০৭:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৫৩ বছর ধরে ফুসফুসে বুলেট বয়ে বেড়াচ্ছেন জোসনা

 

 

৫৩ বছর ধরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছোড়া বুলেট শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন জোসনা (৮০)। তরুণ অবস্থায় এই বুলেট কষ্ট না দিলেও বয়স যত বেড়েছে কষ্ট তত বেড়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে একজন ফুসফুস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নির্দেশে করা এক্সরেতে তার শরীরে থাকা এই বুলেটটি সামনে আসে। তখন বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে হইচই পড়ে যায়। কীভাবে একজন নারীর ফুসফুসে এই বুলেট গেল তার খোঁজ নিতে গেলে বেরিয়ে আসে মর্মান্তিক তথ্য।

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজধানীর শাহজাহানপুরে স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে থাকতেন জোসনা বেগম। পারিবারিকভাবেই তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর আর দশটা পরিবারের মতো এক মেয়ে ও তিন ছেলেকে নিয়ে শান্তিতেই সংসার করছিলেন জোসনা। বিপদ আসে যখন যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের সেই রাতে শাহজাহানপুর এলাকায় প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছিল। নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এই রাতে স্বামী-স্ত্রী দুজনে নিজেদের মাটির দেয়াল ও খড়ের চালের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন শাহজাহানপুর এলাকার বেশির ভাগ বাড়ি এমনই ছিল। যখন প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয় আশপাশের সবার বাড়ির মতো তারাও ঘুম থেকে জেগে উঠেন। কি করবেন? কোথায় যাবেন, কিছু বুঝতে না পেরে তারা নিজেদের চৌকির ওপরই বসে ছিলেন। এমন সময় ঘরের চাল ফুটো করে কয়েকটি বুলেট এসে জোসনা ও তার স্বামীর গায়ে লাগে। গোলাগুলি থেমে গেলে প্রতিবেশীরা তাদের হাসপাতালে ভর্তি করান। তখনকার চিকিৎসক জোসনার শরীরের ভেতরে থাকা একটি বুলেট অস্ত্রোপচার করে বের করেন। অন্য বুলেটটি তার ফুসফুসের মধ্যে গেঁথে যাওয়ায় এটি বের করা সম্ভব হয়নি।

 

 

হাসপাতালে কিছুদিন থাকার পর তারা বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর কেটে গেছে বহু বছর। এর মধ্যে তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। ২০১৮ সালে জোসনা রামপুরায় নিজের বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে সন্তানেরা মাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় এক্সরেতে তার ফুসফুসে আটকে থাকা বুলেটটি ধরা পড়ে।

পরীক্ষার পর তার চিকিৎসক ও তৎকালীন জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ইএমও ফাতেহ আকরাম দোলন বলেছিলেন, ওই বৃদ্ধার স্পাইরোমেট্রি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তার ফুসফুসের মধ্যে বুলেটটি আটকে আছে। এ কারণে এটি বের করা সম্ভব নয়। তার শরীরে বুলেটটি এভাবেই থেকে যাবে।
স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো জোসনা তার ফুসফুসের মধ্যে এই বুলেট বয়ে বেড়াচ্ছেন। ওষুধ না খেলেই বাড়ে কষ্ট। কফের সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে আসে। তাই সন্তানরা নিজেদের সীমিত আয়ের মধ্যে থেকেই মায়ের ওষুধ যেন কোনোভাবে বাদ না যায় সেটার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।

জোসনার ছেলে ওসমান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, মা এখন মোটামুটি ভালো আছে। চিকিৎসকেরা তাকে যে ওষুধ দিয়েছে সেগুলো খায়। ওষুধ খেলে সমস্যা হয় না। না খেলে সমস্যা হয়।

 

তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে, আপনাদের দোয়ায় মা এখন ভালোই আছে বলতে হবে। তার কষ্ট যেন কম হয় তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।
জোসনার ছেলে ওসমান বলেন, আমরা কোনো যুদ্ধাহত হিসেবে কোনো দাবি কখনো সরকারের কাছে করিনি। তখন যুদ্ধের সময় বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। কত মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছে আমরা তার হিসাব জানি না। কেউ কেউ সহযোগিতা পেলেও বেশির ভাগই কিন্তু এখনো সহযোগিতার বাইরে আছে। অনেকে দেশের জন্য জীবন দিয়ে সহযোগিতা পাওয়াটাকে কিছু মনেই করে না। আমাদের মায়ের অবস্থা যেটা হয়েছে, এটা সেই যুদ্ধের সময়ের ঘটনা। আমরা এটার জন্য কোনো খেতাব বা কিছু চাই না তবে, সরকার যদি আমার মায়ের শেষ বয়সে তার চিকিৎসার জন্য কোনো সহায়তা দেয় তো এতে আমার মায়ের হয়ত ভালো লাগবে। আমাদের সন্তানদের দিক থেকে সরকারের কাছে কোনো দাবি নেই।

 

জামাতা জালাল বলেন, আমার স্ত্রীর কাছে শুনেছি, শুধু বুকে গুলিই লাগেনি যুদ্ধে আমি শাশুড়ি হারিয়ে যায়। শাশুড়িকে হারিয়ে আমার শ্বশুর পাগল হয়ে গিয়েছিল। পরে যখন জানতে পারেন যে, তিনি (শাশুড়ি জোসনা) ভৈরবে তার বাবা-মায়ের বাড়িতে আছেন, সেখান থেকে তাকে বাড়িতে ফেরত নিয়ে আসেন।
জোসনার স্বামী বোরহানুল্লাহ সাত বছর আগে মারা গেছেন। তাদের এক মেয়ে ও তিন ছেলে। সন্তানরা সবাই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সংসারে নাতি-নাতনির সংখ্যা নয়জন। বড় মেয়ে জোবেদা গৃহিণী। বড় ছেলে ইউসুফ খান চট্টগ্রামে একটি ব্যাংকে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করেন। মেজ ছেলে ইসমাইল খান অসুস্থ। ছোট ছেলে ওসমান বাংলাদেশ টেলিভিশনে ড্রাইভিং সেকশনে কাজ করেন।

 

মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো রূপকথার গল্প ছিল না। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এই দেশ স্বাধীন হয়। বহু নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। যার ক্ষত নিজের শরীরেই বয়ে বেড়াচ্ছেন জোসনা। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের ওপর হওয়া নিপীড়নের এক জলন্ত উদাহরণ। তিনি এ দেশের সম্পদ। তারা একই সঙ্গে মনে করেন, ১৯৭১ সালে হওয়া গণহত্যা ও নিপীড়নের অবশ্যই আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত জোসনার মতো নারীদের।

জনপ্রিয় সংবাদ

৫৩ বছর ধরে ফুসফুসে বুলেট বয়ে বেড়াচ্ছেন জোসনা

আপডেট সময় : ০৭:১৬:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০২৪

 

 

৫৩ বছর ধরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছোড়া বুলেট শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন জোসনা (৮০)। তরুণ অবস্থায় এই বুলেট কষ্ট না দিলেও বয়স যত বেড়েছে কষ্ট তত বেড়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে একজন ফুসফুস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নির্দেশে করা এক্সরেতে তার শরীরে থাকা এই বুলেটটি সামনে আসে। তখন বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে হইচই পড়ে যায়। কীভাবে একজন নারীর ফুসফুসে এই বুলেট গেল তার খোঁজ নিতে গেলে বেরিয়ে আসে মর্মান্তিক তথ্য।

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজধানীর শাহজাহানপুরে স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে থাকতেন জোসনা বেগম। পারিবারিকভাবেই তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর আর দশটা পরিবারের মতো এক মেয়ে ও তিন ছেলেকে নিয়ে শান্তিতেই সংসার করছিলেন জোসনা। বিপদ আসে যখন যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের সেই রাতে শাহজাহানপুর এলাকায় প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছিল। নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এই রাতে স্বামী-স্ত্রী দুজনে নিজেদের মাটির দেয়াল ও খড়ের চালের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন শাহজাহানপুর এলাকার বেশির ভাগ বাড়ি এমনই ছিল। যখন প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয় আশপাশের সবার বাড়ির মতো তারাও ঘুম থেকে জেগে উঠেন। কি করবেন? কোথায় যাবেন, কিছু বুঝতে না পেরে তারা নিজেদের চৌকির ওপরই বসে ছিলেন। এমন সময় ঘরের চাল ফুটো করে কয়েকটি বুলেট এসে জোসনা ও তার স্বামীর গায়ে লাগে। গোলাগুলি থেমে গেলে প্রতিবেশীরা তাদের হাসপাতালে ভর্তি করান। তখনকার চিকিৎসক জোসনার শরীরের ভেতরে থাকা একটি বুলেট অস্ত্রোপচার করে বের করেন। অন্য বুলেটটি তার ফুসফুসের মধ্যে গেঁথে যাওয়ায় এটি বের করা সম্ভব হয়নি।

 

 

হাসপাতালে কিছুদিন থাকার পর তারা বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর কেটে গেছে বহু বছর। এর মধ্যে তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছেন। ২০১৮ সালে জোসনা রামপুরায় নিজের বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে সন্তানেরা মাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় এক্সরেতে তার ফুসফুসে আটকে থাকা বুলেটটি ধরা পড়ে।

পরীক্ষার পর তার চিকিৎসক ও তৎকালীন জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ইএমও ফাতেহ আকরাম দোলন বলেছিলেন, ওই বৃদ্ধার স্পাইরোমেট্রি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তার ফুসফুসের মধ্যে বুলেটটি আটকে আছে। এ কারণে এটি বের করা সম্ভব নয়। তার শরীরে বুলেটটি এভাবেই থেকে যাবে।
স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো জোসনা তার ফুসফুসের মধ্যে এই বুলেট বয়ে বেড়াচ্ছেন। ওষুধ না খেলেই বাড়ে কষ্ট। কফের সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে আসে। তাই সন্তানরা নিজেদের সীমিত আয়ের মধ্যে থেকেই মায়ের ওষুধ যেন কোনোভাবে বাদ না যায় সেটার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।

জোসনার ছেলে ওসমান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, মা এখন মোটামুটি ভালো আছে। চিকিৎসকেরা তাকে যে ওষুধ দিয়েছে সেগুলো খায়। ওষুধ খেলে সমস্যা হয় না। না খেলে সমস্যা হয়।

 

তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে, আপনাদের দোয়ায় মা এখন ভালোই আছে বলতে হবে। তার কষ্ট যেন কম হয় তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।
জোসনার ছেলে ওসমান বলেন, আমরা কোনো যুদ্ধাহত হিসেবে কোনো দাবি কখনো সরকারের কাছে করিনি। তখন যুদ্ধের সময় বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। কত মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছে আমরা তার হিসাব জানি না। কেউ কেউ সহযোগিতা পেলেও বেশির ভাগই কিন্তু এখনো সহযোগিতার বাইরে আছে। অনেকে দেশের জন্য জীবন দিয়ে সহযোগিতা পাওয়াটাকে কিছু মনেই করে না। আমাদের মায়ের অবস্থা যেটা হয়েছে, এটা সেই যুদ্ধের সময়ের ঘটনা। আমরা এটার জন্য কোনো খেতাব বা কিছু চাই না তবে, সরকার যদি আমার মায়ের শেষ বয়সে তার চিকিৎসার জন্য কোনো সহায়তা দেয় তো এতে আমার মায়ের হয়ত ভালো লাগবে। আমাদের সন্তানদের দিক থেকে সরকারের কাছে কোনো দাবি নেই।

 

জামাতা জালাল বলেন, আমার স্ত্রীর কাছে শুনেছি, শুধু বুকে গুলিই লাগেনি যুদ্ধে আমি শাশুড়ি হারিয়ে যায়। শাশুড়িকে হারিয়ে আমার শ্বশুর পাগল হয়ে গিয়েছিল। পরে যখন জানতে পারেন যে, তিনি (শাশুড়ি জোসনা) ভৈরবে তার বাবা-মায়ের বাড়িতে আছেন, সেখান থেকে তাকে বাড়িতে ফেরত নিয়ে আসেন।
জোসনার স্বামী বোরহানুল্লাহ সাত বছর আগে মারা গেছেন। তাদের এক মেয়ে ও তিন ছেলে। সন্তানরা সবাই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সংসারে নাতি-নাতনির সংখ্যা নয়জন। বড় মেয়ে জোবেদা গৃহিণী। বড় ছেলে ইউসুফ খান চট্টগ্রামে একটি ব্যাংকে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করেন। মেজ ছেলে ইসমাইল খান অসুস্থ। ছোট ছেলে ওসমান বাংলাদেশ টেলিভিশনে ড্রাইভিং সেকশনে কাজ করেন।

 

মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো রূপকথার গল্প ছিল না। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এই দেশ স্বাধীন হয়। বহু নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। যার ক্ষত নিজের শরীরেই বয়ে বেড়াচ্ছেন জোসনা। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের ওপর হওয়া নিপীড়নের এক জলন্ত উদাহরণ। তিনি এ দেশের সম্পদ। তারা একই সঙ্গে মনে করেন, ১৯৭১ সালে হওয়া গণহত্যা ও নিপীড়নের অবশ্যই আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত। সেইসঙ্গে ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত জোসনার মতো নারীদের।