০৭:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গরমের সঙ্গে বাড়ছে নানা রোগের উপসর্গ

◉ভাইরাসজনিত জ্বর-সর্দি ও ডায়রিয়ার শঙ্কা বেশি
◉তীব্র গরমে বেশি ঝুঁকিতে শিশু ও বয়স্করা 
◉প্রচণ্ড তাপদাহে বাড়ে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি
◉গরম প্রতিরোধে প্রচুর পানি পান ও স্বাস্থ্যসম্মত পোশাক পরার পরামর্শ

আজ ২৪ চৈত্র। বসন্তকাল। এখনই যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে মানুষের মধ্যে গরমজনিত বাড়ছে অস্থিরতা। সেই সঙ্গে বাড়ছে গরমজনিত নানা রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি। এসময় ঠান্ডা লাগা, ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি, কাশি, অ্যাজমা, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময়ে অতিগরমজনিত বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। তাই এই অবস্থায় রোদ থেকে দূরে শীতল স্থানে থাকা, অতিরিক্ত গরমে বেশিক্ষণ কাজ না করা, প্রচুর পানি পান করা, সাদা, নরম সুতি রংয়ের কাপড় পরার মাধ্যমে এ গরম প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এপ্রিল মাসে দেশে দুই থেকে চারটি মৃদু থেকে মাঝারি এবং এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ সময় তাপমাত্রা ৩৬-৪২ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। তাই এই সময়ে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের ব্যাপারে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

গরমকালের অসুস্থতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আবহাওয়ার যে খবর পাচ্ছি এতে এবছর গরম বেশি বাড়বে। সারা পৃথিবীতেই তাপপ্রবাহ বাড়বে। স্বাভাবিক কারণেই গরমে যে রোগগুলো হয় সেগুলো বাড়বে। যেমন ভাইরাল ফিভার, সর্দি-কাশি, এগুলো বাড়বে। এগুলো এখনো চলছে। প্রচুর রোগী এমন পাওয়া যাচ্ছে যাদের ঠান্ডা কাশি হচ্ছে। কমছে না। গরমের সময় শিশুদের ডায়রিয়া শুরু হয়। এই ডায়রিয়াটা খুব ভয়ংকর হয়। যারা বাইরে কাজ করে তাদের গায়ের ঘাম শুকিয়ে যায়। ঘাম শুকিয়ে গেলে এই পরিস্থিতিটা ভয়াবহ হয়। শরীরে সোডিয়াম কমে গিয়ে বিভিন্ন রকম রোগ তৈরি করে। যারা বাইরে রোদে বেশি কাজ করে তাদের হিটস্ট্রোক দেখা দেয়। প্রচণ্ড রোদে কাজ করার সময় তারা মাথা ঘুরে পড়ে যায়। শিশুদের জন্য এবং বয়স্কদের জন্য তীব্র শীত এবং তীব্র গরম দুটোই খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের এসময় রোগ বাড়ে।
তিনি বলেন, হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এই রোগীদের কিছু কিছু ওষুধ আমরা দেই রক্তকে তরল রাখার জন্য। অতিরিক্ত গরমে ঐ ওষুধের প্রভাবে রোগীর ব্লাড সুগার কমে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারে। তখন দেখা গেল যে, সেই রোগী হৃদরোগের পাশাপাশি আর একটা রোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসল।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও প্রিভেন্টিভ অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, গরমে ডায়রিয়া বেশি হয়। হাম, বসন্ত এসব রোগ বেশি হয়। গরমের সময় বন্যা দেখা দেয়। বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণে এ সময় কিছু পানিবাহিত রোগ যেমন- ডায়রিয়া, টাইফয়েড এই রোগগুলো দেখা দেয়। এইসময় জন্ডিসটা বেড়ে যায়।

কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, অতিরিক্ত গরমে সবার শরীর থেকে ঘাম বের হয়ে যায়। সেই ঘামের সঙ্গে লবণ, পানি দুটোই শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই লবণ এবং পানি দুটোই শরীর থেকে বের হয়ে গেলে শুষ্কতা, দুর্বলতা, পানিশূন্যতার জন্য অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়। পানি কিন্তু আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা না খেয়ে অনেকক্ষণ থাকতে পারি কিন্তু পানি না খেয়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনা। এই যে গরমে আমাদের শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সেই পানিশূন্যতার জন্য তার খারাপ লাগবে। তার নাড়ির গতি, এমনকি ব্লাড প্রেসার সমস্ত কিছু কমে যেতে পারে। এমনকি এই লবণের পরিমাণ অনেক কমে গেলে সে কোমায় চলে যেতে পারে। অথবা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। যদি সেই রকম পর্যায়ে হয়। আবার আমাদের শরীর থেকে যদি প্রচুর পানি বের হয়ে যায় তখন আমাদের প্রস্রাবে সংক্রমণ, জ¦ালাপোড়া হতে পারে। এমনকি শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা সেটাও বেড়ে যায়। হিটস্ট্রোক শরীরের ঘাম বের হয়ে গেলে হয়। এছাড়া, গরমকালে পানিশূন্যতার কারণে অন্যান্য রোগগুলো বাসা বাঁধে। এসময় চারপাশে যে ভাইরাল ফিভার হয়। সেগুলো শরীরে ঘাম হয়ে ঠাণ্ডা লাগা, সর্দি, কাশি, জ¦র এগুলো হয়। যাদের হাঁপানি থাকে, তাদের এই গরম থেকে হাঁপানির প্রবণতাটা বাড়ে। হাঁপানি অতিরিক্ত গরমে ঘাম শুকিয়ে গিয়ে বাড়ে আবার অতিরিক্ত ঠান্ডা বাড়ে। এসময় শিশুরা অতিরিক্ত গরমে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে।

গরমের রোগগুলো প্রতিরোধ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক বলেন, গরমজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধের জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। শীতল যায়গায় থাকার চেষ্টা করতে হবে। খুব প্রয়োজন ছাড়া রোদে যত কম থাকা যায় সেটা করতে হবে। কাপড় পরার সময় মনে রাখতে হবে যেন সাদা রংয়ের কাপড় পরা হয়। সাদা রংয়ের কাপড় লাইট রিফেøক্ট করে। ফলে তাপটা কম লাগে। আর যদি খুব বেশি কালো বা গাঢ় রংয়ের পোশাক পরা হয় তাহলে গরমটা বেশি লাগে। সুতির কাপড়, সাদা ও হালকা রংয়ের কাপড় পরতে হবে। ঘন ঘন পানি খেতে হবে।

গরমজনিত অসুস্থতা থেকে দূরে থাকা প্রসঙ্গে ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, যখন প্রখর রোদ হবে তখন বেশিক্ষণ রোদে চলাচল করা যাবেনা। ছাতা নিয়ে চলাচল করতে হবে। বেশি করে ঘামলে তখন সমস্যা হতে পারে। পানি এবং লবণ শরীর থেকে বেরিয়ে সমস্যা তৈরি করতে পারে। পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় প্রস্রাবের সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময় কিডনি ঠিকমতো কাজ করছে না। এমন পর্যায়ে চলে যেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় অনেকক্ষণ পানি খেল না কিন্তু অনেকক্ষণ রোদে হাঁটল। তখন দেখা যায়, পানিশূন্যতা হয়ে গেল। শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দিল। কিডনি বিকলও হতে পারে।
তিনি বলেন, এজন্য গরমের মধ্যে খুব বেশি ঘোরাফেরা না করার কথা তো সবসময় বলা হয়। পানি এবং তরল জাতীয় খাবার পান করা, ডায়রিয়াজনিত রোগ হলে সেগুলোর চিকিৎসা নেয়া এগুলো করতে হবে। এসময় মাছির উপদ্রব বাড়ে। মাছি কিছু রোগ ছড়ায়। সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বন্যায় যদি এলাকা প্লাবিত হয়ে যায় তখন যে ময়লা পানি আসে সেগুলো ব্যবহার না করা। ঐসময় ভালো টিউবওয়েলের পানি যদি থাকে সেগুলো পান করা। একান্তই ভালো পানি না পেলে পানি ফুটিয়ে পান করার ব্যবস্থা করতে হবে।

অতিরিক্ত গরমে হওয়া রোগগুলো প্রতিরোধ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রচুর পানি পান করতে হবে। অর্থাৎ আমরা সাধারণত বলি একজন মানুষের কমপক্ষে তিন লিটার পানি খাওয়া উচিত। গরমে অতিরিক্ত ঘাম বের হয়ে যাবে এটার জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। এটা পানি এবং পানিজাতীয় খাবার যেমন ফলের রস, ফলের শরবত কিম্বা ইসবগুল দিয়ে পানি যেকোনভাবেই হোক খেতে হবে। আর একটা সুবিধা আমরা পাই। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে প্রচুর পরিমাণে তরমুজ, শশা, বাঙ্গি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের রসালো ফল হয়। এগুলো আমরা খেতে পারি। এখন যখন রোজা চলছে তখন এগুলো যেমন খেতে হবে। আবার অন্য সময় যদি রোজা নাও থাকে তখনও আমাদের এই ফলগুলো খেতে হবে। আমরা যতটা সম্ভব শরীরের সুস্থতার জন্য পানি ও পানিজাতীয় খাবার বেশি খাব। এমনিতেই ফলমূল, শাকসব্জি বেশি পরিমাণে খাব, পাশাপাশি গরমে রসালো ফল বেশি পরিমাণে খাব।

তিনি বলেন, আমরা জানি যে আমাদের ভিটামিন ডি এর দরকার আছে। কিন্তু অনেক সময় অতিরিক্ত সূর্যের তাপে কিছু পদার্থ যেগুলো ক্যানসার তৈরি করতে পারে। সেজন্য স্কিনের জন্য কিছু ক্রিম আছে, যেমন- সানস্ক্রিন ক্রিম, বিশেষ করে যারা ক্রিকেট খেলে বা কৃষক যারা মাঠে চাষ করে (যদি সম্ভব হয়) তারা ব্যবহার করতে পারে। আর ঘর থেকে রোদে বের হওয়ার সময় স্বাভাবিক নিয়মগুলো মেনে চলব।

জনপ্রিয় সংবাদ

সালমান শাহ হত্যা মামলায় সামিরা, ডনসহ ১১ আসামির সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন

গরমের সঙ্গে বাড়ছে নানা রোগের উপসর্গ

আপডেট সময় : ০৭:৪১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ এপ্রিল ২০২৪

◉ভাইরাসজনিত জ্বর-সর্দি ও ডায়রিয়ার শঙ্কা বেশি
◉তীব্র গরমে বেশি ঝুঁকিতে শিশু ও বয়স্করা 
◉প্রচণ্ড তাপদাহে বাড়ে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি
◉গরম প্রতিরোধে প্রচুর পানি পান ও স্বাস্থ্যসম্মত পোশাক পরার পরামর্শ

আজ ২৪ চৈত্র। বসন্তকাল। এখনই যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে মানুষের মধ্যে গরমজনিত বাড়ছে অস্থিরতা। সেই সঙ্গে বাড়ছে গরমজনিত নানা রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি। এসময় ঠান্ডা লাগা, ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি, কাশি, অ্যাজমা, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময়ে অতিগরমজনিত বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। তাই এই অবস্থায় রোদ থেকে দূরে শীতল স্থানে থাকা, অতিরিক্ত গরমে বেশিক্ষণ কাজ না করা, প্রচুর পানি পান করা, সাদা, নরম সুতি রংয়ের কাপড় পরার মাধ্যমে এ গরম প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এপ্রিল মাসে দেশে দুই থেকে চারটি মৃদু থেকে মাঝারি এবং এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ সময় তাপমাত্রা ৩৬-৪২ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। তাই এই সময়ে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের ব্যাপারে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

গরমকালের অসুস্থতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আবহাওয়ার যে খবর পাচ্ছি এতে এবছর গরম বেশি বাড়বে। সারা পৃথিবীতেই তাপপ্রবাহ বাড়বে। স্বাভাবিক কারণেই গরমে যে রোগগুলো হয় সেগুলো বাড়বে। যেমন ভাইরাল ফিভার, সর্দি-কাশি, এগুলো বাড়বে। এগুলো এখনো চলছে। প্রচুর রোগী এমন পাওয়া যাচ্ছে যাদের ঠান্ডা কাশি হচ্ছে। কমছে না। গরমের সময় শিশুদের ডায়রিয়া শুরু হয়। এই ডায়রিয়াটা খুব ভয়ংকর হয়। যারা বাইরে কাজ করে তাদের গায়ের ঘাম শুকিয়ে যায়। ঘাম শুকিয়ে গেলে এই পরিস্থিতিটা ভয়াবহ হয়। শরীরে সোডিয়াম কমে গিয়ে বিভিন্ন রকম রোগ তৈরি করে। যারা বাইরে রোদে বেশি কাজ করে তাদের হিটস্ট্রোক দেখা দেয়। প্রচণ্ড রোদে কাজ করার সময় তারা মাথা ঘুরে পড়ে যায়। শিশুদের জন্য এবং বয়স্কদের জন্য তীব্র শীত এবং তীব্র গরম দুটোই খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের এসময় রোগ বাড়ে।
তিনি বলেন, হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এই রোগীদের কিছু কিছু ওষুধ আমরা দেই রক্তকে তরল রাখার জন্য। অতিরিক্ত গরমে ঐ ওষুধের প্রভাবে রোগীর ব্লাড সুগার কমে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারে। তখন দেখা গেল যে, সেই রোগী হৃদরোগের পাশাপাশি আর একটা রোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসল।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও প্রিভেন্টিভ অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, গরমে ডায়রিয়া বেশি হয়। হাম, বসন্ত এসব রোগ বেশি হয়। গরমের সময় বন্যা দেখা দেয়। বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণে এ সময় কিছু পানিবাহিত রোগ যেমন- ডায়রিয়া, টাইফয়েড এই রোগগুলো দেখা দেয়। এইসময় জন্ডিসটা বেড়ে যায়।

কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, অতিরিক্ত গরমে সবার শরীর থেকে ঘাম বের হয়ে যায়। সেই ঘামের সঙ্গে লবণ, পানি দুটোই শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই লবণ এবং পানি দুটোই শরীর থেকে বের হয়ে গেলে শুষ্কতা, দুর্বলতা, পানিশূন্যতার জন্য অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়। পানি কিন্তু আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা না খেয়ে অনেকক্ষণ থাকতে পারি কিন্তু পানি না খেয়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনা। এই যে গরমে আমাদের শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সেই পানিশূন্যতার জন্য তার খারাপ লাগবে। তার নাড়ির গতি, এমনকি ব্লাড প্রেসার সমস্ত কিছু কমে যেতে পারে। এমনকি এই লবণের পরিমাণ অনেক কমে গেলে সে কোমায় চলে যেতে পারে। অথবা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। যদি সেই রকম পর্যায়ে হয়। আবার আমাদের শরীর থেকে যদি প্রচুর পানি বের হয়ে যায় তখন আমাদের প্রস্রাবে সংক্রমণ, জ¦ালাপোড়া হতে পারে। এমনকি শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা সেটাও বেড়ে যায়। হিটস্ট্রোক শরীরের ঘাম বের হয়ে গেলে হয়। এছাড়া, গরমকালে পানিশূন্যতার কারণে অন্যান্য রোগগুলো বাসা বাঁধে। এসময় চারপাশে যে ভাইরাল ফিভার হয়। সেগুলো শরীরে ঘাম হয়ে ঠাণ্ডা লাগা, সর্দি, কাশি, জ¦র এগুলো হয়। যাদের হাঁপানি থাকে, তাদের এই গরম থেকে হাঁপানির প্রবণতাটা বাড়ে। হাঁপানি অতিরিক্ত গরমে ঘাম শুকিয়ে গিয়ে বাড়ে আবার অতিরিক্ত ঠান্ডা বাড়ে। এসময় শিশুরা অতিরিক্ত গরমে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে।

গরমের রোগগুলো প্রতিরোধ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক বলেন, গরমজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধের জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। শীতল যায়গায় থাকার চেষ্টা করতে হবে। খুব প্রয়োজন ছাড়া রোদে যত কম থাকা যায় সেটা করতে হবে। কাপড় পরার সময় মনে রাখতে হবে যেন সাদা রংয়ের কাপড় পরা হয়। সাদা রংয়ের কাপড় লাইট রিফেøক্ট করে। ফলে তাপটা কম লাগে। আর যদি খুব বেশি কালো বা গাঢ় রংয়ের পোশাক পরা হয় তাহলে গরমটা বেশি লাগে। সুতির কাপড়, সাদা ও হালকা রংয়ের কাপড় পরতে হবে। ঘন ঘন পানি খেতে হবে।

গরমজনিত অসুস্থতা থেকে দূরে থাকা প্রসঙ্গে ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, যখন প্রখর রোদ হবে তখন বেশিক্ষণ রোদে চলাচল করা যাবেনা। ছাতা নিয়ে চলাচল করতে হবে। বেশি করে ঘামলে তখন সমস্যা হতে পারে। পানি এবং লবণ শরীর থেকে বেরিয়ে সমস্যা তৈরি করতে পারে। পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় প্রস্রাবের সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময় কিডনি ঠিকমতো কাজ করছে না। এমন পর্যায়ে চলে যেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় অনেকক্ষণ পানি খেল না কিন্তু অনেকক্ষণ রোদে হাঁটল। তখন দেখা যায়, পানিশূন্যতা হয়ে গেল। শরীরে লবণশূন্যতা দেখা দিল। কিডনি বিকলও হতে পারে।
তিনি বলেন, এজন্য গরমের মধ্যে খুব বেশি ঘোরাফেরা না করার কথা তো সবসময় বলা হয়। পানি এবং তরল জাতীয় খাবার পান করা, ডায়রিয়াজনিত রোগ হলে সেগুলোর চিকিৎসা নেয়া এগুলো করতে হবে। এসময় মাছির উপদ্রব বাড়ে। মাছি কিছু রোগ ছড়ায়। সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বন্যায় যদি এলাকা প্লাবিত হয়ে যায় তখন যে ময়লা পানি আসে সেগুলো ব্যবহার না করা। ঐসময় ভালো টিউবওয়েলের পানি যদি থাকে সেগুলো পান করা। একান্তই ভালো পানি না পেলে পানি ফুটিয়ে পান করার ব্যবস্থা করতে হবে।

অতিরিক্ত গরমে হওয়া রোগগুলো প্রতিরোধ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রচুর পানি পান করতে হবে। অর্থাৎ আমরা সাধারণত বলি একজন মানুষের কমপক্ষে তিন লিটার পানি খাওয়া উচিত। গরমে অতিরিক্ত ঘাম বের হয়ে যাবে এটার জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। এটা পানি এবং পানিজাতীয় খাবার যেমন ফলের রস, ফলের শরবত কিম্বা ইসবগুল দিয়ে পানি যেকোনভাবেই হোক খেতে হবে। আর একটা সুবিধা আমরা পাই। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে প্রচুর পরিমাণে তরমুজ, শশা, বাঙ্গি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের রসালো ফল হয়। এগুলো আমরা খেতে পারি। এখন যখন রোজা চলছে তখন এগুলো যেমন খেতে হবে। আবার অন্য সময় যদি রোজা নাও থাকে তখনও আমাদের এই ফলগুলো খেতে হবে। আমরা যতটা সম্ভব শরীরের সুস্থতার জন্য পানি ও পানিজাতীয় খাবার বেশি খাব। এমনিতেই ফলমূল, শাকসব্জি বেশি পরিমাণে খাব, পাশাপাশি গরমে রসালো ফল বেশি পরিমাণে খাব।

তিনি বলেন, আমরা জানি যে আমাদের ভিটামিন ডি এর দরকার আছে। কিন্তু অনেক সময় অতিরিক্ত সূর্যের তাপে কিছু পদার্থ যেগুলো ক্যানসার তৈরি করতে পারে। সেজন্য স্কিনের জন্য কিছু ক্রিম আছে, যেমন- সানস্ক্রিন ক্রিম, বিশেষ করে যারা ক্রিকেট খেলে বা কৃষক যারা মাঠে চাষ করে (যদি সম্ভব হয়) তারা ব্যবহার করতে পারে। আর ঘর থেকে রোদে বের হওয়ার সময় স্বাভাবিক নিয়মগুলো মেনে চলব।