উত্তরের ‘বাতিঘর’ নামে খ্যাত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামেই ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায়ই দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও হয়নি কোনো সমাবর্তন। সাবেক উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ,, ড. হাসিবুর রশীদের প্রশাসন সমাবর্তনের ঘোষণা দিলেও তা হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাবর্তন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেই কোনো উদ্যোগ।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের কাছে একটা তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশেষ দিন। যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্র্যাজুয়েট হিসেবে গাউন পরিহিত ছবি দেন, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিষয়টি কতটা কষ্ট ও আক্ষেপের, তা বলার ভাষা থাকে না।
আসলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর জন্য দিনটি বেশ স্মরণীয়। চার বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত এই ডিগ্রি প্রদানের দিনটি সব শিক্ষার্থীর কাছে বেশ গুরুত্ব বহন করে। প্রত্যেকে চান দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে। তাই তো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে ছবি তুলে রাখেন। এমনকি অনেকে প্রিয় মা–বাবাকে সমাবর্তন উপলক্ষে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন এবং তাঁদেরও গাউন পরিয়ে তাঁদের সঙ্গে ছবি তোলেন। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে সন্তানের শিক্ষা সমাপনী মা-বাবাকে স্মরণ করে রাখার জন্যই হলেও দিনটির বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অনেকে বিভিন্ন রকম মজার ক্যাপশন দিয়ে ছবি দেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ প্রাপ্তির মাধ্যমে শেষ হয় শিক্ষার আনুষ্ঠানিকতা। তারপর সব শিক্ষার্থীই আস্তে আস্তে কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েন। তাই শেষবারের মতো তাঁদের নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই এত আয়োজন। যেহেতু দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় জনগণের উপার্জনের টাকায়, বিশেষ করে কৃষক কিংবা শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের এখানে ভূমিকা রয়েছে। তাই দেশ ও জাতির জনকল্যাণে তাদের এগিয়ে আসা দেশপ্রেম ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। সমাবর্তনের বিশেষ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, নোবেলজয়ী কিংবা বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতিও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে।
কিছু দিন আগের কথা বেরোবির এক শিক্ষার্থী দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পেয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, শুধু মূল সনদজনিত সমস্যায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই শিক্ষার্থীকে কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়নি। এ ছাড়া আবির মাহমুদ নামের আরও এক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আমি ইউরোপ যেতে পারিনি! কারণ, এই বিশ্ববিদ্যালয় দেয় প্রভিশনাল সার্টিফিকেট, যা বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বীকৃত নয়।’ এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে পড়তে হয় নানাবিধ বিড়ম্বনায়।
সর্বোপরি, আমরা আশা করব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ড. শওকত আলী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। সেই সঙ্গে শিগগিরই সমাবর্তনের আয়োজন করবেন। শিক্ষার্থীরা ফিরে পাবে একটি স্মরণীয় বিশেষ দিন ও মুহূর্ত। হোক না একটি সমাবর্তন প্রাণের ৭৫ একরে! আবারও বিশেষ অনুরোধ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের প্রতি। অদম্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাক উত্তরের জনপদের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকত প্রসঙ্গত, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত না হলেও ২০১৭-১৮ ও ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুবার উদ্বোধনী সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়। এ সময় নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেয়া হয়েছিল।

























