সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করার পর আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ার সুযোগে তাদের শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন হয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। গত ৫ আগষ্ট থেকে ১৭ আগষ্ট পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব নাশকতার ঘটনা ঘটে। আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের দাবী, বিএনপি-জামাতের দোসররা ও সুযোগ সন্ধানী দূস্কৃতিকারীরা এ হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে।
তবে, এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবী, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নি সংযোগসহ কোন নাশকতার ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের কোন নেতাকর্মী জড়িত নয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও দাবী করেন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজাহারুল ইসলাম মান্নান ও নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহআলম মুকুল।
সংশ্লিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পর সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। এ সুযোগে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ জনতা ও সুযোগ সন্ধানী দূস্কৃতিকারীরা বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগকরে। এছাড়াও আওয়ামী লীগের কয়েকটি কার্যালয় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগকরে। মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহাগ রনির টিপুরদী এলাকায় একটি কারখানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে তার প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন হয়।
সোনারগাঁ পৌরসভার দরপত এলাকায় শ্রমিকলীগ নেতা করিম আহমেদের ফার্মে গরু, হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খামারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এসময় হামলাকারীরা ৮টি গরু, ২টি মহিষ, কয়েক হাজার হাঁস-মুরগি ও পুকুর থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ লুট করে নিয়ে যায়। শ্রমিকলীগ নেতা করিম আহমেদের দাবী, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় তার ফার্মের প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন হয়েছে। এছাড়াও লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভার্স্কয ভাংচুর করা হয়েছে।
পিরোজপুর ইউনিয়নের প্রতাপের চর এলাকায় মিন্টু মিয়ার বাড়ি ও আষাঢ়িয়ার চর গ্রামে বিএনপি প্রভাবশালী নেতারা শ্রমিকলীগ নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল হালিম ও মেহেদী হাসানকে কুপিয়ে আহত করে নগদ টাকাসহ আড়াই লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এছাড়াও শাহআলমের হোটেল, সহর আলীর ঔষধের দোকান, জসিম উদ্দিনের দালানের রড ও আসবাবপত্র লুট, ফজা মিয়ার বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট, শাহজালাল এর বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট, উজ্জল মিয়ার বাড়ির আসবাবপত্র ও গরু লুট, মারফত আলীর বাড়ি ঘর ভাংচুর ও লুট, মালেক হাজী, আহসান উল্লাহর দোকানে হামলা ও লুটপাট, আব্দুস সোবহান এর ছেলে রেজেয়ান এর মটরসাইকেল ও ৬টি ড্রাম ট্রাকের ব্যাটারি লুট, আবু বকর সিদ্দিক মিয়ার ৪টি ড্রাম ট্রাকের ব্যাটারি লুট, সাবেক মহিলা মেম্বার মমতাজ বেগমের বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট। এ অ লের ক্ষতির পরিমান প্রায় ৭০ লাখ টাকা।
বারদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বাবুল ও তার ভাই আমিনুল ইসলামের বাড়িঘর ও দোকান পাটে হামলা, ভাংচুর চালানো হয়। শান্তির বাজার এলাকায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাংচুর করা হয়। নুনেরটেক এলাকায় ইউপি সদস্য ওসমান গণিসহ ১৬ নেতাকর্মীর বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
সাদিপুর ইউনিয়নের নয়াপুর গ্রামে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রান ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক সালাউদ্দিন মাসুমের বাড়ি, প মীঘাট বাজারে আওয়ামী লীগের সমর্থক আইয়ুব আলী ও তার ভাই মামুন ভূঁইয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা করে পিকআপ ভ্যানে করে মালপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। সাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলামের দুটি বাড়ি ও সাদিপুর ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের কার্যালয় ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়।
জামপুর ইউনিয়নের বশিরগাঁও এলাকার ইউনিয়ন বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার নেতৃত্বে বজলুর রহমানের জায়গা দখল, বস্তল এলাকার পল্লী চিকিৎসক বসুর দোকান ভাংচুর, কলতাপাড়া গ্রামের হাবিবুল্লাহর দুটি গরু লুট করে নিয়ে জবাই করে অনুষ্ঠান করা হয়। ৪নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেনের বশিরগাঁও বাড়ি, মিরেরটেক বাজারে এশিয়ান টিভির সাংবাদিক পনির হোসেনের অফিস, মহজমপুর এলাকায় দুলাল ভূইয়ার অফিস ও বাড়ি, জামপুর গ্রামে সাবেক ইউপি সদস্য সুজনের বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট করে। একই এলাকায় আওয়ামীলীগ নেতা হরমুজ আলীর দুই ছেলে রনি ও মোহাম্মদ আলীকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পাকুন্ডা গ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা শাদত আলীরসহ ১৭টি বাড়িঘর ভাংচুর করে। তালতলা এলাকায় জামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও ৫নং ওয়ার্ড কার্যালয় ভাংচুর করা হয়। তালতলা বাজারে আওয়ামীলীগ নেতা ফিরোজ হোসেনের দোকান, যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলামের বাড়ি ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের কার্যালয় ভাংচুর করে।
সনমান্দি ইউনিয়নের দড়িকান্দি এলাকায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়, সোনারগাঁ উপজেলা যুবলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মিজানুর রহমানের চরলালের বাড়ি, অলিপুরা বাজারে তাকবিরের ঔষদের দোকান ভাংচুর ও লুট করা হয়।
নোয়াগাঁও ইউনিয়নে গোবিন্দপুর গ্রামে আওয়ামী লীগের সমর্থক ইমনের বাড়ি ও চৌরাপাড়া গ্রামের আতাউরের বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট করে।
বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের হামছাদী এলাকায় কৃষক লীগের আহবায়ক করিম আহমেদের খামার বাড়িতে হামলা করে ১২টি গরু, হাঁস, মুরগী, ছাগল, ভেরা ও মাছ লুট করে নিয়ে যায় বিএনপির কর্মী সমর্থকরা। ওই বাড়ি দখল করে নতুন ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় প্রায় ২ কোটিরও অধিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন। এছাড়াও পৌরসভার দরপত এলাকায় তার আরো একটি খামারের প্রায় ১৭টি গরু লুট করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহআলম মুকুল জানান, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উত্তেজিত জনতা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন কিছু ভাংচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানতে পেরেছি। কে বা কারা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে তা আমাদের জানা নেই। বিএনপি একটি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক দল। ইতিমধ্যেই দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সংখ্যালঘুূদের নিরাপত্তা প্রদান ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের কোন নেতাকর্মীরা হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত নেই। বিএনপির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো থেকে সবাইকে বিরত থাকার জন্য আহবান জানাই।
সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অনেক হামলা, মামলা ও হয়রানীর শিকার হলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের সকল প্রকার নাশকতা থেকে দূরে থাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত নয়। আমরা উপজেল াবিএনপির পক্ষ থেকে বারদী শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম, বিভিন্ন মন্দির ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পাহারা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। এখন পর্যন্ত সব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তারপরও নাশকতার ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের কারো জড়িত থাকার অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দলীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার বলেন, সোনারগাঁয়ে সবসময় সহবস্থানে থেকে রাজনীতি পরিচালনা করেছি। আমি দুইবার সংসদ সদস্য ছিলাম। কাউকে মিথ্যা মামল াদিয়ে হয়রানী করিনি। আশা করি বিএনপিও সহবস্থানে থেকে রাজনীতি পরিচালনা করবে। যারা হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার শিকার হয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।























