ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ ও জটিল : আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া বেশ কয়েকজন যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং সেটি ত্যাগের প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে ও প্রবাসে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকে নিজ নিজ আইনজীবীর প্যাডে ‘নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন প্রক্রিয়াধীন’ বলে চিঠি দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণি পার হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। যদিও নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগের দাপ্তরিক প্রমাণপত্র থাকা আবশ্যক।
বিএনপির ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামান, ড. মনিরুজ্জামান, এম এ মালিক, কয়ছর এম আহমদ, ফয়সল চৌধুরী, মো. শওকতুল ইসলাম এবং জামায়াতের ব্যারিস্টার নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রবাসী প্রার্থী এরই মধ্যে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। তবে তাদের মধ্যে কয়ছর এম আহমদ ব্যতীত বাকিদের নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে শুরু হয়েছে বিচার-বিশ্লেষণ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২(গ) দফা অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল আবেদনের রিসিভ কপি নয়, বরং বিদেশি সরকারের ইস্যুকৃত চূড়ান্ত ‘ত্যাগপত্র’ বা সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা না হলে এই সাংবিধানিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিএনপি নেতা কয়ছর এম আহমদের। অন্যদিকে সিলেট-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী এম এ মালিকের মনোনয়নপত্র স্থগিতের পর তিনি বারবার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। তার আসনে কোনো বিকল্প প্রার্থীও দেয়নি দলটি।
যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় কুড়িগ্রাম-৩ আসনে (উলিপুর) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলমের (সালেহী) মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। একই কারণে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
জানা গেছে, ডা. ফজলুল হক হলফনামায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা উল্লেখ করলেও এর পক্ষে কোনো কাগজপত্র জমা দেননি। তিনি হলফনামায় দাবি করেন, গত ২৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। বাছাইয়ের সময় তিনি জানান, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে শুনানি হবে। তবে বর্তমানে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। অবশ্য তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
এদিকে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের প্রার্থী মো. শওকতুল ইসলাম হলফনামায় দাবি করেছেন যে তিনি গত ২৪ ডিসেম্বর তার দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন; তবে এই দাবির সমর্থনে তিনি কোনো দাপ্তরিক কাগজপত্র জমা দেননি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীরা জেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন করলেও জেলা প্রশাসক বিষয়টি এড়িয়ে যান।
ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের আইনি প্রক্রিয়া : ব্রিটিশ ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট ১৯৮১-এর ১২ ধারা অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ ও জটিল। লন্ডনের আইন বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, একজন নাগরিককে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ‘ডিক্লারেশন অব রেনানসিয়েশন’ (ফর্ম আরএন) প্রদান করতে হয়। এর জন্য ৪৮২ পাউন্ড ফি জমা দিতে হয়। স্বরাষ্ট্র সচিবের দফতরে এই ঘোষণা নিবন্ধিত হওয়ার পরই কেবল নাগরিকত্ব কার্যকরভাবে সমাপ্ত হয়।
যুক্তরাজ্যের আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার ইকবাল হোসেন জানান, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করলেই হবে না, বরং স্বাক্ষরিত ও সিলমোহরযুক্ত ‘ডিক্লারেশন অব রেনানসিয়েশন’ হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ওই ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই গণ্য হন। এমনকি আবেদন সফল হওয়ার পর পূর্বের ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ (আইএলআর) মর্যাদাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসে না।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন পাসপোর্ট ত্যাগের শর্তাবলিতেও একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (সেকশন ৩৪৯(এ)) অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থিত কোনো দূতাবাস বা কনস্যুলেটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কনস্যুলার অফিসারের সামনে শপথ নিতে হয়। এর জন্য প্রায় ২,৩৫০ ডলার ফি দিতে হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ‘সার্টিফিকেট অব লস অব ন্যাশনালিটি’ (সিএলএন) প্রদান করা হলে তবেই তিনি নাগরিকত্ব হারান।
মনোনয়নে শুভঙ্করের ফাঁকি : বাংলাদেশে এমপি প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব নেই-এটি প্রমাণের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের শিথিলতা নিয়ে কথা বলছেন লন্ডনের কিংডম সলিসিটরসের কর্ণধার ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী। তিনি বলেন, বাস্তবে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত প্রমাণ জমা দেওয়ার পরিবর্তে অনেকে শুধু আবেদনের একটি প্রাপ্তিস্বীকারপত্র জমা দিচ্ছেন। স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তা বা ডিসি অফিস তা গ্রহণও করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এটি একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি। নমিনেশন বৈধ হওয়ার পর কেউ যদি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন, তবে তিনি কার্যত বিদেশি নাগরিক হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন। অথচ এই প্রাপ্তিস্বীকারপত্রের সুযোগ নিয়ে তিনি নির্বাচন করছেন, যা বাংলাদেশের সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। যদি কেউ এই বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন, তবে অনেক প্রার্থীরই প্রার্থিতা বাতিলের মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
লেখক : লন্ডনবাসী

























