০৬:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

তাদেরও সংসার চলে আমরাও ছোট মাছের স্বাদ নিতে পাচ্ছি

বাহে হামরা গরীব মানুষ, হামার তেমন আয় ইনকাম নাই। মাছ কাটি যা হয় সেটা দিয়্যা কোনোমতে সংসার চলে। যেদিন বেশি মাছ কাটি সেদিন ১০ টাকা হইলেও আয় বেশি হয়। আল্লাহর রহমতে মাছ কাটার কাম করি হামার সংসার জীবন চলোছে। এভাবে কথাগুলো বলছিলেন রংপুর নগরীর শেফালী বেগম। প্রায় ১০ বছর ধরে রংপুরের সিটি মাছ বাজারে মাছ কাটার কাজ করেন তিনি।

 

 

তার ভাষায়, হামার গরম আর বর্ষা নাই। হাতে করি, আর পেটে খাই। হামার কাজ না করি আর উপায় নাই বাহে। একদিন কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না। এটে হামরা যারা মাছ কাটি, ওমারগুলার কারো কারো স্বামী নাই। ছাওয়া সন্তান নিয়্যা অনেক কষ্ট! একবেলা মাছ না কাটলে ভাত জুটে না। সকাল থাকি সন্ধ্যা পর্যন্ত যত কেজি মাছ কাটিবার পারি সেভাবেই হামার ইনকাম হয়। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ কেটে দিয়ে প্রতিদিন শেফালীর আয় হয় ৫০০-৬০০ টাকা। তা থেকে জায়গা ভাড়া, ইজারা, পানির বিল ও ময়লা পরিষ্কার বাবদ প্রায় ১০০ টাকা দিতে হয় বাজার কর্তৃপক্ষকে।

 

 

 

শেফালী বেগমের মতো সিটি বাজারে প্রায় ৫০ জন নারী উনুনের খড় পোড়ানো ছাই আর ধারালো বটি দিয়ে মাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করেন। গতকাল রবিবার দুপুরে রংপুর সিটি মাছের বাজার দেখা যায়, সারি সারি নানা বয়সী নারীরা মাছ কেটে দিচ্ছেন। ভ্যাপসা গরমে যে বয়সে ফ্যান বা হাতাপাখার বাতাসে গা জুড়ানোর কথা সেই বয়সে নিজে চলার পাশাপাশি অনেকে নিয়েছেন পরিবার চালানোর মতো গুরু দ্বায়িত্ব। কথা হয় সিটি বাজারে মাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করা সংগ্রামী নারীদের অনেকের সঙ্গে। তারা বলেন, বাজারের মাছ কাটা নারীদের অনেকই বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, বয়স্ক কেউবা অভাবের সংসার চালাতে এ পেশায় এসেছেন। আর মাছ ভেদে প্রতি কেজির বিনিময়ে নেন ১০ থেকে ৫০ টাকা। ষাটোর্ধ্ব রাবেয়া বেগম নামে এক নারী বলেন, বাজারে মানুষের মাছ কেটে পরিবার চালানোর পাশাপাশি মেয়ের বিয়ে ও নাতি-নাতনির পড়াশোনা খরচ চালাচ্ছি।

 

 

এছাড়া নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিদিনই ১০০ থেকে দেড়শ টাকার ঔষধও ক্রিয় করতে হয়। প্রতিদিন যে আয় হয় তা দিয়ে কোনোরকম চলছি। কিন্তু যদি স্থায়ী কোনো জায়গার ব্যবস্থা হত তাহলে আমাদের সবার জন্যই ভালো হত। পাশাপাশি প্রতিদিন ১০০ টাকার মতো দেওয়া লাগে সেটাও যদি মওকুফ করে দিত তাহলে অনেকেরই সংসার আরও ভালোভাবে চলত। তীব্র গরমে শরীরের ঘাম আর পানিতে একাকার হয়ে মাছ কাটছেন ফরিদা বেগম। তিনি বলেন, যে গরম বাবা হামার কষ্ট দেখার কায়ো নাই। চেংড়ি বয়স হাতে স্বামী নাই। তখন থাকি বাজারে মাছ কাটাকাটি করি।

 

 

 

মোর বাড়িঘর নাই, মাইনসের বাড়িত ভাড়া থাকো। এ্যটে সকালে আসি মাছ কাটি শুরু করি, যা টাকা পাই তা দিয়্যা জীবন চলছে। হামার কষ্টের বাকি দিনগুল্যাও এদোন (এমন) করি যাইবে বাহে। ছোট পরিবার আর চাকরিজীবনের ব্যস্ততম সময়ে একটু অবসর কাটাতে বাজারেই ছোট-বড় মাছ কেটে নেন ক্রেতারা। স্বল্প আয়ে অনেক পরিবারের একমাত্র অবলম্বন বিধবা-বয়স্ক নারীরা। সিরাজুল ইসলাম নামে এক মাছ ক্রেতা বলেন, যারা ছোট মাছ প্রিয়দেও এনারাই একমাত্র ভরসা।

 

 

 

পরিবারের লোকেরা তো ব্যস্ত থাকে। ছোট মাছ বাড়ি নিয়ে গেলে মা, বোন বা বউয়েরা মাছ কাটতে চান না। তারা মাছ কেটে দিচ্ছে বলেই ছোট মাছের স্বাদ নিতে পারছি। রংপুর সিটি বাজারের ব্যবসায়ী ও সংগঠক ইসমাইল হোসেন প্রিন্স বলেন, বাজারে প্রায় অর্ধশত নারী মাছ কেটে সংসার চালাচ্ছেন। তাদেরকে কেউ অবহেলার চোখে দেখে না। বরং ক্রেতা-বিক্রেতা সবার সহযোগিতা ও আন্তরিকতার কারণে এসব অসহায় নারীদের অনেকেই এখন কিছুটা হলেও সংসার ভালভাবে চালাচ্ছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে রাশিয়ান বিনিয়োগের আহ্বান ঢাকা চেম্বারের

তাদেরও সংসার চলে আমরাও ছোট মাছের স্বাদ নিতে পাচ্ছি

আপডেট সময় : ০৫:৩৯:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ মে ২০২৪

বাহে হামরা গরীব মানুষ, হামার তেমন আয় ইনকাম নাই। মাছ কাটি যা হয় সেটা দিয়্যা কোনোমতে সংসার চলে। যেদিন বেশি মাছ কাটি সেদিন ১০ টাকা হইলেও আয় বেশি হয়। আল্লাহর রহমতে মাছ কাটার কাম করি হামার সংসার জীবন চলোছে। এভাবে কথাগুলো বলছিলেন রংপুর নগরীর শেফালী বেগম। প্রায় ১০ বছর ধরে রংপুরের সিটি মাছ বাজারে মাছ কাটার কাজ করেন তিনি।

 

 

তার ভাষায়, হামার গরম আর বর্ষা নাই। হাতে করি, আর পেটে খাই। হামার কাজ না করি আর উপায় নাই বাহে। একদিন কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না। এটে হামরা যারা মাছ কাটি, ওমারগুলার কারো কারো স্বামী নাই। ছাওয়া সন্তান নিয়্যা অনেক কষ্ট! একবেলা মাছ না কাটলে ভাত জুটে না। সকাল থাকি সন্ধ্যা পর্যন্ত যত কেজি মাছ কাটিবার পারি সেভাবেই হামার ইনকাম হয়। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ কেটে দিয়ে প্রতিদিন শেফালীর আয় হয় ৫০০-৬০০ টাকা। তা থেকে জায়গা ভাড়া, ইজারা, পানির বিল ও ময়লা পরিষ্কার বাবদ প্রায় ১০০ টাকা দিতে হয় বাজার কর্তৃপক্ষকে।

 

 

 

শেফালী বেগমের মতো সিটি বাজারে প্রায় ৫০ জন নারী উনুনের খড় পোড়ানো ছাই আর ধারালো বটি দিয়ে মাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করেন। গতকাল রবিবার দুপুরে রংপুর সিটি মাছের বাজার দেখা যায়, সারি সারি নানা বয়সী নারীরা মাছ কেটে দিচ্ছেন। ভ্যাপসা গরমে যে বয়সে ফ্যান বা হাতাপাখার বাতাসে গা জুড়ানোর কথা সেই বয়সে নিজে চলার পাশাপাশি অনেকে নিয়েছেন পরিবার চালানোর মতো গুরু দ্বায়িত্ব। কথা হয় সিটি বাজারে মাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করা সংগ্রামী নারীদের অনেকের সঙ্গে। তারা বলেন, বাজারের মাছ কাটা নারীদের অনেকই বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, বয়স্ক কেউবা অভাবের সংসার চালাতে এ পেশায় এসেছেন। আর মাছ ভেদে প্রতি কেজির বিনিময়ে নেন ১০ থেকে ৫০ টাকা। ষাটোর্ধ্ব রাবেয়া বেগম নামে এক নারী বলেন, বাজারে মানুষের মাছ কেটে পরিবার চালানোর পাশাপাশি মেয়ের বিয়ে ও নাতি-নাতনির পড়াশোনা খরচ চালাচ্ছি।

 

 

এছাড়া নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিদিনই ১০০ থেকে দেড়শ টাকার ঔষধও ক্রিয় করতে হয়। প্রতিদিন যে আয় হয় তা দিয়ে কোনোরকম চলছি। কিন্তু যদি স্থায়ী কোনো জায়গার ব্যবস্থা হত তাহলে আমাদের সবার জন্যই ভালো হত। পাশাপাশি প্রতিদিন ১০০ টাকার মতো দেওয়া লাগে সেটাও যদি মওকুফ করে দিত তাহলে অনেকেরই সংসার আরও ভালোভাবে চলত। তীব্র গরমে শরীরের ঘাম আর পানিতে একাকার হয়ে মাছ কাটছেন ফরিদা বেগম। তিনি বলেন, যে গরম বাবা হামার কষ্ট দেখার কায়ো নাই। চেংড়ি বয়স হাতে স্বামী নাই। তখন থাকি বাজারে মাছ কাটাকাটি করি।

 

 

 

মোর বাড়িঘর নাই, মাইনসের বাড়িত ভাড়া থাকো। এ্যটে সকালে আসি মাছ কাটি শুরু করি, যা টাকা পাই তা দিয়্যা জীবন চলছে। হামার কষ্টের বাকি দিনগুল্যাও এদোন (এমন) করি যাইবে বাহে। ছোট পরিবার আর চাকরিজীবনের ব্যস্ততম সময়ে একটু অবসর কাটাতে বাজারেই ছোট-বড় মাছ কেটে নেন ক্রেতারা। স্বল্প আয়ে অনেক পরিবারের একমাত্র অবলম্বন বিধবা-বয়স্ক নারীরা। সিরাজুল ইসলাম নামে এক মাছ ক্রেতা বলেন, যারা ছোট মাছ প্রিয়দেও এনারাই একমাত্র ভরসা।

 

 

 

পরিবারের লোকেরা তো ব্যস্ত থাকে। ছোট মাছ বাড়ি নিয়ে গেলে মা, বোন বা বউয়েরা মাছ কাটতে চান না। তারা মাছ কেটে দিচ্ছে বলেই ছোট মাছের স্বাদ নিতে পারছি। রংপুর সিটি বাজারের ব্যবসায়ী ও সংগঠক ইসমাইল হোসেন প্রিন্স বলেন, বাজারে প্রায় অর্ধশত নারী মাছ কেটে সংসার চালাচ্ছেন। তাদেরকে কেউ অবহেলার চোখে দেখে না। বরং ক্রেতা-বিক্রেতা সবার সহযোগিতা ও আন্তরিকতার কারণে এসব অসহায় নারীদের অনেকেই এখন কিছুটা হলেও সংসার ভালভাবে চালাচ্ছে।