০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রংপুরে হাড়িভাঙা আমের বাগানে প্রয়োগ করা হচ্ছে ক্ষতিকর হরমোন

 রংপুরের মিঠাপুকুর আর বদরগঞ্জের যেদিকেই চোখ যায়. সেদিকে বাগানে বাগানে শুধু হাঁড়িভাঙা আমের নাচন। এমন মনোলোভা ছবির আড়ালে আছে এক বিষাদমাখা গল্প। হাঁড়িভাঙা আম নিয়ে এখন শঙ্কিত খোদ বাগান মালিকরাই। তারা বলেন, বেশি আম ফলাতে গিয়ে গাছের গোড়া ও পাতায় গোপনে ক্ষতিকর হরমোন ছিটিয়ে গাছই মেরে ফেলছেন বাগান লিজ নেওয়া মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার হরমোন দিয়ে আমগাছের জীবনীশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করা হচ্ছে। থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে গাছের বর্ধন। কমছে আমের স্বাদ ও পুষ্টিমানও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, হরমোন প্রয়োগ করা আম খেলে মানব শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, মুনাফালোভী কীটনাশক ব্যবসায়ীর হাত ধরে ভারত থেকে দিনাজপুরের হাকিমপুর, বিরামপুর, ফুলবাড়ীসহ আশপাশের এলাকা দিয়ে চোরাপথে সর্বনাশা হরমোন দেশে ঢুকছে। কৃষি বিভাগ বলেন, আমগাছে এ ক্ষতিকর হরমোন ব্যবহারের অনুমোদন নেই। ১০ বছরের নিচের কোনো গাছে হরমোন ব্যবহার করাই যাবে না। পরিণত গাছে ব্যবহারেরও মাত্রা ও নিয়ম আছে। একবার ব্যবহার করলে পরের তিন বছর বন্ধ রাখতে হয়। তবে ব্যবসায়ীরা না বুঝেই বেশি লাভের আশায় প্রতিবছর হরমোন প্রয়োগ করছেন। বদরগঞ্জ কলেজপাড়ার মৌসুমি আম ব্যবসায়ী মুকুল শাহ। ২০ লক্ষ টাকায় ৩৫ বিঘা জমির আমবাগান লিজ নিয়েছেন তিনি। বেশি ফলনের আশায় গাছের গোড়ায় তিনিও হরমোন প্রয়োগ করেন। মুকুল শাহ বলেন, বাগান লিজ নিয়েছি। কীভাবে বেশি আমের ফলন আনা যায়, সেটার জন্য চেষ্টা করি। হরমোন দিলে গাছের ক্ষতি হয়, জানি। তবে বেশি লাভের আশায় সব বাগান মালিক সেটা করে। স্বাদ, গন্ধ ও রং সুন্দর হলে কাস্টমাররা আম পছন্দ করে। কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, আমগাছে প্রয়োগ করা কালটার বা প্যাকলোবিউট্রাজল উদ্ভিদের বর্ধন নিয়ন্ত্রক রাসায়নিক। এটি তরল বা পাউডার– উভয় অবস্থাতেই পাওয়া যায়। দেশ ও কো¤পানিভেদে এর নাম ভিন্ন হয়। যেমন ভারতের সিনজেনটা কো¤পানি এটি বাজারজাত করে কালটার, থাইল্যান্ড প্যাকলোবিউট্রাজল আর অস্ট্রেলিয়া অসটার নামে। আবহাওয়াজনিত কারণে বাংলাদেশে প্যাকলোবিউট্রাজল ব্যবহার নিষিদ্ধ। কালটার ব্যবহারে প্রথমত গাছের নতুন শাখা-প্রশাখা খাটো হয়ে যায় এবং পাতার আকার ছোট হয়। গাছের আকার-আকৃতি রোগাক্রান্ত অথবা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। দেখা দেয় পোকার আক্রমণ। আগাম ফুল আসে। ফলের আকৃতি ছোট হয়। ওজন কমে যায়। এটি ব্যবহারে স্বল্প মেয়াদে ফলের উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে কমতে থাকে।

গাছের পাতা ধীরে ধীরে শুকিয়ে ডাল মরে যায়। বহুজাতিক কো¤পানিগুলো দেশে হরমোন বাজারজাত করার চেষ্টা করলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) প্যাকলোবিউট্রাজল নিয়ে গবেষণা করেছে। এতে ক্ষতিকর বিষক্রিয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুর রহিমের মতে, কালটার বা প্যাকলোবিউট্রাজল দেশের আমচাষের জন্য উপযুক্ত নয়। কেননা এটি প্রয়োগ করে উৎপাদন বাড়লেও আমের গুণগত মান কমে যায়। আমের স্বাদ ও পুষ্টিমান নষ্ট হয়। রংপুরের বদরগঞ্জ শহরের কয়েকজন কীটনাশক ব্যবসায়ী বলেন, এক মৌসুমে তিন দফায় কালটার কীটনাশক গাছে প্রয়োগ করা হয়।

প্রথমত, গাছের মুকুল আসার ১৫ থেকে এক মাস আগে গাছের গোড়ায় মাটি খুঁড়ে শিকড়ে এই কীটনাশক দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, আমের গুটি আসার পর গাছের পাতায় পাতায় কীটনাশক ছিটানো হয়। পরে আম বড় হলে তখন শেষবারের মতো কীটনাশক দেওয়া হয়। রংপুরের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর হাঁড়িভাঙার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় এ দুই উপজেলার বাজারের প্রায় প্রতিটি কীটনাশকের দোকানে গোপনে এটি বিক্রয় করা হয়। এছাড়াও দেশে একই ধরনের কীটনাশক সিনজেনটা কোপানি কালটার নামে বিক্রয় করছে। এটির এক লিটারের দাম আট হাজার টাকা। সিনজেনটার ডিলার বদরগঞ্জ শহরের তালুকদার মার্কেটের ব্যবসায়ী মনি কুন্ডুর বিক্রয় প্রতিনিধি ভুট্টু চন্দ্র বরেণ, তরল কালটার প্রতি লিটার পানির সঙ্গে এক ফোঁটা মেশাতে হয়। রংপুরের বদরগঞ্জে সিনজেনটার সেলস প্রমোশন অফিসার (এসপিও) আদম আলী বলেন, কালটার মূলত ১২ বছরের ওপরে আমগাছে দিতে হয়। যেসব বড় গাছে আম ধরে না, ওই গাছে কালটার প্রয়োগ করা যায়।

তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার লোভে ছোট গাছে প্রয়োগ করে। রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম এ ওহাব বলেন, হরমোন প্রয়োগ করা আম খেলে মূলত লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আম খাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে যদি হরমোন ¯েপ্র করা হয়, তাহলে ক্ষতির মাত্রা কম হয়। বদরগঞ্জের সদ্য বিদায়ী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা জোবাইদুর রহমান বলেন, হরমোন প্রয়োগের বিষয়টি কয়েক বছর হলো মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ অ লে বেশি হচ্ছে। বাগান মালিকদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি। এ পদ্ধতি দীর্ঘ মেয়াদে গাছের জন্য ক্ষতিকর। এটি আমের প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

রংপুরে হাড়িভাঙা আমের বাগানে প্রয়োগ করা হচ্ছে ক্ষতিকর হরমোন

আপডেট সময় : ০৬:৩৮:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪

 রংপুরের মিঠাপুকুর আর বদরগঞ্জের যেদিকেই চোখ যায়. সেদিকে বাগানে বাগানে শুধু হাঁড়িভাঙা আমের নাচন। এমন মনোলোভা ছবির আড়ালে আছে এক বিষাদমাখা গল্প। হাঁড়িভাঙা আম নিয়ে এখন শঙ্কিত খোদ বাগান মালিকরাই। তারা বলেন, বেশি আম ফলাতে গিয়ে গাছের গোড়া ও পাতায় গোপনে ক্ষতিকর হরমোন ছিটিয়ে গাছই মেরে ফেলছেন বাগান লিজ নেওয়া মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার হরমোন দিয়ে আমগাছের জীবনীশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করা হচ্ছে। থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে গাছের বর্ধন। কমছে আমের স্বাদ ও পুষ্টিমানও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, হরমোন প্রয়োগ করা আম খেলে মানব শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, মুনাফালোভী কীটনাশক ব্যবসায়ীর হাত ধরে ভারত থেকে দিনাজপুরের হাকিমপুর, বিরামপুর, ফুলবাড়ীসহ আশপাশের এলাকা দিয়ে চোরাপথে সর্বনাশা হরমোন দেশে ঢুকছে। কৃষি বিভাগ বলেন, আমগাছে এ ক্ষতিকর হরমোন ব্যবহারের অনুমোদন নেই। ১০ বছরের নিচের কোনো গাছে হরমোন ব্যবহার করাই যাবে না। পরিণত গাছে ব্যবহারেরও মাত্রা ও নিয়ম আছে। একবার ব্যবহার করলে পরের তিন বছর বন্ধ রাখতে হয়। তবে ব্যবসায়ীরা না বুঝেই বেশি লাভের আশায় প্রতিবছর হরমোন প্রয়োগ করছেন। বদরগঞ্জ কলেজপাড়ার মৌসুমি আম ব্যবসায়ী মুকুল শাহ। ২০ লক্ষ টাকায় ৩৫ বিঘা জমির আমবাগান লিজ নিয়েছেন তিনি। বেশি ফলনের আশায় গাছের গোড়ায় তিনিও হরমোন প্রয়োগ করেন। মুকুল শাহ বলেন, বাগান লিজ নিয়েছি। কীভাবে বেশি আমের ফলন আনা যায়, সেটার জন্য চেষ্টা করি। হরমোন দিলে গাছের ক্ষতি হয়, জানি। তবে বেশি লাভের আশায় সব বাগান মালিক সেটা করে। স্বাদ, গন্ধ ও রং সুন্দর হলে কাস্টমাররা আম পছন্দ করে। কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, আমগাছে প্রয়োগ করা কালটার বা প্যাকলোবিউট্রাজল উদ্ভিদের বর্ধন নিয়ন্ত্রক রাসায়নিক। এটি তরল বা পাউডার– উভয় অবস্থাতেই পাওয়া যায়। দেশ ও কো¤পানিভেদে এর নাম ভিন্ন হয়। যেমন ভারতের সিনজেনটা কো¤পানি এটি বাজারজাত করে কালটার, থাইল্যান্ড প্যাকলোবিউট্রাজল আর অস্ট্রেলিয়া অসটার নামে। আবহাওয়াজনিত কারণে বাংলাদেশে প্যাকলোবিউট্রাজল ব্যবহার নিষিদ্ধ। কালটার ব্যবহারে প্রথমত গাছের নতুন শাখা-প্রশাখা খাটো হয়ে যায় এবং পাতার আকার ছোট হয়। গাছের আকার-আকৃতি রোগাক্রান্ত অথবা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। দেখা দেয় পোকার আক্রমণ। আগাম ফুল আসে। ফলের আকৃতি ছোট হয়। ওজন কমে যায়। এটি ব্যবহারে স্বল্প মেয়াদে ফলের উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে কমতে থাকে।

গাছের পাতা ধীরে ধীরে শুকিয়ে ডাল মরে যায়। বহুজাতিক কো¤পানিগুলো দেশে হরমোন বাজারজাত করার চেষ্টা করলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) প্যাকলোবিউট্রাজল নিয়ে গবেষণা করেছে। এতে ক্ষতিকর বিষক্রিয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুর রহিমের মতে, কালটার বা প্যাকলোবিউট্রাজল দেশের আমচাষের জন্য উপযুক্ত নয়। কেননা এটি প্রয়োগ করে উৎপাদন বাড়লেও আমের গুণগত মান কমে যায়। আমের স্বাদ ও পুষ্টিমান নষ্ট হয়। রংপুরের বদরগঞ্জ শহরের কয়েকজন কীটনাশক ব্যবসায়ী বলেন, এক মৌসুমে তিন দফায় কালটার কীটনাশক গাছে প্রয়োগ করা হয়।

প্রথমত, গাছের মুকুল আসার ১৫ থেকে এক মাস আগে গাছের গোড়ায় মাটি খুঁড়ে শিকড়ে এই কীটনাশক দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, আমের গুটি আসার পর গাছের পাতায় পাতায় কীটনাশক ছিটানো হয়। পরে আম বড় হলে তখন শেষবারের মতো কীটনাশক দেওয়া হয়। রংপুরের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর হাঁড়িভাঙার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় এ দুই উপজেলার বাজারের প্রায় প্রতিটি কীটনাশকের দোকানে গোপনে এটি বিক্রয় করা হয়। এছাড়াও দেশে একই ধরনের কীটনাশক সিনজেনটা কোপানি কালটার নামে বিক্রয় করছে। এটির এক লিটারের দাম আট হাজার টাকা। সিনজেনটার ডিলার বদরগঞ্জ শহরের তালুকদার মার্কেটের ব্যবসায়ী মনি কুন্ডুর বিক্রয় প্রতিনিধি ভুট্টু চন্দ্র বরেণ, তরল কালটার প্রতি লিটার পানির সঙ্গে এক ফোঁটা মেশাতে হয়। রংপুরের বদরগঞ্জে সিনজেনটার সেলস প্রমোশন অফিসার (এসপিও) আদম আলী বলেন, কালটার মূলত ১২ বছরের ওপরে আমগাছে দিতে হয়। যেসব বড় গাছে আম ধরে না, ওই গাছে কালটার প্রয়োগ করা যায়।

তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার লোভে ছোট গাছে প্রয়োগ করে। রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম এ ওহাব বলেন, হরমোন প্রয়োগ করা আম খেলে মূলত লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আম খাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে যদি হরমোন ¯েপ্র করা হয়, তাহলে ক্ষতির মাত্রা কম হয়। বদরগঞ্জের সদ্য বিদায়ী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা জোবাইদুর রহমান বলেন, হরমোন প্রয়োগের বিষয়টি কয়েক বছর হলো মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ অ লে বেশি হচ্ছে। বাগান মালিকদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি। এ পদ্ধতি দীর্ঘ মেয়াদে গাছের জন্য ক্ষতিকর। এটি আমের প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।