➤চাঁদাবাজদের অনেকেই এখন কোটিপতি
➤ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে পুলিশ
➤ গ্রেপ্তার এড়াতে কৌশল পাল্টাচ্ছে চাঁদাবাজরা
আসন্ন ঈদ ঘিরে রাজধানীর নিউমার্কেট ও সায়েন্সল্যাবরেটরি মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকা ক্রেতা-বিক্রেতায় ঠাসা। হকারদের দখলে সব ফুটপাত। যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বাধ্য হয়ে পথচারীরা হাঁটছেন মূল সড়কে। সেখানেও স্বস্তি নেই। কোথাও কোথাও মূল সড়কের জায়গা দখল করে বসানো হয়েছে দোকান। ফুটপাত-রাস্তায় দোকান কেন-জিজ্ঞেস করতেই কয়েকজন হকার রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘প্রতিদিন টেকা দিয়া সিট (জায়গা) কিনছি, বোঝেন না ক্যান দখল করছি?’। অপরদিকে ব্যস্ততম ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে (দক্ষিণ) ডিএসসিসির অনুমতি ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছেমতো হাঁটাচলার পথে এমনকি সিঁড়িতে শতাধিক ফুট দোকান বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মার্কেটের বণিক সমিতির কতিপয় প্রভাবশালী নেতা। ব্যবসায় মন্দাভাব সত্ত্বেও ঈদ বোনাসের নামে দোকানপ্রতি ১ হাজার টাকা চাঁদা নির্ধারণ করে ১২ শতাধিক দোকানিকে চিঠি দিয়েছেন সমিতির নেতারা।
ফুটপাতের হকার ও মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এভাবে নির্ধারিত চাঁদা দিয়েই তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে পণ্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়ছে। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে সরকারের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা কখনোই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সাগর তেলেবেগুনে চটে যান। তিনি বলেন, আপনাকে জানিয়ে কি চাঁদা নির্ধারণ করে চিঠি দেব? এ বিষয়ে আপনি জানার কে? যান, এখানে সাংবাদিকতা করতে আসবেন না, অন্যকোথাও গিয়ে সাংবাদিকতা করুন…। অপরদিকে হকার্স লীগ ও হকার ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেমের বিরুদ্ধে মোটা অংকের চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী, দুই সিটি মেয়র ও ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী। এ প্রসঙ্গে এম এ কাশেম বলেন, চাঁদাবাজ, কতিপয় লাইনম্যান ও অসাধু পুলিশের বিরুদ্ধে আমি কথা বলায় অনেকেই আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করেছে। এসব অভিযোগ সব ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। তবে পুলিশ বলছে, এরই মধ্যে বেশকিছু চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করে মামলা দেওয়া হয়েছে। অন্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী গভঃ নিউমার্কেটের উত্তরপ্রান্তে ডিএসসিসির আওতাধীন তিনতলা ভবন বিশিষ্ট ঢাকা নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) বণিক সমিতি। গভঃ নিউমার্কেটের উত্তরে ৩ নম্বর গেট সংলগ্ন দোতলায় মাঝামাঝিতে রয়েছে মার্কেট দোকান মালিক সমিতির অফিস। অফিসটির দু’পাশে গোলচত্বর ঘিরে খোলা জায়গায় হাঁটাচলার পথে ও সিঁড়িতে রয়েছে প্রায় অর্ধশত ফুট দোকান। দোকানিরা কাউন্টারে সাজিয়ে বিক্রি করছেন তৈরি পোশাক, চশমা, বেল্টসহ হরেকরকম পণ্য। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কেটের বিভিন্ন দোকানের একাধিক হকার জানান, মার্কেটের বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সাগর নিয়ন্ত্রণ করছেন মার্কেটের ভেতর গড়ে ওঠা হকারদের। শ্রেণিভেদে দোকানপ্রতি এককালীন (অফেরতযোগ্য) ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা জমা ও মাসিক ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে দোকান পরিচালনা করছি। এর বৈধতা আছে কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, এসব মার্কেটের সেক্রেটারি সাহেব জানে।
মার্কেটে দোকান ভাড়া নেওয়া একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তারা মাসে ৫০ থেকে ৯০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এমনিতেই ব্যবসার মন্দাভাব। পার্টি পেমেন্ট, কর্মচারীর বেতন দিতে পারবেন কি-না, তা জানেন না। তার ওপর সমিতির নেতারা চিঠি দিয়ে ঈদ বোনাসের নামে ১ হাজার টাকা চাঁদা ধার্য করেছেন। ফুটপাতের সবমিলিয়ে প্রায় ২ হাজার দোকান থেকে ২০ লাখ টাকার চাঁদা তোলার মিশন শুরু করেছেন সমিতির নেতারা। এক প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ীরা জানান, এমনিতেই মার্কেটে আলো-বাতাস প্রবেশের জায়গা নেই। কিছুদিন আগে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ তৃতীয় তলার দক্ষিণ পাশে নকশাবহির্ভূত ১১টি ও দোতলার দক্ষিণ-পূর্বে ৩-৫টি দোকান ভেঙে আলো-বাতাস প্রবেশের জায়গা করে দিয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়াই সিঁড়ি ও হাঁটাচলার পথে সমিতির প্রভাবশালী নেতা আমিনুল ইসলাম সাগরের নির্দেশে শতাধিক হকার বসিয়ে মার্কেটের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। এভাবেই দোকান বসিয়ে তিনি শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ফুটপাতের এসব দোকান থেকে ওই নেতা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ীরা। এ কারণে তাদের বেচাকেনায় কিছুটা হলেও প্রভাব পড়ছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মার্কেটের বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সাগর তেলেবেগুনে চটে যান। তিনি বলেন, আপনাকে জানিয়ে কি চাঁদা নির্ধারণ করে চিঠি দেব? এ বিষয়ে আপনি জানার কে? যান, এখানে সাংবাদিকতা করতে আসবেন না, অন্যকোথাও গিয়ে সাংবাদিকতা করুন…। তবে চাঁদাবাজি ও মার্কেটের সিঁড়িতে দোকান বসানোর বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর অন্যান্য মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে। তারাও সমিতির নামে বিভিন্ন দোকানে ঈদ বোনাসের নামে চাঁদা তুলছেন। এমন তথ্য-প্রমাণ দৈনিক সবুজ বাংলার হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে নেতারা বলেছেন, মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী, সুইপারসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ তুলতেই দোকানগুলোতে এ চিঠি দেওয়া হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ হকার্স লীগ ও হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেমের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির কাছ থেকে মিথ্যা আশ^াস দিয়ে ৩ লাখ টাকা ও সরকারি খাত থেকে লোন তুলে ব্যবসা ধরিয়ে দেওয়া ও বিদেশের পাঠানোর নামে ২২০ জনের কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা চাঁদা তুলে আত্মসাতের অভিযোগ এনে গত ১ এপ্রিল ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী এক ব্যক্তি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এম এ কাশেম বলেন, কে বা কারা অভিযোগ করেছে এ বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি সবসময়ই হকারের পক্ষে চাঁদাবাজ ও দুষ্টচক্র লাইনম্যানের বিরুদ্ধে কথা বলায় হয়তো কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে এমন অভিযোগ করতে পারেন। আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থাবস্থায় বিছানায়। আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। ডিএমপি সদর দপ্তর ও দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, নূর ম্যানশনের সামনের রাস্তায় নিউমার্কেট থানা পুলিশ অস্থায়ী কন্ট্রোল রুমে পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে বসে থাকলেও সেই কন্ট্রোল রুমের চারপাশে বসানো হয়েছে জুতাসহ অন্যান্য ৪-৫টি দোকান। ফুটপাত দখলের পর রাস্তা দখল করে দোকান বসানোয় নিউমার্কেট থেকে এলিফ্যান্ট রোডের দিকে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধের উপক্রম। সড়কের ডিভাইডারেও বসেছে দোকান। এভাবে রাজধানীর নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকা ঘিরে ফুটপাত ও সড়কে প্রায় ১৩শ দোকান রয়েছে। এ খাত থেকে মাসে কোটি টাকা চাঁদা ওঠে। ঈদে এ চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। বছরে দৈনিক চাঁদা এবং স্পেস বরাদ্দের জন্য নেওয়া এই টাকার পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা। এই টাকা তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাসহ রাজনৈতিক কর্মীরা পায় একটি ভাগ। অপর ভাগ চলে যায় ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কাছে। পুলিশের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে চলছে এমন বাণিজ্য। সরেজমিন ফুটপাতে চাঁদাবাজির তথ্য অনুসন্ধানে গেলে কয়েকজন হকার অকপটে দৈনিক সবুজ বাংলার কাছে ফুটপাতে চাঁদাবাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। এছাড়া বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে চাঁদাবাজির সদর-অন্দরের যেসব সাতকাহন বেরিয়ে আসে তাতে নিউমার্কেট ও সায়েন্সল্যাব এলাকা রীতিমতো চাঁদাবাজির এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। যার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ ছাড়াও সরকারি দলের স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতার হাতে। এছাড়া ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় নেতা সাত্তার মোল্লা, উজ্জ্বল, মামুন, বিল্লাল, বাচ্চু, রাহাত, ইসমাইল, টুন্ডা আমির ঝালাই জাহাঙ্গীর, মতি শিকদার, ইব্রাহীম হোসেন ইবু, কাজী আনিস, আকবর, আমিনুল, সেলিম ও শাহিনের নামও উঠে আসে হকারদের মুখে। এসব বিষয়ে জানতে ঘটনাস্থল ঘুরে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নিউমার্কেট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন দুই থেকে তিনবার আমরা ফুটপাতের দোকান অপসারণ করি। গাউছিয়া মোড়ে অস্থায়ী পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সঙ্গেও দোকান কেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এমন হওয়ার কথা নয়। এটা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওসি আরো বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স। ইতোমধ্যেই চাঁদাবাজির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্যান্য যাদের নাম এসেছে তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, আমি একটি হসপিটালে আছি, বিস্তারিত পরে জানাবো।





















