত অনুবাদ করেননি। তবে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বাদ না দিয়ে সংক্ষিপ্ত করেছেন।

আশা করি, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস পাঠে আগ্রহী পাঠক গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ গ্রহণ করবেন। ‘তাহমাসনামা’ প্রকাশের ব্যবস্থা করায় আমি প্রকাশনা সংস্থা ‘বাতিঘর’ এর সত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাস এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবি জাফর আহমদ রাশেদের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রচ্ছদ শিল্পীকেও ধন্যবাদ যিনি গ্রন্থটির চমৎকার পরিচ্ছন্ন প্রচ্ছদ করেছেন।

 

 

 

স/মিফা