◉জামিনে মুক্ত ও কারাগার থেকে এখনো পলাতক ৭৯ জঙ্গি
◉ আদালত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গির হদিস নেই
◉ হামলার শঙ্কায় দেশজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা
◉ জামিনে থাকা জঙ্গিদের গতিবিধি নজরদারিতে পুলিশ
কোটা সংস্কার ইস্যুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কারাগারে হামলা ও কারাবন্দিদের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো পলাতক যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আছেন ৯৮ জন। পলাতক বন্দিদের মধ্যে জঙ্গি-সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৭৯ জন আছেন। এর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি আছেন ৯ জন। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গিও জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। ধারণা করা হচ্ছে, জামিনে ছাড়া পাওয়া ও কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিরা ফের সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর আগে পুরান ঢাকার সিএমএম আদালত থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্ধর্ষ দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তার সহকর্মীরা। তবে এখনো সেই দুই জঙ্গির খোঁজ পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সংস্থা। বাহিরে থাকা এসব জঙ্গিরা আবারো নিজেরা সংঘটিত হয়ে টার্গেটকৃত স্থানে হামলা চালাতে পারে এমন শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে বাড়ছে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। অপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারকার্য সম্পন্ন না করে গ্রেপ্তার জঙ্গিদের জামিনে মুক্তি দেওয়ায় সমাজে এর প্রভাব পড়তে পারে। অপরাধ জগতে জঙ্গিদের অপতৎপরতার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। জঙ্গি দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে সন্দেহভাজনদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তবে আইজিপি বলেছেন, জামিনে থাকা জঙ্গিরা গোয়েন্দা নজরদারিতেই রয়েছেন। তাদের গতিবিধি অনুসরণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। একই সঙ্গে যারা কারাগার থেকে পালিয়ে এখনো আত্মসমর্পণ করেননি বা ফিরে আসেননি, তাদের ধরতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বুধবার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, গুলশানের অভিজাত রেঁস্তোরা হলি আর্টিজানে বোমা হামলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর হুঁশিয়ারির পর জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে সিটিটিসি, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে একের পর এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান ও দুর্ঘর্ষ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। এরপর তাদের বিভিন্ন মামলায় আদালতের নির্দেশে কারাগারে প্রেরণ করে পুলিশ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কোণঠাঁসা হয়ে পড়ে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী। জানা যায়, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে পুলিশের চোখে পিপার স্প্রে মেরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় অপর জঙ্গিরা। ছিনিয়ে নেওয়া ওই দুজন ছিল প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্য মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেল। ওই ঘটনায় ২০ জনকে আসামি করে মামলা করেন পুলিশ পরিদর্শক জুলহাস উদ্দিন আকন্দ। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরেও তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনার ঠিক এক বছরের মাথায় ২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাতেই কোতোয়ালি থানার সাব-ইন্সপেক্টর মুহাম্মদ কামরুল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞানতামাদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। তবে আদালতের সিসিটিভি ফুটেজে আসামিদের শনাক্ত করে একজনকে আটক করা হলেও আরেকজন পলাতক রয়েছে। জঙ্গি ছিনতাইয়ের মামলাটি তদন্ত করছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১১ দফা সময় নিয়েছে তদন্ত সংস্থা। সর্বশেষ গত বছরের ১৪ নভেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে ওই দিন সিটিটিসি প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। এজন্য ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারাহ দিবা ছন্দার আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য গেল বছরের ১৭ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেন।
অপরদিকে আদালতের সামনে বিস্ফোরণের মামলাটি তদন্ত করছেন কোতোয়ালি থানার সাব-ইন্সপেক্টর বিল্লাল হোসেন জনি। সর্বশেষ গত ৫ ডিসেম্বর মামলাটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ধার্য জন্য ছিল। তবে ওই দিন প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। এজন্য ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারাহ দিবা ছন্দার আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি তারিখ ধার্য করেন। আদালতপাড়ায় আসামি ছিনতাই ও বিস্ফোরণের মতো ঘটনাকে ঝুঁকির দৃষ্টিতে দেখছেন বিচারক, বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা।
আইনজীবীরা বলছেন, বিপদে পড়লে আদালতের কাছে আশ্রয় নেন বিচারপ্রার্থীরা। তবে সেই আদালতই এখন বিপদের ঝুঁকিতে রয়েছে। আদালতে যখন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তখন নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কিছুদিন পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আবারও ঢিলেঢালা হয়ে যায়। যার ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে।
আইনজীবীরা জানান, এ পর্যন্ত যেসব জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে মামলার বিচারকার্য ধীরগতিতে চলছে। তবে বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত জঙ্গিদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি জনমনে আরেক আতঙ্কের সৃষ্টি হতে পারে। বাড়তে পারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। যে কোনো বন্দিই আইনি সেবা পাওয়ার অধিকার রাখে। তবে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে আসামিদের জামিন দিলে কোনো প্রশ্ন দেখা দিবে বলে মনে করনেনা আইনজ্ঞরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার ১০ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের আইনজীবী আজাদ রহমান বলেন, আদালত একটি স্পর্শকাতর জায়গা। আদালতের নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই পুলিশ-প্রশাসনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। প্রতিদিন ঢাকার জজ কোর্টে লাখ লাখ মানুষের আনাগোনা থাকে। কে ভালো, কে খারাপ, কার মনের ভেতরে কী আছে, মানুষ দেখে তা বোঝা কঠিন। আসামি ছিনতাই ও বিস্ফোরণের মতো ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই বিষয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের উচিত আরও কঠোর অবস্থানে থাকা।
গত ৫ বছর ধরে ঢাকার জজ কোর্টে নিয়মিত মাদক মামলায় হাজিরা দিতে আসা আওলাদ হোসেন জানান, আগে কোর্টে আসতে খুব একটা ভয় পেতাম না। তবে কয়েক বছর ধরে আদালতপাড়ায় আসতে ভয় কাজ করছে। আদালতের মতো জায়গায় যদি আসামি ছিনতাই, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে নিরাপদ স্থান কোনটি? ককটেল বিস্ফোরণের পর মনে হচ্ছে, আদালতপাড়ায় আসাটাও জীবনের জন্য ঝুঁকির।
ওই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির পুলিশ পরিদর্শক আজিজ আহমেদ জানান, মামলাটির তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। ছিনিয়ে নেওয়া মূল দুই আসামি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবু সিদ্দিক সোহেল ও মইনুল হাসান শামীমকে গ্রেপ্তরে এখনও অভিযান চলছে। তাদের গ্রেপ্তারে এ পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ২০ বার অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ওই দুই মূল আসামি ধরা পড়লেই আদালতে চার্জশিট জমা দেবো। এদিকে আদালত প্রাঙ্গণে ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় গত বছরের ২৬ নভেম্বর হাফসা আক্তার পুতুল নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ২৭ নভেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ৩০ নভেম্বর হাফসা আক্তার পুতুল আদালত প্রাঙ্গণে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। বর্তমানে হাফসা কারাগারে রয়েছেন।
এদিকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত কারা অধিদপ্তরের মিলনায়তনে এক সভায় কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, কোটা সংস্কার ইস্যুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কারাগারে হামলা ও কারাবন্দীদের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের মধ্যে এখনো পলাতক যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আছেন ৯৮ জন। পলাতক বন্দীদের মধ্যে জঙ্গি-সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৭৯ জন আছেন। এর মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি আছেন ৯ জন। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গিও জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। তিনি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ৬২২ মামলায় ১৫ হাজার ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন। তারা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত সরকারের শাসনামলে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার জঙ্গিরা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জামিনে মুক্ত ও কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৭৯ জঙ্গিই এখন বিষফোঁড়া। তারা অবাধবাবে চরাফেরা করে ফের সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। এরপর টার্গেটকৃত ব্যক্তি বা স্থাপনায় হামলাও চালাতে পারে। এটা অবিশ^াসের কিছুই নয়, তবে জঙ্গি দমনে বর্তমান সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে পলাতকদের গ্রেপ্তারে আরও তৎপর হতে হবে। নতুবা জঙ্গিদের উত্থানে পূনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
এদিকে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম জানান, জামিনে থাকা জঙ্গি ও অন্যান্য অপরাধীরা যাতে কোনো ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য তাদের ওপর পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটসমূহ সতর্ক ও কড়া নজরদারী করছে। আইজিপি বলেন, জামিনে মুক্ত থাকা অপরাধীরা যদি তারা অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে তাদেরকে সাথে সাথে গ্রেপ্তারপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করলে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে বাংলাদেশ পুলিশ বদ্ধপরিকর। পলিশ মহাপরিদর্শক আরও বলেন, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত এন্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), এসবি, সিআইডি, র্যাব এবং জেলা পুলিশ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি নিয়মিত মনিটর করছে। দেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ যেন আর মাথা তুলতে না পারে সেজন্য জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে পুলিশ অত্যন্ত কঠোর ও সর্তক অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান আইজিপি।





















