১১:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সরকারি মেডিকেলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

বেডের চেয়ে রোগী বেশি, মেঝেতেও চলে চিকিৎসা

◉ ৩৪ জেলায় ৩৭ মেডিকেলে বেড সংখ্যা ৭১৬৬০টি
◉ ৫০ জনের বিপরীতে হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ০.০২১১
◉ হাসপাতাল পরিচালকের রুম পরিচ্ছন্ন হলেও বেড থাকে অপরিচ্ছন্ন

❖ রোগ ও রোগীর কথা চিন্তা করে আমাদের সেই পরিমাণ চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকস তৈরি করাসহ হাসপাতাল বেড বাড়ানো উচিত : ডা. মোজাহেরুল হক

❖ যা বাজেট বরাদ্দ আছে এবং কর্মকাণ্ড যা শুনি এতে বর্তমান পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবেনা : ডা. বে-নজীর আহমেদ

❖ এই অবস্থা পরিবর্তন করতে সময়, অর্থ ও পরিকল্পনা লাগবে : ডা. রশীদ-ই-মাহবুব

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এমনকি রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও মেঝেতে শুয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয়। এ দৃশ্য যেমন অস্বাস্থ্যকর তেমনি অমানবিক, অশোভন বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে এই অবস্থার পরিবর্তনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব।
রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশিরভাগ হাসপাতালের ওয়ার্ডে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের বেডসংখ্যা ৪৫টি। রোগী ভর্তি আছে মাত্র ২০০ জন। অর্থাৎ ৪৫ জনের চিকিৎসক-নার্স দিয়ে চলছে ২০০ জনের চিকিৎসা। বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালের মূল ওয়ার্ডে সবগুলো বেডে রোগী ভর্তি। এর বাইরে হাসপাতালের প্যাসেজ জুড়ে রোগীরা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। রোগী মেঝেতে শুয়ে আছেন তার বেডের পাশ দিয়েই জুতো পায়ে হাঁটছেন চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া, রোগীর সঙ্গে থাকা আত্মীয়রা। ক্লিনার ক্লিন করছেন মেঝে। একই হাসপাতালে রোগী মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। রোগীর বেড ও মেঝে অপরিষ্কার। জানালায়, ছাদে ময়লা ঝুলছে। আর সেই হাসপাতালের পরিচালক, সহকারি-পরিচালক, চিকিৎসক, এমনকি নার্সের বসার রুমে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর থাকার স্থানের চেয়ে এই রুমগুলো অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রুমে রয়েছে এসির ব্যবস্থা। খুব গুছানো। অথচ রোগী যেখানে ভর্তি আছে সেই স্থান হাসপাতালের অন্যান্য স্থানের চেয়ে অনেক বেশি অপরিষ্কার-নোংরা। এমনকি রোগীর বেডকভারগুলোও লালচে, দেখলেই মনে হয় যেন ময়লা। রোগীর পাশ দিয়েই হেঁটে বেড়াচ্ছে বিড়াল এবং কুকুরের বাচ্চা। আছে তেলাপোকাও। বাংলাদেশে রোগীদের ভাগ্যের এমন পরিস্থিতি পরিবর্তনে সুষ্পষ্ট পরিকল্পনা নেওয়ার প্রতি জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
একমাত্র রাজধানীর আইসিডিডিআর,বি কলেরা হাসপাতালে দেখা যায়, রোগী বৃদ্ধি পেলে তাঁবু খাটিয়ে বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য হাসপাতালে এ দৃশ্য এখনও পর্যন্ত বিরল।
দেশের মোট হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৬শ ৩৫টি। এরমধ্যে সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৭১ হাজার ৬৬০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৯৯ হাজার ৯৭৫টি। এই সংখ্যক শয্যা দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দেয়া দুরুহ ব্যাপার। বর্তমানে দেশের ৩৪টি জেলায় ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড রয়েছে ৭৩৩টি।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশসহ সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতেই এই দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশেষ করে বিশেষ কোন রোগের প্রাদুর্ভাব (যেমন- ডেঙ্গু, কোভিড, নিউমোনিয়া, ঋতুভিত্তিক জ¦র, শ^াসকষ্ট, ডায়রিয়া ইত্যাদি) বেড়ে গেলে এই অবস্থা আরও বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগীর বেডের সঙ্গেই যুক্ত চিকিৎসক-নার্সসহ রোগীর সব ধরণের সুযোগ সুবিধার বিষয়। যার ফলে, বেডের বাইরে রোগী ভর্তি থাকলে যেমন চিকিৎসা দিতে বেগ পোহাতে হয়, তেমনি রোগীও তার অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট থেকে বঞ্চিত হয়।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন সংসদে জানিয়েছেন, দেশে প্রতি ৯৯০ জনের জন্য হাসপাতালে একটি শয্যা রয়েছে। প্রতি ৫০ জন মানুষের বিপরীতে সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা শুন্য দশমিক শুন্য দুই এক এক টি। তবে, সরকারি হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে বেড সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
‘আমি সব বিভাগে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে কী কী সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করব। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা, চট্টগ্রামের মত শহরে রোগীর ভিড় হবে না, মাটিতে শুয়ে থাকতে হবে না’ – বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
গত জুনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ফলে আগের বারের চেয়ে এবার বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
এ অবস্থা এত সহজে বদলানোর নয় বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ডা. রশীদ-ই-মাহবুব দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এই অবস্থা পরিবর্তন করতে সময়, অর্থ ও পরিকল্পনা লাগবে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা’র সাবেক উপদেষ্টা ডা. মো. মোজাহেরুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রোগীদের অবস্থানের যে দুরবস্থা, এটা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। রোগীদের জন্য বেড সংখ্যা যে কম এটা কর্তৃপক্ষ জানে এবং কর্তৃপক্ষ জেনে ঢাকা মেডিকেল কলেজে বেড সংখ্যা বাড়িয়েছে কিন্তু তার তুলনায় রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। সুতরাং সরকারের যে পরিকল্পনায় থাকা উচিত যে, প্রতিবছর কি পরিমাণ রোগী ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে আসছে তা বাড়ছে। সেটার উপরেই রোগীর বেড বাড়ানো থেকে শুরু করে চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যান্য সেবাদানকারি তাদের সংখ্যাও বাড়ানো উচিত এবং এই জন্য প্রতিবছর কি পরিমাণ রোগী একটি মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে আসছে সেই পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (উন্নয়ন পরিকল্পনা) করা দরকার। একটা হাসপাতাল একসময় চারশ বেডের ছিল সেটা এখন বেড়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। সুতরাং রোগী বাড়ার যে ট্রেন্ড, পাশাপাশি রোগের যে ট্রেন্ড তা দেখতে হবে। আগে যেসব রোগ ছিল সেগুলো এখন অনেক কমে গেছে। এখন যক্ষ্মারোগী নাই বললেই চলে। রোগ ও রোগীর কথা চিন্তা করে আমাদের সেই পরিমাণ চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকস তৈরি করাসহ হাসপাতাল বেড বাড়ানো উচিত। এ ব্যাপারে একটা কৌশলগত পরিকল্পনা থাকা দরকার। যার মাধ্যমে হাসপাতালটির সেবার সুযোগ বাড়বে। এ পরিকল্পনা ৫,১০,১৫ বা ২৫ বছরের হতে পারে। একইসঙ্গে একটি হাসপাতাল শুরু করার সময়ই তার পাশে সেই যায়গা রাখতে হবে যে, এটি ভবিষ্যতে আরও বড় হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. বে-নজীর আহমেদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা খুব একটা আশাবাদী না। যে বাজেট বরাদ্দ আছে এবং কর্মকাণ্ড যা শুনি এতে বর্তমান পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবেনা। বর্তমান পরিস্থিতি বদলাতে চাইলে খুব বড় মাপের প্রজেক্ট নিতে হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে ওখানে যাতে রোগীরা ভাল সেবা পায়। তারফলে, উপরের দিকে কম রোগীরা আসবে। যদিও আমাদের দেশ ছোট কিন্তু মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটি। সেই তুলনায় হাসপাতালের বেডের সংখ্যা কম। ঢাকায় আরও ১০টি হাসপাতাল ১ হাজার শয্যার হওয়া উচিত ছিল। এগুলো নাই তো যার ফলে আমাদের এই সমস্যাগুলোয় পড়তে হচ্ছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ জানাচ্ছে, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আনুষ্ঠানিক খাতের সরকারি চাকরিজীবী ও পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের জন্য সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অনানুষ্ঠানিক খাতের জনগোষ্ঠীকেও এ বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে।

জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

সরকারি মেডিকেলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

বেডের চেয়ে রোগী বেশি, মেঝেতেও চলে চিকিৎসা

আপডেট সময় : ০২:৩৯:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪

◉ ৩৪ জেলায় ৩৭ মেডিকেলে বেড সংখ্যা ৭১৬৬০টি
◉ ৫০ জনের বিপরীতে হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ০.০২১১
◉ হাসপাতাল পরিচালকের রুম পরিচ্ছন্ন হলেও বেড থাকে অপরিচ্ছন্ন

❖ রোগ ও রোগীর কথা চিন্তা করে আমাদের সেই পরিমাণ চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকস তৈরি করাসহ হাসপাতাল বেড বাড়ানো উচিত : ডা. মোজাহেরুল হক

❖ যা বাজেট বরাদ্দ আছে এবং কর্মকাণ্ড যা শুনি এতে বর্তমান পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবেনা : ডা. বে-নজীর আহমেদ

❖ এই অবস্থা পরিবর্তন করতে সময়, অর্থ ও পরিকল্পনা লাগবে : ডা. রশীদ-ই-মাহবুব

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এমনকি রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও মেঝেতে শুয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয়। এ দৃশ্য যেমন অস্বাস্থ্যকর তেমনি অমানবিক, অশোভন বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে এই অবস্থার পরিবর্তনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব।
রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশিরভাগ হাসপাতালের ওয়ার্ডে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের বেডসংখ্যা ৪৫টি। রোগী ভর্তি আছে মাত্র ২০০ জন। অর্থাৎ ৪৫ জনের চিকিৎসক-নার্স দিয়ে চলছে ২০০ জনের চিকিৎসা। বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতালের মূল ওয়ার্ডে সবগুলো বেডে রোগী ভর্তি। এর বাইরে হাসপাতালের প্যাসেজ জুড়ে রোগীরা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। রোগী মেঝেতে শুয়ে আছেন তার বেডের পাশ দিয়েই জুতো পায়ে হাঁটছেন চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়া, রোগীর সঙ্গে থাকা আত্মীয়রা। ক্লিনার ক্লিন করছেন মেঝে। একই হাসপাতালে রোগী মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। রোগীর বেড ও মেঝে অপরিষ্কার। জানালায়, ছাদে ময়লা ঝুলছে। আর সেই হাসপাতালের পরিচালক, সহকারি-পরিচালক, চিকিৎসক, এমনকি নার্সের বসার রুমে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর থাকার স্থানের চেয়ে এই রুমগুলো অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রুমে রয়েছে এসির ব্যবস্থা। খুব গুছানো। অথচ রোগী যেখানে ভর্তি আছে সেই স্থান হাসপাতালের অন্যান্য স্থানের চেয়ে অনেক বেশি অপরিষ্কার-নোংরা। এমনকি রোগীর বেডকভারগুলোও লালচে, দেখলেই মনে হয় যেন ময়লা। রোগীর পাশ দিয়েই হেঁটে বেড়াচ্ছে বিড়াল এবং কুকুরের বাচ্চা। আছে তেলাপোকাও। বাংলাদেশে রোগীদের ভাগ্যের এমন পরিস্থিতি পরিবর্তনে সুষ্পষ্ট পরিকল্পনা নেওয়ার প্রতি জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
একমাত্র রাজধানীর আইসিডিডিআর,বি কলেরা হাসপাতালে দেখা যায়, রোগী বৃদ্ধি পেলে তাঁবু খাটিয়ে বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য হাসপাতালে এ দৃশ্য এখনও পর্যন্ত বিরল।
দেশের মোট হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৬শ ৩৫টি। এরমধ্যে সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৭১ হাজার ৬৬০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৯৯ হাজার ৯৭৫টি। এই সংখ্যক শয্যা দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দেয়া দুরুহ ব্যাপার। বর্তমানে দেশের ৩৪টি জেলায় ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড রয়েছে ৭৩৩টি।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশসহ সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতেই এই দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশেষ করে বিশেষ কোন রোগের প্রাদুর্ভাব (যেমন- ডেঙ্গু, কোভিড, নিউমোনিয়া, ঋতুভিত্তিক জ¦র, শ^াসকষ্ট, ডায়রিয়া ইত্যাদি) বেড়ে গেলে এই অবস্থা আরও বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগীর বেডের সঙ্গেই যুক্ত চিকিৎসক-নার্সসহ রোগীর সব ধরণের সুযোগ সুবিধার বিষয়। যার ফলে, বেডের বাইরে রোগী ভর্তি থাকলে যেমন চিকিৎসা দিতে বেগ পোহাতে হয়, তেমনি রোগীও তার অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট থেকে বঞ্চিত হয়।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন সংসদে জানিয়েছেন, দেশে প্রতি ৯৯০ জনের জন্য হাসপাতালে একটি শয্যা রয়েছে। প্রতি ৫০ জন মানুষের বিপরীতে সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা শুন্য দশমিক শুন্য দুই এক এক টি। তবে, সরকারি হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে বেড সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
‘আমি সব বিভাগে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে কী কী সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করব। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা, চট্টগ্রামের মত শহরে রোগীর ভিড় হবে না, মাটিতে শুয়ে থাকতে হবে না’ – বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
গত জুনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ফলে আগের বারের চেয়ে এবার বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
এ অবস্থা এত সহজে বদলানোর নয় বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ডা. রশীদ-ই-মাহবুব দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এই অবস্থা পরিবর্তন করতে সময়, অর্থ ও পরিকল্পনা লাগবে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা’র সাবেক উপদেষ্টা ডা. মো. মোজাহেরুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, রোগীদের অবস্থানের যে দুরবস্থা, এটা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। রোগীদের জন্য বেড সংখ্যা যে কম এটা কর্তৃপক্ষ জানে এবং কর্তৃপক্ষ জেনে ঢাকা মেডিকেল কলেজে বেড সংখ্যা বাড়িয়েছে কিন্তু তার তুলনায় রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। সুতরাং সরকারের যে পরিকল্পনায় থাকা উচিত যে, প্রতিবছর কি পরিমাণ রোগী ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে আসছে তা বাড়ছে। সেটার উপরেই রোগীর বেড বাড়ানো থেকে শুরু করে চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যান্য সেবাদানকারি তাদের সংখ্যাও বাড়ানো উচিত এবং এই জন্য প্রতিবছর কি পরিমাণ রোগী একটি মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে আসছে সেই পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (উন্নয়ন পরিকল্পনা) করা দরকার। একটা হাসপাতাল একসময় চারশ বেডের ছিল সেটা এখন বেড়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। সুতরাং রোগী বাড়ার যে ট্রেন্ড, পাশাপাশি রোগের যে ট্রেন্ড তা দেখতে হবে। আগে যেসব রোগ ছিল সেগুলো এখন অনেক কমে গেছে। এখন যক্ষ্মারোগী নাই বললেই চলে। রোগ ও রোগীর কথা চিন্তা করে আমাদের সেই পরিমাণ চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকস তৈরি করাসহ হাসপাতাল বেড বাড়ানো উচিত। এ ব্যাপারে একটা কৌশলগত পরিকল্পনা থাকা দরকার। যার মাধ্যমে হাসপাতালটির সেবার সুযোগ বাড়বে। এ পরিকল্পনা ৫,১০,১৫ বা ২৫ বছরের হতে পারে। একইসঙ্গে একটি হাসপাতাল শুরু করার সময়ই তার পাশে সেই যায়গা রাখতে হবে যে, এটি ভবিষ্যতে আরও বড় হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. বে-নজীর আহমেদ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমরা খুব একটা আশাবাদী না। যে বাজেট বরাদ্দ আছে এবং কর্মকাণ্ড যা শুনি এতে বর্তমান পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবেনা। বর্তমান পরিস্থিতি বদলাতে চাইলে খুব বড় মাপের প্রজেক্ট নিতে হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে ওখানে যাতে রোগীরা ভাল সেবা পায়। তারফলে, উপরের দিকে কম রোগীরা আসবে। যদিও আমাদের দেশ ছোট কিন্তু মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটি। সেই তুলনায় হাসপাতালের বেডের সংখ্যা কম। ঢাকায় আরও ১০টি হাসপাতাল ১ হাজার শয্যার হওয়া উচিত ছিল। এগুলো নাই তো যার ফলে আমাদের এই সমস্যাগুলোয় পড়তে হচ্ছে।
এদিকে, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ জানাচ্ছে, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আনুষ্ঠানিক খাতের সরকারি চাকরিজীবী ও পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের জন্য সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অনানুষ্ঠানিক খাতের জনগোষ্ঠীকেও এ বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে।