০৪:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঢাকা ওয়াসার পুকুরচুরি!

  • সাইফ আশরাফ
  • আপডেট সময় : ০৭:০০:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০২৪
  • 79

◉ সেবা না থাকলেও গ্রাহকের ৩ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন
◉ ঢাকায় পয়োনিষ্কাশন লাইন নেই ৮০ শতাংশ এলাকায়
◉ বাকি ২০ শতাংশও অকার্যকর, পয়োবর্জ্য যাচ্ছে নদীতে
◉ একযুগেও আলোর মুখ দেখেনি পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা

দুই কোটি মানুষের রাজধানীতে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার মতো গুরু দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার কাঁধে। সে লক্ষ্যে ২০১৩ সালে পয়োনিষ্কাশনের জন্য মহাপরিকল্পনা নেয় ওয়াসা। তবে সেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেমে আছে কাগজ-কলম আর টেবিলেই। রাজধানীর ৮০ শতাংশ এলাকাতেই নেই পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনে নালা। বাকি ২০ শতাংশ এলাকায় নালা থাকলেও সংস্কারের অভাবে তা অকার্যকর। অথচ ২০০৯ সাল থেকে পয়োনিষ্কাশন সেবা দিতে রাজধানীবাসীর থেকে ৩০০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় রাজধানীর পয়োবর্জ্য যাচ্ছে নদী ও খালে। যা ব্যপক স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০১৩ সালে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীতে পয়োনিষ্কাশনের জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি করে। এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী বা কীভাবে পুরো ঢাকা শহরে পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। মহাপরিকল্পনায় বলা হয়, পয়োবর্জ্য পরিবহনের প্রধান পাইপলাইন ‘ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ’ নামে পরিচিত। ঢাকা ওয়াসার তিনটি ‘ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ’ আছে। এই লাইনগুলোর বেশিরভাগ এখন আর কার্যকর নেই।

ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার ১০টি অঞ্চল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি অঞ্চলে স্যুয়ারেজ লাইন আছে। আর চারটি অঞ্চলে আংশিক স্যুয়ারেজ লাইন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব স্যুয়ারেজ লাইনে উন্নয়ন কাজ না হওয়ায় অনেকটা বিকলের পথে। মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে হাজারীবাগ, নীলক্ষেত, সেগুনবাগিচা, পুরোনো পল্টন ও মতিঝিল হয়ে আরেকটি ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ নারিন্দা পৌঁছেছে। মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এ লাইন অকার্যকর থাকায় এর আওতাধীন এলাকার পয়োবর্জ্যগুলো পানিনিষ্কাশনের নালার মাধ্যমে কাছের নিম্নাঞ্চলে ফেলা হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নবাবগঞ্জ থেকে লালবাগ, জেলখানা গেট, আবুল হাসনাত রোড, নবাবপুর রোড ও টিপু সুলতান রোড হয়ে নারিন্দায় আরেকটি ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ। ওয়াসার বিদ্যমান পাইপলাইনগুলোর ভঙ্গুর দশা এবং অধিকাংশের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে বলে মহাপরিকল্পনাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগরী এলাকায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি পানি সরবরাহ লাইন রয়েছে। পয়োনিষ্কাশনের লাইন রয়েছে মাত্র ৯৩০ কিলোমিটার এলাকায়। অথচ পুরো ঢাকা শহরের যেখানেই পানির লাইনের ব্যাপ্তি রয়েছে সেখান থেকেই পয়োবিল নেওয়া হয়। এমনকি পানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্যুয়ারেজ বিলও বছর বছর বাড়িয়েছে সংস্থাটি। ঢাকা ওয়াসার ২০১৬-২০২১ সালের আয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি পয়োনিষ্কাশন বাবদ আয় করেছে ঢাকা ওয়াসা। এর মধ্যে ২০২১ সালেই ৩৯১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আয় করে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়াও ২০২০ সালে যথাক্রমে ৩৪১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০১৯ সালে ৩৩৩ কোটি ৩৫ লাখ, ২০১৮ সালে ১১৮ কোটি ৭২ লাখ, ২০১৭ সালে ২৭৬ কোটি ৭৯ লাখ এবং ২০১৬ সালে ২৩৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় করে ওয়াসা।

ঢাকা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায় বলেন, রাজধানীর সব জায়গায় পয়োবর্জ্যরে লাইন নেই। আমাদের কয়েকটি অঞ্চলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পয়োবর্জ্যরে লাইন আছে, সে অনুযায়ী বিল আদায় করা হচ্ছে। সব এলাকায় ঠিকঠাক করে পয়োবর্জ্যরে লাইন বসানোর জন্য আমাদের অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিছু কাজ এখন বন্ধ আছে। আশা করছি কাজগুলো শেষ হলে এই সমস্যার সমাধান হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পাইপলাইন থাকা মানেই সব না, তা কার্যকর তো থাকতে হবে। পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক অকার্যকর, তারপরও গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

নগর পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, গত ৫০ বছরেও ঢাকায় কোনো কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে রাজধানীর বাসিন্দাদের ক্রমেই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নগর আধুনিকায়ন করার আগে পয়োনিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা অত্যন্ত জরুরি। পয়োনিষ্কাশন নিয়ে ঢাকা ওয়াসার যে মহাপরিকল্পনা তা শিগগিরই বাস্তবায়ন করতে হবে। শিগগিরই পরিকল্পনা মাফিক এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে কিছু বছর পর রাজধানী নোংরা নগরীতে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে আশপাশের দেশগুলো কীভাবে পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছে সেটি বিবেচনা করা উচিত। এই পয়োবর্জ্য কিন্তু কম্পোজ করে বা বায়োগ্যাস প্লান্ট করে বিভিন্ন ধরনের কাজ করা যায়। সেক্ষেত্রে এত বড় শহরের পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন এবং এটি সঠিকভাবে যদি কাজে লাগানো যায় তবে পরিবেশ, মানুষের স্বাস্থ্যসহ সব কিছুর জন্য সুবিধা হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাহমুদউল্লাহর ঝড়ো ক্যামিওতে রংপুরের দারুণ জয়

ঢাকা ওয়াসার পুকুরচুরি!

আপডেট সময় : ০৭:০০:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০২৪

◉ সেবা না থাকলেও গ্রাহকের ৩ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন
◉ ঢাকায় পয়োনিষ্কাশন লাইন নেই ৮০ শতাংশ এলাকায়
◉ বাকি ২০ শতাংশও অকার্যকর, পয়োবর্জ্য যাচ্ছে নদীতে
◉ একযুগেও আলোর মুখ দেখেনি পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা

দুই কোটি মানুষের রাজধানীতে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার মতো গুরু দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার কাঁধে। সে লক্ষ্যে ২০১৩ সালে পয়োনিষ্কাশনের জন্য মহাপরিকল্পনা নেয় ওয়াসা। তবে সেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেমে আছে কাগজ-কলম আর টেবিলেই। রাজধানীর ৮০ শতাংশ এলাকাতেই নেই পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনে নালা। বাকি ২০ শতাংশ এলাকায় নালা থাকলেও সংস্কারের অভাবে তা অকার্যকর। অথচ ২০০৯ সাল থেকে পয়োনিষ্কাশন সেবা দিতে রাজধানীবাসীর থেকে ৩০০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় রাজধানীর পয়োবর্জ্য যাচ্ছে নদী ও খালে। যা ব্যপক স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০১৩ সালে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীতে পয়োনিষ্কাশনের জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি করে। এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী বা কীভাবে পুরো ঢাকা শহরে পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। মহাপরিকল্পনায় বলা হয়, পয়োবর্জ্য পরিবহনের প্রধান পাইপলাইন ‘ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ’ নামে পরিচিত। ঢাকা ওয়াসার তিনটি ‘ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ’ আছে। এই লাইনগুলোর বেশিরভাগ এখন আর কার্যকর নেই।

ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার ১০টি অঞ্চল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি অঞ্চলে স্যুয়ারেজ লাইন আছে। আর চারটি অঞ্চলে আংশিক স্যুয়ারেজ লাইন রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব স্যুয়ারেজ লাইনে উন্নয়ন কাজ না হওয়ায় অনেকটা বিকলের পথে। মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে হাজারীবাগ, নীলক্ষেত, সেগুনবাগিচা, পুরোনো পল্টন ও মতিঝিল হয়ে আরেকটি ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ নারিন্দা পৌঁছেছে। মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এ লাইন অকার্যকর থাকায় এর আওতাধীন এলাকার পয়োবর্জ্যগুলো পানিনিষ্কাশনের নালার মাধ্যমে কাছের নিম্নাঞ্চলে ফেলা হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নবাবগঞ্জ থেকে লালবাগ, জেলখানা গেট, আবুল হাসনাত রোড, নবাবপুর রোড ও টিপু সুলতান রোড হয়ে নারিন্দায় আরেকটি ট্যাঙ্ক স্যুয়ারেজ। ওয়াসার বিদ্যমান পাইপলাইনগুলোর ভঙ্গুর দশা এবং অধিকাংশের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে বলে মহাপরিকল্পনাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগরী এলাকায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি পানি সরবরাহ লাইন রয়েছে। পয়োনিষ্কাশনের লাইন রয়েছে মাত্র ৯৩০ কিলোমিটার এলাকায়। অথচ পুরো ঢাকা শহরের যেখানেই পানির লাইনের ব্যাপ্তি রয়েছে সেখান থেকেই পয়োবিল নেওয়া হয়। এমনকি পানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্যুয়ারেজ বিলও বছর বছর বাড়িয়েছে সংস্থাটি। ঢাকা ওয়াসার ২০১৬-২০২১ সালের আয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি পয়োনিষ্কাশন বাবদ আয় করেছে ঢাকা ওয়াসা। এর মধ্যে ২০২১ সালেই ৩৯১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আয় করে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়াও ২০২০ সালে যথাক্রমে ৩৪১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০১৯ সালে ৩৩৩ কোটি ৩৫ লাখ, ২০১৮ সালে ১১৮ কোটি ৭২ লাখ, ২০১৭ সালে ২৭৬ কোটি ৭৯ লাখ এবং ২০১৬ সালে ২৩৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় করে ওয়াসা।

ঢাকা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায় বলেন, রাজধানীর সব জায়গায় পয়োবর্জ্যরে লাইন নেই। আমাদের কয়েকটি অঞ্চলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পয়োবর্জ্যরে লাইন আছে, সে অনুযায়ী বিল আদায় করা হচ্ছে। সব এলাকায় ঠিকঠাক করে পয়োবর্জ্যরে লাইন বসানোর জন্য আমাদের অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিছু কাজ এখন বন্ধ আছে। আশা করছি কাজগুলো শেষ হলে এই সমস্যার সমাধান হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পাইপলাইন থাকা মানেই সব না, তা কার্যকর তো থাকতে হবে। পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক অকার্যকর, তারপরও গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

নগর পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, গত ৫০ বছরেও ঢাকায় কোনো কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে রাজধানীর বাসিন্দাদের ক্রমেই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নগর আধুনিকায়ন করার আগে পয়োনিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা অত্যন্ত জরুরি। পয়োনিষ্কাশন নিয়ে ঢাকা ওয়াসার যে মহাপরিকল্পনা তা শিগগিরই বাস্তবায়ন করতে হবে। শিগগিরই পরিকল্পনা মাফিক এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে কিছু বছর পর রাজধানী নোংরা নগরীতে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে আশপাশের দেশগুলো কীভাবে পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছে সেটি বিবেচনা করা উচিত। এই পয়োবর্জ্য কিন্তু কম্পোজ করে বা বায়োগ্যাস প্লান্ট করে বিভিন্ন ধরনের কাজ করা যায়। সেক্ষেত্রে এত বড় শহরের পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন এবং এটি সঠিকভাবে যদি কাজে লাগানো যায় তবে পরিবেশ, মানুষের স্বাস্থ্যসহ সব কিছুর জন্য সুবিধা হবে।