❖যারা নারীবাদের বিরুদ্ধে তারা ধূমপানকে নারী অধিকারের অংশ বলছে : সীমা মোসলেম
❖আমাদের তামাক কোম্পানিগুলো টার্গেট করে নারীদের ধূমপায়ী বানানোর চেষ্টা করে : ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী
দৃশ্য-১. রমজান মাসে টঙ্গীর সফিউদ্দিন সরকার একাডেমী এন্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির চার ছাত্রী স্কুলের পাশে একটি কোচিং সেন্টারে প্রাইভেট পড়তে যায়। এ সময় কোচিং সেন্টারের পাশে গলিতে স্কুল ড্রেস পরিহিত অবস্থায় ধূমপান করে। এ সময় পাশে থাকা অন্যান্য শিক্ষার্থীরা ভিডিও ধারণ করে। ভিডিওটি যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্কুল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং তারা সেই চার শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে বরখাস্ত করেন।
দৃশ্য-২. মা তার কিশোর বয়সী মেয়েকে নিয়ে স্কুল গেটে দিতে আসেন। দেখেন স্কুল ড্রেসপরা মেয়ের কয়েকজন ক্লাসমেট ধূমপান করছে। এ সময় মা তাদের ধূমপান করতে নিষেধ করেন। তখন সেই মেয়েদের উগ্র উত্তর, এটা আপনাদের সময় নয়। আমরা এখন ধূমপান না করলে চলে না। অগত্যা মা নিজের মেয়েকে ধূমপান না করার অনুরোধ জানিয়ে ওই স্থান ত্যাগ করেন।
‘ধূমপান বিষপান’- এই কথাটির সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সবাই পরিচিত। কিন্তু এত কিছুর পরেও দেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যাও। যা খুবই আতঙ্কজনক। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া থেকে শুরু করে কর্মজীবী অনেক নারী ধূমপানে আসক্ত হচ্ছেন। এর মাধ্যমে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই অবস্থা পরিবর্তনে সচেতনতার দিকেই জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে মেয়েদের মধ্যে ধূমপানের হার বাড়ায় স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ধূমপান ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ ইত্যাদি বিভিন্ন রোগের কারণ। এছাড়াও যৌন দুর্বলতা, মানসিক চাপ বৃদ্ধি, ব্রেইন এর ক্ষতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসসহ নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয় এই ধূমপানের ফলে। এছাড়াও ধূমপান পারিবারিক কলহ, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
তবে, আশার কথা এই যে, বিশে^র প্রধান ২০টি নারী ধূমপায়ীপ্রবণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নেই। ২০২৩ সালের বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী নারী ধূমপায়ী দেশগুলোর মধ্যে ১ নম্বরে রয়েছে নাইরু যার ৪২.১ শতাংশ নারী ধূমপায়ী, দ্বিতীয় সার্বিয়া ৩৯ শতাংশ, বুলগেরিয়া ৪৮ শতাংশ, কিরিবাতি ৩৭.৫ শতাংশ, পাপুয়া নিউগিনি ৩৭.৫ শতাংশ, ক্রোয়েশিয়া ৩৭.৪ শতাংশ, জর্ডান ৩৫.৫ শতাংশ, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ৩৫.৫ শতাংশ, সাইপ্রাস ৩৪.৫ শতাংশ, লাইভিয়া ৩৪.২ শতাংশ, টুভালু ৩৪.২ শতাংশ, লেবানন ৩৩.৭ শতাংশ, বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা ৩৩.৫ শতাংশ, ফ্রান্স ৩৩.৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৩২.৬ শতাংশ, জর্জিয়া ৩১.৬ শতাংশ, এনডোরা ৩১.৩ শতাংশ, গ্রিস ৩১.৩ শতাংশ, হাঙ্গেরির ৩১ শতাংশ নারী ধূমপায়ী, বাংলাদেশে এটি ১৭.১ শতাংশ।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, তামাকের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। তামাক নিয়ন্ত্রণের কথা বললেই সরকারের রাজস্ব আদায় নিয়ে কথা উঠে। কিন্তু সরকার বছরে এ খাত থেকে যে রাজস্ব পায়, তার থেকে ২৭ শতাংশ খরচ বেশি হয় তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারজনিত রোগের চিকিৎসায়।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশে আমরা দেখেছি যে, নারীদের মধ্যে ধূমপায়ীর সংখ্যা অনেক কম ছিল। এখনও অনেক কম আছে। কিন্তু আমরা আগে ২ শতাংশ দেখেছি যা খুবই কম। কিন্তু আমরা অন্য ধরনের তামাক, জর্দা, সাদাপাতা, গুল এগুলোর ব্যবহার নারীদের মধ্যে দেখতে পেয়েছি। ইদানিং আমরা দেখতে পাচ্ছি, শহরাঞ্চলে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েছে।
যদিও আমরা এখনও সলিড কোনো ডাটা পাইনি এ ব্যাপারে। তবে, আমাদের পারসেপশন হচ্ছে যে, শহরাঞ্চলে বিশেষ করে প্রফেশনালদের মধ্যে এবং একটু শিক্ষিত গ্রুপের মধ্যে ধূমপায়ীর সংখ্যা দেখা যাচ্ছে। আগে আমরা এটাকে সামাজিকভাবে ভালো চোখে দেখতাম না। এখন রাস্তাঘাটে প্রায় দেখা যাচ্ছে মেয়েরা ধূমপান করছে। সংখ্যা যে খুব বেড়ে গেছে এটা আমি বলব না। তবে, মেয়েদের মধ্যে ধূমপান বেড়েছে এবং সামাজিক একটা বাধা ছিল, সেটা এখন আর নেই। মানুষও অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটা কেন হচ্ছে? প্রচার একটা কারণ। আমাদের তামাক কোম্পানিগুলো টার্গেট করে নারীদের ধরার চেষ্টা করে।
নারী ধূমপায়ী নিয়ন্ত্রণে আনার উপায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে এই সংক্রান্ত প্রচার আরো নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। আমাদের দেশের মেয়েরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার অনেক বেশি ছিল। স্বামী-বন্ধুবান্ধব কেউ ধূমপান করলে তারা এর শিকার হতেন। এর সঙ্গে এখন তারা নিজেরা যুক্ত হয়েছেন। এতে করে স্বাস্থ্যক্ষতি যা ছিল তা এখন আরও বাড়বে। এজন্যই সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, যারা নারীবাদের বিরুদ্ধে তারা ধূমপানকে নারীর অধিকারের অংশ বলছে। কিন্তু আমরা যারা নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তারা কখনও ধূমপানকে সমর্থন করি না। কারণ, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ড্রাগও যেমন একটা ক্ষতিকর, ধূমপানও ক্ষতিকর।

























