➢তাপদাহে পুড়ছে পুরো পশ্চিমবঙ্গ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে চলতি মাসের শুরু থেকে প্রচণ্ড গরম পড়তে শুরু করেছে। ৪ এপ্রিল মালয়েশিয়ায় হিটস্ট্রোকে তিন বছর বয়সি এক শিশু মারা যায়। এর পর থেকে দেশজুড়ে জলবায়ু-সম্পর্কিত অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। ওই সপ্তাহে ভিয়েতনামের দক্ষিণাঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা দেখা দিতে শুরু করে। শুকিয়ে যায় ধানখেত। কর্তৃপক্ষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। ফিলিপাইনে একই সময় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হয়ে যায়। এতে শত শত স্কুল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। এপ্রিলের শুরু থেকেই এখানে প্রচণ্ড তাপদাহ দেখা যাচ্ছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনকার তাপদাহের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এ অঞ্চলজুড়ে প্রসারিত হচ্ছে। এর শেষ দেখা যাচ্ছে না। শিগগিরই এ থেকে পরিত্রাণ নেই।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ম্যাক্সিমিলিয়ানো হেরেরা বলেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাপমাত্রা অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা উঠেছে থাইল্যান্ডে। দেশটিতে গত ১৩ মাস ধরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির রেকর্ড ভাঙছে। এখানকার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়েই চলেছে। আমরা ভেবেছিলাম গত বছর তাপমাত্রা ছিল অসহনীয়। কিন্তু এ বছর সে রেকর্ডও ভেঙে গেছে। ব্যাংককের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেই না। এপ্রিলজুড়ে রাতের তাপমাত্রাও এর চেয়ে কমে নামবে না। তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে প্রবণতা তা অনিবার্য। এই অঞ্চলকে এপ্রিলের বাকি সময় ও মে মাসজুড়ে তীব্র গরম সহ্য করার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
৩ এপ্রিল থেকে থাইল্যান্ডে শুষ্ক মৌসুম শুরু হয়। এ সময় থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হয়ে যায়। এতে অনেকেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। কাছেই ভিয়েতনামে শুরু হয়েছে খরা পরিস্থিতি। সেখানকার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। এতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কৃষি খাতের ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ভিয়েতনাম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক। কম বৃষ্টিপাতের ফলে সেখানকার কৃষকেরা সমস্যায় পড়েছেন। শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের জমি। এর আগে গত বছর প্রচণ্ড তাপদাহে অনেক শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল। এ বছর জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আরো দীর্ঘ সময় দাবদাহের আশঙ্কা করছেন। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব। এল নিনো এমন এক প্রাকৃতিক ঘটনা, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর ঘটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনোর কারণে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে কলকাতাসহ পুরো পশ্চিমবঙ্গের বইছে প্রচণ্ড তাপদাহ। এতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। গরমের কারণে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। কলকাতার রাস্তাঘাটে যানবাহনও কম। দিল্লির আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বলছে, গোটা ভারতে সর্বাধিক তাপমাত্রা ছিল ওডিশার বারিপদায়, ৪৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৭ দশমিক ১ ডিগ্রি বেশি। দ্বিতীয় স্থানে ছিল পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া। সেখানে ৪৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি বেশি। তবে কলকাতার আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল বর্ধমানের পানাগড়ে, ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি বেশি।
আর আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, কলাইকুন্ডা, পানাগড়, ব্যারাকপুরে দাবদাহ চলবে। মেদিনীপুরে ৪৪ দশমিক ৫, বাঁকুড়ায় ৪৪ দশমিক ৬, বর্ধমানের পানাগড়ে ৪৫ দশমিক ১ এবং ব্যারাকপুরে সর্বাধিক তাপমাত্রা ছিল ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে কলকাতায় এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়েছিল ২০১৪, ২০১৬ ও ২০২৩ সালে। ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিলে তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল ছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিকে এই তীব্র তাপদাহে কলকাতাসহ রাজ্যের জেলা শহরগুলো কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়েছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও বাড়ির বাইরে বের হচ্ছে না। অনেক স্কুলে শুরু হয়েছে অনলাইন ক্লাস।

























