ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সরকার মনোযোগ দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের সফরে ২১ জুলাই মাদ্রিদ যাচ্ছেন। বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর এটাই মাদ্রিদে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। সফরে দুই দেশের সম্পর্কের উত্তরণের পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগ অগ্রাধিকার পাবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মাদ্রিদে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লেখেন। ওই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি ২১ জুলাই স্পেন যাচ্ছেন।
মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ২৩ থেকে ২৫ জুলাই জি-২০-এর বিশেষ অধিবেশন ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যোগ দিতে ব্রাজিল যাচ্ছেন। ব্রাজিল সফরের আগে তিনি স্পেন যাবেন। সব মিলিয়ে এ মাসে চীনসহ শেখ হাসিনা তিনটি দেশে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করছেন।
জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর স্পেনে এটাই প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি সফরে অগ্রাধিকার পাবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ২২ জুলাই মাদ্রিদের মনক্লোয়া প্রাসাদে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চতুর্থ বৃহত্তম বাজার স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগত কারণেই ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেবেন। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ বিকাশমান নানা খাতে বিনিয়োগের প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসবে; পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসনের বিষয়টি তোলা হবে।
সূত্র জানায়, দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজাকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির মতো আন্তর্জাতিক পরিসরে দুই দেশের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে স্পেন সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ ও অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজনৈতিক সম্পর্ক নিবিড় করার উপাদান বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
দুই দেশের মধ্যে শীর্ষ বৈঠকের পর চুক্তি সই হবে কি না, জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মাসখানেকের প্রস্তুতিতে সফরটি হচ্ছে। ফলে এবারের সফরে কোনো চুক্তি সই হচ্ছে না। তবে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পরামর্শক সভা, বাংলাদেশের রেলওয়ের আধুনিকায়নে সহায়তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে সহায়তা, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও দুই দেশের ফরেন সার্ভিস একাডেমির মধ্যে সহায়তা।
বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে ব্যবসায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। গত বছর বাংলাদেশ ওই দেশে ৩৭০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ২২ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। পোশাকের পাশাপাশি সফরে বাংলাদেশের পণ্যের বহুমুখীকরণে সহায়তা চাওয়া হতে পারে এই সফরে; পাশাপাশি বিনিয়োগেও জোর দেওয়া হবে।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে স্পেন অভিবাসনবান্ধব হিসেবে পরিচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরাতে বাংলাদেশ চুক্তি সই করলেও স্পেন এখনো কোনো অনুরোধ করেনি। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ হাজার নাগরিক স্পেনে রয়েছেন। ভবিষ্যতে আরও কর্মী নেওয়ার অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ।
বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হবে কি না কিংবা স্পেন প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে কি না, জানতে চাইলে এক কূটনীতিক বলেন, উড়োজাহাজ নির্মাণসহ আকাশপথের প্রযুক্তি উৎপাদনে সক্ষম দেশগুলোর অন্যতম হচ্ছে স্পেন। দেশটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাডার সরবরাহসহ সামগ্রিক নিরাপত্তায় যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

























