5:37 pm, Monday, 25 May 2026

দেনমোহর (মাহর) : ইসলামী বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার

 

দেনমোহর বা মাহর হলো ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে প্রদানকৃত বাধ্যতামূলক উপহার বা সম্পত্তি। এটি বিবাহের একটি অপরিহার্য শর্ত এবং স্ত্রীর একান্ত নিজস্ব অধিকার। কোনো বিবাহে দেনমোহর নির্ধারণ না করলে তা অসম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ইসলামী ভিত্তি

কুরআন মজীদে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন:
“আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মাহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিয়ে দাও।” (সূরা আন-নিসা: ৪)
এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে মাহরের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। একটি বিখ্যাত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, “সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ হলো যেটিতে খরচ কম হয়।”

দেনমোহরের প্রকারভেদ

১. মু‘আজ্জাল (অবিলম্বে প্রদেয়): বিবাহের সময় বা তার কাছাকাছি সময়ে পরিশোধ করতে হয়।
২. মু‘আজ্জাল (বিলম্বিত): নির্দিষ্ট সময় পরে বা স্বামীর মৃত্যু/তালাকের ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য। বাংলাদেশে সাধারণত এই ধরনের দেনমোহরই নির্ধারণ করা হয়।

দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় উভয় পক্ষের সম্মতিতে। ইসলামে এর কোনো নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ সীমা নেই। তবে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে যথাসম্ভব সহজ ও সাধ্যের মধ্যে রাখা উচিত।

দেনমোহরের আইনি অবস্থান (বাংলাদেশ প্রেক্ষিত)

বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ অনুসারে কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। এটি স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি।

* স্বামী মারা গেলে দেনমোহর প্রথমে পরিশোধ করতে হয় (অন্যান্য ঋণের আগে)।
* তালাকের ক্ষেত্রে দেনমোহর অবশ্যই পরিশোধ করতে হয় যদি তা পূর্বে পরিশোধ না হয়ে থাকে।

দেনমোহরের গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য

* স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা: এটি স্ত্রীর জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
* বিবাহকে সম্মানজনক করা: দেনমোহর দিয়ে স্বামী প্রমাণ করে যে তিনি স্ত্রীকে গুরুত্ব দেন এবং দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
* অতিরিক্ত চাহিদা রোধ: অত্যধিক দেনমোহর নির্ধারণকে ইসলাম উৎসাহিত করে না, কারণ এটি বিবাহকে কঠিন করে দেয়।

বর্তমান সমাজে প্রাসঙ্গিকতা

আজকের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহরকে শুধুমাত্র কাগজে-কলমে রেখে দেওয়া হয়। এটি একটি দুঃখজনক প্রবণতা। ইসলামী শিক্ষা অনুসারে দেনমোহরকে গুরুত্ব সহকারে নির্ধারণ করা উচিত এবং সময়মতো পরিশোধ করা উচিত। অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মনে করেন, বর্তমানে সোনা বা টাকার পরিমাণ নির্ধারণের পাশাপাশি কিছু অংশ বিবাহের শুরুতেই প্রদান করা উচিত।

উপসংহার

দেনমোহর কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক। ইসলাম নারীর অধিকার রক্ষায় এই বিধান দিয়েছে যাতে বিবাহ সুন্দর, ন্যায়সঙ্গত ও বরকতময় হয়।

প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের উচিত এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা এবং কাবিননামা তৈরির সময় সচেতনভাবে দেনমোহর নির্ধারণ করা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

2 × one =

About Author Information

Tipu Sultan

Popular Post

দেনমোহর (মাহর) : ইসলামী বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার

দেনমোহর (মাহর) : ইসলামী বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার

Update Time : ০৫:৩৭:০২ pm, Monday, ২৫ মে ২০২৬

 

দেনমোহর বা মাহর হলো ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে প্রদানকৃত বাধ্যতামূলক উপহার বা সম্পত্তি। এটি বিবাহের একটি অপরিহার্য শর্ত এবং স্ত্রীর একান্ত নিজস্ব অধিকার। কোনো বিবাহে দেনমোহর নির্ধারণ না করলে তা অসম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

ইসলামী ভিত্তি

কুরআন মজীদে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন:
“আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মাহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিয়ে দাও।” (সূরা আন-নিসা: ৪)
এছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে মাহরের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। একটি বিখ্যাত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, “সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ হলো যেটিতে খরচ কম হয়।”

দেনমোহরের প্রকারভেদ

১. মু‘আজ্জাল (অবিলম্বে প্রদেয়): বিবাহের সময় বা তার কাছাকাছি সময়ে পরিশোধ করতে হয়।
২. মু‘আজ্জাল (বিলম্বিত): নির্দিষ্ট সময় পরে বা স্বামীর মৃত্যু/তালাকের ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য। বাংলাদেশে সাধারণত এই ধরনের দেনমোহরই নির্ধারণ করা হয়।

দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় উভয় পক্ষের সম্মতিতে। ইসলামে এর কোনো নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ সীমা নেই। তবে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে যথাসম্ভব সহজ ও সাধ্যের মধ্যে রাখা উচিত।

দেনমোহরের আইনি অবস্থান (বাংলাদেশ প্রেক্ষিত)

বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ অনুসারে কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। এটি স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি।

* স্বামী মারা গেলে দেনমোহর প্রথমে পরিশোধ করতে হয় (অন্যান্য ঋণের আগে)।
* তালাকের ক্ষেত্রে দেনমোহর অবশ্যই পরিশোধ করতে হয় যদি তা পূর্বে পরিশোধ না হয়ে থাকে।

দেনমোহরের গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য

* স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা: এটি স্ত্রীর জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
* বিবাহকে সম্মানজনক করা: দেনমোহর দিয়ে স্বামী প্রমাণ করে যে তিনি স্ত্রীকে গুরুত্ব দেন এবং দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
* অতিরিক্ত চাহিদা রোধ: অত্যধিক দেনমোহর নির্ধারণকে ইসলাম উৎসাহিত করে না, কারণ এটি বিবাহকে কঠিন করে দেয়।

বর্তমান সমাজে প্রাসঙ্গিকতা

আজকের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহরকে শুধুমাত্র কাগজে-কলমে রেখে দেওয়া হয়। এটি একটি দুঃখজনক প্রবণতা। ইসলামী শিক্ষা অনুসারে দেনমোহরকে গুরুত্ব সহকারে নির্ধারণ করা উচিত এবং সময়মতো পরিশোধ করা উচিত। অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মনে করেন, বর্তমানে সোনা বা টাকার পরিমাণ নির্ধারণের পাশাপাশি কিছু অংশ বিবাহের শুরুতেই প্রদান করা উচিত।

উপসংহার

দেনমোহর কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক। ইসলাম নারীর অধিকার রক্ষায় এই বিধান দিয়েছে যাতে বিবাহ সুন্দর, ন্যায়সঙ্গত ও বরকতময় হয়।

প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের উচিত এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা এবং কাবিননামা তৈরির সময় সচেতনভাবে দেনমোহর নির্ধারণ করা