০৮:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দেশে প্রতিদিন যক্ষ্মায় মারা যায় ১১৫ জন

বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস আজ

 

‘যার হয় যক্ষ্মা তার নেই রক্ষা’ এই কথাটি এখন আর সবার ক্ষেত্রে সত্যি নয়। অনেক যক্ষ্মারোগী চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পাচ্ছে। এরপরও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ১১৫ জন। আর সারা বছরে মৃত্যুবরণ করছে ৪২ হাজার মানুষ। এই অবস্থার পরিবর্তনে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

যক্ষ্মা বা টিবি জীবাণুঘটিত দীর্ঘস্থায়ী এক সংক্রামক ব্যাধি। এটি একটি প্রাচীন রোগ। পঞ্চম শতকের প্রথম দিক থেকেই এটি মারাত্মক রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যক্ষ্মা জীবাণুর বিভিন্ন জাত গৃহপালিত পশু ও বন্য প্রাণীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটায়। এ রোগ সচরাচর ফুসফুসের ক্ষতি করে, কিন্তু শ্বাসতন্ত্র, অস্থি ও অস্থিসন্ধি, ত্বক, লসিকাগ্রন্থি, অন্ত্র, কিডনি এবং স্নায়ুতন্ত্রও আক্রমণ করে। শ্বাসগ্রহণের সময় জীবাণু ফুসফুসে প্রবেশ করলেই সাধারণত সংক্রমণ ঘটে। দূষিত খাদ্যগ্রহণেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। যক্ষ্মাগ্রস্ত ব্যক্তির হাঁচি ও কাশি থেকে নির্গত কফ বা থুথুর কণাগুলো অন্যের শরীরে ও বাতাসে জীবাণু ছড়ায়। এসব জীবাণু বাতাসে, শুষ্ক কফ ও থুথুতে এবং ধুলাবালিতে দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকে। রোগটি অন্যদের তুলনায় একই পরিবারের লোকদের মধ্যে অধিক পরিমাণে সংক্রমিত হয়ে থাকে, কেননা এক পরিবারের সদস্যরা একই বাড়িতে বসবাস করে, একই টেবিলে খাবার খায় ও পরস্পরের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে। তবে যক্ষ্মা বংশানুক্রমিক রোগ নয়।

 

বিজ্ঞানী রবার্ট কচ যক্ষ্মা রোগের জীবাণু আবিষ্কার করেছেন। মূলত তারই স্মরণে ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়। দিবসটি ঘিরে এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- হ্যাঁ, আমরা যক্ষ্মা নিমূল করতে পারি। যক্ষ্মা বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়ায় মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সরকার দেশ থেকে যক্ষ্মা নির্মূলে কাজ করছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে ডিস্ট্রিক্ট স্যার্ভিলেন্স মেডিক্যাল অফিসার (ডিএসএমও) তত্ত্বাবধানে সব জেলায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সেবা পর্যবেক্ষণ, নজরদারি ও তদারকি অনেক ত্বরান্বিত হয়েছে। গত বছর ডিএসএমওদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি উপজেলায় ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (এমডি আর যক্ষ্মা) চিকিৎসা সেবা শুরু করেছে সরকার। এতে রোগীর ভোগান্তি কমেছে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়। ফলে রোগ ছড়ানো প্রবণতা কমবে। বর্তমানে দেশে যক্ষ্মা রোগীর পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় গণসচেতনতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে যক্ষ্মা নিয়ে সেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আপডেট যক্ষা গাইড লাইনের বিস্তারিত দিয়ে যক্ষ্মা কার্যক্রম ত্বরানিত করছে।

 

২০২৩ সালে যক্ষ্মা উপসর্গ আছে এমন প্রায় ৩০ লক্ষ বেশি লোকের যক্ষ্মা রোগের পরীক্ষা করা হয়েছে। যার মধ্যে ৩,০১,৫৬৪ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে, প্রায় ২৭২৯ জন ঔষধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (এমডিআর) রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে যক্ষ্মা প্রতিরোধী ঔষধ (টিপিটি) ১,৬৫,৬৩৯ জনকে প্রদান করা হয়েছে।

২০২২ সাল থেকে সরকার দেশী ঔষধ কোম্পানির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে যক্ষ্মা চিকিৎসার প্রথম সারির ঔষধ উৎপাদন ও ক্রয় করা হয়েছে। জেলখানা, শহরাঞ্চলের বস্তি এলাকায়, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে গার্মেন্টে কর্মরত শ্রমিকদের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে মোবাইল ভ্যান (জিনএক্সপার্ট ও ডিজিটাল এক্সরে মেশিন) দিয়ে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণ কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে।
যক্ষ্মা প্রতিরোধী ওষুধ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ডিএসএমওরা রোগীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে অথবা সভায় যাদের যক্ষ্মা নেই, তাদের যেন যক্ষ্মা ভবিষ্যতে না হয়, সেজন্য চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এই কর্মীরা প্রতিদিন রোগীর বাড়িতে গিয়ে নিজে সামনে বসিয়ে রোগীকে ওষুধ খাওয়াচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবারের অন্য সব সদস্যকে এই রোগ যেন আক্রমণ না করতে পারে এর জন্য ঔষধ খাওয়াচ্ছে। যক্ষ্মার চিকিৎসার মধ্যে রয়েছেÑ অ্যান্টিবায়োটিক সেবন। সাধারণত ৬-৯ মাসব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হবে। যক্ষ্মা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে জিন এক্সপার্ট, ট্রুনেটসহ অত্যাধুনিক ব্যয়বহুল যন্ত্র উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ দিয়েছে। যা যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে আরো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এতে দ্রুত উপজেলা পর্যায়ে যক্ষ্মার ধরন নির্ধারণ করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু হচ্ছে। ফলে রোগ বাতাসের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে কম, যা রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কাজ করতে থাকলে জাতীয় যক্ষ্মা কর্মসূচির যে উদ্দেশ্য যে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুহার ২০১৫ সালের তুলনায় ৯৫ শতাংশ কমাবে এবং নতুনভাবে সংক্রমিত যক্ষ্মারোগীর হার ২০১৫ সালের তুলনায় ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনবে। তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

 

২০১৮ সালে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ টিবিতে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয় এবং দেড় মিলিয়ন লোক এই রোগে মারা যায়, যার বেশিরভাগই নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। সাধারণত তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর, কাশির সঙ্গে কফ এবং মাঝেমধ্যে রক্ত বের হওয়া, ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি ফুসফুসের যক্ষ্মার প্রধান উপসর্গ। এই রোগের সর্বাধিক প্রচলিত ও পরিচিত ধরনটি হলো ফুসফুসীয় যক্ষ্মা।

গত শতকে কেবল যক্ষ্মা রোগেই ২০ কোটির বেশি লোক মারা গেছে। বর্তমানে যক্ষ্মা বিস্তারের হার হলো প্রতি সেকেন্ডে একজন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে দৈনিক প্রায় ২০০০ লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় যক্ষ্মা কার্যক্রম শুরু হয় এবং প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার ৮০০ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা হয়। এদের ৮০ শতাংশেরও বেশি রোগীকে চিকিৎসার সাহায্যে সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এই সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশে যক্ষ্মা রোগের পরিস্থিতি এখনও আশঙ্কাজনক, কেননা দেশে রয়েছে অত্যধিক জনঘনত্ব, নিম্নমানের আবাসন, দারিদ্র্য ও শিক্ষার নিম্ন হার।

 

যক্ষ্মা প্রতিরোধে যে সচেতনতাগুলো প্রয়োজন। জন্মের পরপর প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দেওয়া, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় রুমাল ব্যবহার করা, যেখানে-সেখানে থুথু না ফেলা, রোগীর কফ-থুথু নির্দিষ্ট পাত্রে ফেলে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা। যখন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক যক্ষ্মা রোগের সব জীবাণু ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয় তখনই ওষুধ প্রতিরোধক যক্ষ্মার সূত্রপাত হয়। এর মূল কারণগুলো হলো- পর্যাপ্ত চিকিৎসা গ্রহণ না করা, ভুল ওষুধ ও সেবন চিকিৎসার কোর্স সম্পূর্ণ না করা।

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশে প্রতিদিন যক্ষ্মায় মারা যায় ১১৫ জন

আপডেট সময় : ০৪:৩০:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০২৪

 

‘যার হয় যক্ষ্মা তার নেই রক্ষা’ এই কথাটি এখন আর সবার ক্ষেত্রে সত্যি নয়। অনেক যক্ষ্মারোগী চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পাচ্ছে। এরপরও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ১১৫ জন। আর সারা বছরে মৃত্যুবরণ করছে ৪২ হাজার মানুষ। এই অবস্থার পরিবর্তনে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

যক্ষ্মা বা টিবি জীবাণুঘটিত দীর্ঘস্থায়ী এক সংক্রামক ব্যাধি। এটি একটি প্রাচীন রোগ। পঞ্চম শতকের প্রথম দিক থেকেই এটি মারাত্মক রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যক্ষ্মা জীবাণুর বিভিন্ন জাত গৃহপালিত পশু ও বন্য প্রাণীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটায়। এ রোগ সচরাচর ফুসফুসের ক্ষতি করে, কিন্তু শ্বাসতন্ত্র, অস্থি ও অস্থিসন্ধি, ত্বক, লসিকাগ্রন্থি, অন্ত্র, কিডনি এবং স্নায়ুতন্ত্রও আক্রমণ করে। শ্বাসগ্রহণের সময় জীবাণু ফুসফুসে প্রবেশ করলেই সাধারণত সংক্রমণ ঘটে। দূষিত খাদ্যগ্রহণেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। যক্ষ্মাগ্রস্ত ব্যক্তির হাঁচি ও কাশি থেকে নির্গত কফ বা থুথুর কণাগুলো অন্যের শরীরে ও বাতাসে জীবাণু ছড়ায়। এসব জীবাণু বাতাসে, শুষ্ক কফ ও থুথুতে এবং ধুলাবালিতে দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকে। রোগটি অন্যদের তুলনায় একই পরিবারের লোকদের মধ্যে অধিক পরিমাণে সংক্রমিত হয়ে থাকে, কেননা এক পরিবারের সদস্যরা একই বাড়িতে বসবাস করে, একই টেবিলে খাবার খায় ও পরস্পরের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে। তবে যক্ষ্মা বংশানুক্রমিক রোগ নয়।

 

বিজ্ঞানী রবার্ট কচ যক্ষ্মা রোগের জীবাণু আবিষ্কার করেছেন। মূলত তারই স্মরণে ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়। দিবসটি ঘিরে এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- হ্যাঁ, আমরা যক্ষ্মা নিমূল করতে পারি। যক্ষ্মা বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়ায় মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সরকার দেশ থেকে যক্ষ্মা নির্মূলে কাজ করছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে ডিস্ট্রিক্ট স্যার্ভিলেন্স মেডিক্যাল অফিসার (ডিএসএমও) তত্ত্বাবধানে সব জেলায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সেবা পর্যবেক্ষণ, নজরদারি ও তদারকি অনেক ত্বরান্বিত হয়েছে। গত বছর ডিএসএমওদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি উপজেলায় ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (এমডি আর যক্ষ্মা) চিকিৎসা সেবা শুরু করেছে সরকার। এতে রোগীর ভোগান্তি কমেছে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়। ফলে রোগ ছড়ানো প্রবণতা কমবে। বর্তমানে দেশে যক্ষ্মা রোগীর পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় গণসচেতনতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে যক্ষ্মা নিয়ে সেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আপডেট যক্ষা গাইড লাইনের বিস্তারিত দিয়ে যক্ষ্মা কার্যক্রম ত্বরানিত করছে।

 

২০২৩ সালে যক্ষ্মা উপসর্গ আছে এমন প্রায় ৩০ লক্ষ বেশি লোকের যক্ষ্মা রোগের পরীক্ষা করা হয়েছে। যার মধ্যে ৩,০১,৫৬৪ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে, প্রায় ২৭২৯ জন ঔষধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা (এমডিআর) রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে যক্ষ্মা প্রতিরোধী ঔষধ (টিপিটি) ১,৬৫,৬৩৯ জনকে প্রদান করা হয়েছে।

২০২২ সাল থেকে সরকার দেশী ঔষধ কোম্পানির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে যক্ষ্মা চিকিৎসার প্রথম সারির ঔষধ উৎপাদন ও ক্রয় করা হয়েছে। জেলখানা, শহরাঞ্চলের বস্তি এলাকায়, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে গার্মেন্টে কর্মরত শ্রমিকদের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে মোবাইল ভ্যান (জিনএক্সপার্ট ও ডিজিটাল এক্সরে মেশিন) দিয়ে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণ কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে।
যক্ষ্মা প্রতিরোধী ওষুধ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ডিএসএমওরা রোগীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে অথবা সভায় যাদের যক্ষ্মা নেই, তাদের যেন যক্ষ্মা ভবিষ্যতে না হয়, সেজন্য চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এই কর্মীরা প্রতিদিন রোগীর বাড়িতে গিয়ে নিজে সামনে বসিয়ে রোগীকে ওষুধ খাওয়াচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবারের অন্য সব সদস্যকে এই রোগ যেন আক্রমণ না করতে পারে এর জন্য ঔষধ খাওয়াচ্ছে। যক্ষ্মার চিকিৎসার মধ্যে রয়েছেÑ অ্যান্টিবায়োটিক সেবন। সাধারণত ৬-৯ মাসব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হবে। যক্ষ্মা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে জিন এক্সপার্ট, ট্রুনেটসহ অত্যাধুনিক ব্যয়বহুল যন্ত্র উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ দিয়েছে। যা যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে আরো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এতে দ্রুত উপজেলা পর্যায়ে যক্ষ্মার ধরন নির্ধারণ করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু হচ্ছে। ফলে রোগ বাতাসের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে কম, যা রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কাজ করতে থাকলে জাতীয় যক্ষ্মা কর্মসূচির যে উদ্দেশ্য যে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুহার ২০১৫ সালের তুলনায় ৯৫ শতাংশ কমাবে এবং নতুনভাবে সংক্রমিত যক্ষ্মারোগীর হার ২০১৫ সালের তুলনায় ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনবে। তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

 

২০১৮ সালে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ টিবিতে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয় এবং দেড় মিলিয়ন লোক এই রোগে মারা যায়, যার বেশিরভাগই নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। সাধারণত তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর, কাশির সঙ্গে কফ এবং মাঝেমধ্যে রক্ত বের হওয়া, ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি ফুসফুসের যক্ষ্মার প্রধান উপসর্গ। এই রোগের সর্বাধিক প্রচলিত ও পরিচিত ধরনটি হলো ফুসফুসীয় যক্ষ্মা।

গত শতকে কেবল যক্ষ্মা রোগেই ২০ কোটির বেশি লোক মারা গেছে। বর্তমানে যক্ষ্মা বিস্তারের হার হলো প্রতি সেকেন্ডে একজন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে দৈনিক প্রায় ২০০০ লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় যক্ষ্মা কার্যক্রম শুরু হয় এবং প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার ৮০০ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা হয়। এদের ৮০ শতাংশেরও বেশি রোগীকে চিকিৎসার সাহায্যে সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এই সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশে যক্ষ্মা রোগের পরিস্থিতি এখনও আশঙ্কাজনক, কেননা দেশে রয়েছে অত্যধিক জনঘনত্ব, নিম্নমানের আবাসন, দারিদ্র্য ও শিক্ষার নিম্ন হার।

 

যক্ষ্মা প্রতিরোধে যে সচেতনতাগুলো প্রয়োজন। জন্মের পরপর প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দেওয়া, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় রুমাল ব্যবহার করা, যেখানে-সেখানে থুথু না ফেলা, রোগীর কফ-থুথু নির্দিষ্ট পাত্রে ফেলে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা। যখন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক যক্ষ্মা রোগের সব জীবাণু ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয় তখনই ওষুধ প্রতিরোধক যক্ষ্মার সূত্রপাত হয়। এর মূল কারণগুলো হলো- পর্যাপ্ত চিকিৎসা গ্রহণ না করা, ভুল ওষুধ ও সেবন চিকিৎসার কোর্স সম্পূর্ণ না করা।