ভোলা থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে উধাও যুবলীগ সভাপতি ও পৌর মেয়র মনিরুজ্জামান মনির। এ টাকা পৌরসভার বিভিন্ন প্রকল্প, মার্কেট, পাবলিক টয়লেট, খাল পাড় বিক্রি, পৌরসভার বিভিন্ন রাস্তা থেকে চাদা আদায়, পৌর মার্কেটে দোকান দেয়ারকথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেয়া, গ্যাস ও পানির লাইন নেয়ার জন্য রাস্তা কাটার ক্ষতিপুর ভাবত ও পৌরবাসি বহুতল ভবন করার জন্য প্লান অনুমোদনের ঘুষ নেয়া এবং রিক্সা, অটো, বোরাকের ও ট্রেড লাইসেন্স খাতের । এর পরেও রয়েছে পানিউন্নয়ন বোর্ড, গনপূর্ত, সড়ক, এল জি ই ডি, সদর হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রকৌশলের কাজ নিয়ে তা না করে বিল উত্তোলনের টাকা।
পৌরবাসি সুত্রে জানা গেছে, ১৬ বছর পূর্বে মনিরুজ্জামান মনির ছিলেন ভবঘুরে ও টেরর, প্রেম করে দৌলতখানের আওয়ামীলীগের সহসভাপতি রতন মিয়ার মেয়েকে বিয়ে করেন। সদর উকিল পাড়ার বাবা আসাদ মিয়ার সংসারেই তার জীবন চলতো। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পরে সাবেক মন্ত্রী ও এমপি তোফায়েল আহমেদের ভাগ্নে সুবাদে মনিরুজ্জামান মনিরের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। তিনি রাতারাতি হয়ে উঠেন ভোলার ডন। টেন্ডার, দখল, মাদক ব্যবসা আর চাদাবাজির টাকায় তিনি বাংলাদেশের শিরি বেয়ে-ভারত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইলেন্ড, জার্মানেরও শিরিও পার হয়েছেন। এর মধ্যে জেলা যুবলীগের সভাপতির পদও ভাগিয়ে নেন। গড়ে তোলেন একটি বাহিনী, তার পর থেকে তাকে আর পিছনের দিকে তাকাতে হয়নি। এর মধ্যে ভোলার ৭ উপজেলার বিএনপির নেতা-কমীদের নামে গায়েবী শত শত মামলা দিয়ে ভোলা ছাড়া করেছেন। অনেক নেতা-কমী বিভিন্ন জেলায় গিয়ে লুকিয়ে দিনমজুর, রিক্সা, ভ্যান ও গাড়ির ড্রাাভিারী করে দিন যাপন করেছেন। অনেক নেতা-কর্মীকে পিটিয়ে-কুপিয়ে জখম করে পুলিশে দিয়েছেন। ভোলার কোন সাংবাদিকে তাদের বা আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কোন সংবাদ প্রকাশ করতে পারেননি। অনেক সাংবাদিককে পত্রিকা ও টেলিভিশনের চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। প্রেসক্লাব দখলে নিয়ে নিজেদের লোক দিয়ে সাংবাদীক লীগ অফিস বানিয়েছেন। দৈনিক দিনকালের জেলা প্রতিনিধি, জেলা যুবদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং বিএনপির সদস্য-মিজানুর রহমানকে চাদা বাজিসহ বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানী, ৫ বার পিটিয়ে ও ১ বার হত্যার উদ্দেশে তার বাহিনী দিয়ে রাত সাড়ে ৯টার সময় নতুনবাজারে গায়ে গ্যাসের আগুন লাগিয়ে নির্যাতন করেন।
২০১১ সালে ভোলা পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির মেয়র ওকাউন্সিলর প্রার্থীদেরকে মামলা-হামলা করে মাঠ ছাড়া করে, মন্ত্রী মামাকে দিয়ে মেয়র পদও ভাগীয়ে নেন। তার পরেও ২ বার নৌকা প্রতীক নিয়ে অটো মেয়র নির্বাচিত হয়ে ২৪ সালের ৪ আগষ্ট রবিবার পর্যন্ত ছিলেন। ২০১১ সালে পৌর নির্বাচনে অংশ নেয়ার সময় হলফনামায় স্ত্রীর গহনা ও ব্যাংক ব্যালেন্সসহ সামান্য টাকার বিবরণ জমা দিয়েছিলেন। মেয়র নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর গত ১৩ বছরে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, মুসলিম-হিন্দু ও সাংবাদিকসহ সহস্রাধীক ব্যবসায়ীকে জিয়া সুপার মলে ঘর দেয়ার নাম করে কয়েকশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নামে-বেনামে প্রকল্প দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে গড়েছেন প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের। বিগত কয়েক বছর তার বিরুদ্ধে স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিলেও অদৃশ্য কারণে কোনোটিরই তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পৌর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মনিরুজ্জামান মনির জিয়া সুপার মার্কেটের মুল ও পিছনের অংশে শতাধীক দোকান বরাদ্দ প্রদানে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম করে কয়েকশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কিচেন মার্কেটে শতাধীক, খাল পাড়ে শতাধীক, পাবলিক টয়লেট ভেঙ্গে বহুতল মার্কেট করে দোকান বরাদ্দের সময় নির্ধারিত জামানাত ছাড়াও নিজ নামে দোকান প্রতি বিনারসিদে ২০ থেকে ২৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় করেন। ১ রুম দোকান দেখিয়ে ৫ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, শেষে অন্য ১ জনের কাছে দোকান বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু ওই ৫ জনের টাকা আর ফেরত দেননি। টাকা চাইতে গেলে বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দোকানদারদের জামানতকৃত পৌর তহবিলের ও পানি শাখার কোটি কোটি টাকা নিজেই উত্তোলন করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। এদিকে বিগত ১৩ বছরে পৌরসভায় নামসর্বস্ব প্রকল্প দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন কোটি কোটি টাকা। গুরুত্বপূর্ণ এঙই অর্থায়নে ৩৭ জেলা শহর প্রকল্পের ৩শত কোটির অধিক, উপকুলীয় শহর পরিবেশগত অবকাঠামো প্রকল্পের(ঈঞঊওচ), জলবায়ু ট্রাষ্ট ফান্ডের কয়েকশত কোটি টাকা, ২৮ টি ষ্টেট লাইটের সম্পূর্ন টাকা এবং জমি অধিগ্রহনের ১৩ কোটি টাকা সবই আত্নসাত করার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ব্যবসায়ীদের নিজ অর্থায়নে নির্মিত মার্কেটের রাস্তাকে পৌর সড়ক দেখিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বিল পাস করে অর্থ উত্তোলন, বিভিন্ন প্রকল্প নির্মাণ ব্যয়ের চেয়ে ১০ গুণ বেশি টাকায় ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ, নির্মিত প্রকল্প পুনঃনির্মাণের নামে অর্থ লোপাট, পৌরসভার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প দরপত্রের আগেই কাজ শেষ করে উদ্বোধন, রাজস্ব ও এডিবির প্রাপ্ত টাকায় কোনো প্রকার প্রকল্প কমিটি, টেন্ডার ও রেজুলেশন ছাড়াই নিজেই প্রকল্পের ভাগ-বাটোয়ারা করে অর্থ লুটপাট, পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে বিপুল অর্থ বাণিজ্য, পৌসভার রাস্তা, ফুটপাত, পুল থেকে কোটি কোটি টাকা চাদা আদায়, মুসলিম-হিন্দুদের ভূমি দখল, মন্দিরের ঘর দখল, নদীর বালু বিক্রি বহু অভিযোগ রয়েছে। তার চাদা তোলার জন্য অফিসার পাড়ার-ভাঙ্গারী সবুজ, রানা, পিয়াসসহ ২ শতাধীক একটি বাহিনী রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরেও তারা এখনও চাদা আদায় করছেন।
ভোলা পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা অভিযোগ করে বলেন, পৌর পরিষদের সভা কিংবা মতাতম ছাড়াই পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। যেখানে ড্রেন ও রাস্তার দরকার সেখানে তিনি তা করতেননা। অনেক এলাকায় পানি নিস্কাশন না হওয়ায় ওই এলাকার লোকেরা পচা গন্ধে বছরের পর বছর পার করেছেন। তারা পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। হিন্দু-মুসলিমদের ভুমি দখলে সহায়তা করতেন বাপ্তার নিবাসি ও স্বর্নচোরাকারবারী-অবিনাশ নন্দি এবং পৌরসভার প্রকল্পের টাকা আত্নসাতের সহায়তা করতেন নির্বাহী প্রকৌশলীরা, সচিব আবুলকালাম আজাদ এবং বাজার পরিদর্শক স্বজল। বিনিময়ে তারাও বিশাল অংকের একটি ভাগ পেতেন। তারাও এখন শত কোটি টাকার মালিক। বিগত ১৩ বছরে ভোলা পৌরসভা তহবিল মেয়র মনিরের ব্যক্তিগত তহবিলে পরিণত হয়েছে। পৌর পরিষদের সভায় কোনো রকম অনুমোদন ছাড়াই মেয়র নিজের ইচ্ছেমতো আয়-ব্যয় করেন।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গত ১৩ বছরে মেয়র মনির ভোলার উকিল পাড়ায়, ঢাকার বনানী, ভারত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইলেন্ড নিজ, স্ত্রীর, শ^াশুড়ি, শালা ও শালির নামে বাড়ি, ক্লোল্ড ষ্টোর, মার্কেট ক্রয় করেন। যার বর্তমান মুল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। এসব অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুদকের চেয়ারম্যান ও সচিবের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন পৌর কাউন্সিলররা।
কালি বাড়ি রোর্ডের জমির মালিক আবু মিয়া জানান, মেয়র মনির তার ২ একর জমি দখল করে নিয়ে গেছে। মেদুয়ার বাবুল বলেন, তাদের ৫০ জনের প্রায় ৫শত একর জমি দখল করে নিয়েছেন মেয়র। বশির, লিটন, আঃরব, টিংকু, মিজান,মুজান্মেলসহ অনেকে জানান, আমাদের কোটি কোটি টাকার জমি জোর করে নিয়ে রাস্তা তৈরী করে, সেই রাস্তাকে অধিগ্রহন দেখিয়ে টাকা নিজে উত্তোলন করে আত্নসাৎ করেছেন। ৫ আগষ্ট-২০২৪ ইং তারিখ সোমবার ভোর রাতে কিছু লোকের সহায়তায় মেয়র মনিরুজ্জামান মনির ভোলা থেকে সপরিবারে পালিয়ে যায়।
এবিষয়ে সচিব আবুল কালাম আজাদ, বাজার পরিদর্শক স্বজল জানান, আমরা ছোট কর্মচারী, স্যার আমাদেরকে যে আদেশ দিতেন তা আমাদের পালন করতে হত। অবিনাশ নন্দি জানান, আমার ব্যবসায়ক পাটনার ছিল সে, কি পরিমান টাকার ব্যবসা করেছি তা মনে নাই, কাগজ পত্র দেখলে বলতে পারবো।





















