১১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্বল্প আয়ের মানুষ জীবিকার উৎস হলেও ইজিবাইকের জন্যই যানজট

কয়েক বছর আগেও যানজট-কোলাহলমুক্ত নিরাপদ ছিল রংপুর বিভাগের শহরগুলো।
আধুনিকতার ছোয়া ও সময়ের সঙ্গে যান্ত্রিক প্রযুক্তি সংযোজিত দ্রুতগতির তিন চাকার
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক যেন কেড়ে নিয়েছে সেই সুনাম। শুধু বিভাগীয় নগরী রংপুরই নয় বরং
গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম,পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলা শহরের
চিত্রটাও বদলে গেছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকের দাপটে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক
থেকে শুরু করে অলিগলি, এমনকি মহাসড়কেও রয়েছে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকের দৌরাত্ম্য।
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার কারণে সড়কে বেড়েছে দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে
বেড়েছে মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব। গত কয়েক বছরে রংপুরের আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে ব্যাটারি
চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার ব্যাপক হারে বেড়েছে দাপট। পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা শহরে
অদক্ষ চালকের কারণে যত্রতত্র বেড়েছে ব্যাপক যানজট। যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ।
বেড়েছে বিদ্যুতের ওপর চাপ। এসব যানবাহন কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাই, খুনসহ সংঘটিত হচ্ছে
নানা অপরাধ। শান্তির শহরগুলোতে এখন যেন অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব যানবাহন। ঢাকা
থেকে সড়ক পথে রংপুর বিভাগের প্রবেশদ্বার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা। এক সময়ে
যানজটের সাথে পরিচিত না থাকা সেই গাইবান্ধা জেলা শহরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে
অন্তত ৩০ হাজার ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক চলাচল করছে। এর মধ্যে অনিবন্ধিত অর্ধেকেরও বেশি।
আর চার্জার রিকশার সংখ্যা যেন হিসাব ছাড়া। এমনটাই জানিয়েছে গাইবান্ধা পৌরসভার
লাইসেন্স শাখাসহ বিভিন্ন উপজেলাগুলোতেও সহজলভ্য বাহন হিসেবে পরিচিত দ্রুতগতির ব্যাটারি
চালিত ইজিবাইক, ভ্যান ও চার্জাররিকশা। ব্রহ্মপুত্র নদের উপনদী ধরলা তীরে অবস্থিত কুড়িগ্রাম
জেলায় ৪০ হাজারের বেশি ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক, ভ্যান, মিশুক ও চার্জাররিকশা রয়েছে। এর
মধ্যে বেশির ভাগই রেজিস্ট্রেশনবিহীন। চালকেরও নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। তারপরও বেপরোয়া
দ্রুতগতিতে চলছে অলিগলি থেকে সড়ক-মহাসড়কে। এসব যানবাহনের লাগাম টানতে নেই
আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এ কারণে সড়কে নেই শৃঙ্খলা। যত্রতত্র পার্কিং আর যানজট নিত্যদিন
বাড়াচ্ছে ভোগান্তি। প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনাও। জেলায় ব্যাটারি চালিত এসব
বাহনের সংখ্যা ৪০ হাজার ৫০০টি। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় প্রায় ৯ হাজার, নাগেশ্বরীতে ৭
হাজার, কুড়িগ্রাম সদরে ৮ হাজার, উলিপুরে ৮ হাজার, রাজারহাটে ৪ হাজার, চিলমারীতে ২ হাজার,
রৌমারীতে ২ হাজার ও রাজিবপুর উপজেলায় প্রায় ৫০০টি ব্যাটারি চালিত বাহন রয়েছে।
কুড়িগ্রামে ১৩টি শো-রুমে প্রতিদিন গড়ে অন্তত অর্ধশত ব্যাটারি চালিত বাহন বিক্রি
হচ্ছে। এছাড়া জেলার বাইরের শো-রুম থেকেও ক্রয় করে আনা হচ্ছে নিত্যনতুন অটোরিকশা।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়েও লাগাম ছাড়া বেড়েছে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও
চার্জাররিকশা। পঞ্চগড় পৌরসভার তথ্যমতে, পৌর এলাকায় বর্তমানে নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা
প্রায় দেড় হাজার। তবে প্রতিদিন শহরের বাইরে থেকে আরও দুই হাজার ব্যাটারি চালিত থ্রি-হুইলার
প্রবেশ করে ২০ টাকা ফি দিয়ে। এছাড়াও জেলার অনিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা ৫ হাজারের
অধিক। এসব যানবাহনের কারণে প্রতিদিন শহরে তীব্র যানজট দেখা দিচ্ছে। এদিকে ঠাকুরগাঁও
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন শহরে প্রায় ১০ হাজার ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও
চার্জাররিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে পৌরসভা থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মতো
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে সড়কে চলাচল করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর বাহিরে ৭
হাজার অটোরিকশা অবৈধভাবে চলাচল করে শহর এলাকায় যানজট সৃষ্টি করছে।
হতাহতের চিত্র
গত এক বছরে গাইবান্ধায় ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার কারণে ছোট-বড়
মিলিয়ে শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
আর পঙ্গুত্ববরণ করেছেন প্রায় ২০ জন। এছাড়াও এক বছরে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক
ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৩০টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন চালক।
কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছেন, কুড়িগ্রামে গত বছরের জুলাই থেকে
চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে ৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব
দুর্ঘটনার বেশির ভাগ ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার কারণে সংঘটিত হয়েছে।
পঞ্চগড় বিআরটিএ এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ২৭টি
সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন, আহত হয়েছে অন্তত ২৫ জন। স্থানীয়দের
অভিযোগ, এ দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে ব ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশর
কারণে। বিভাগের অন্যান্য জেলার মতো ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে
ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা কারণে কি পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটেছে, কতজন এর শিকার তার
কোনো সঠিক তথ্য জানা নেই পৌরসভা ও পুলিশের কাছে।
যা বলছেন চালক ও যাত্রীরা
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে
জনজীবন। এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল ও সড়কে যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে

যানজট। ট্রাফিক আইন অমান্য করে যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই
নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে প্রায় ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। আর এসব
দুর্ঘটনায় কখনো প্রাণহানিসহ শারীরিক ক্ষতির হচ্ছে যাত্রীসহ সাধারণ পথচারীদের। ব্যাটারি
চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার লাগাম টানতে ট্রাফিক পুলিশ ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টরা
ব্যর্থ। মানুষ চায় নিরাপদ সড়ক, যান চলাচলে সচেতনতা ও সড়কে শৃঙ্খলা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এখন
সচেতনতার অভাবে সাথে ঘন ঘন দুর্ঘটনার কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে সড়কগুলো। গাইবান্ধার
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মনোয়ার হোসেন বলেন, গত মে মাসে গাইবান্ধা-নাকাইহাট সড়কের
হাওয়া দিঘির মোড় এলাকায় দ্রুতগতির ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ধাক্কায় কাসেম মিয়া নামে
এক পথচারী গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার
অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
তিনি মারা যান। নিহত পথচারীর বড় ছেলে শাহজামাল মিয়া বলেন, বাবা ছিলেন আমাদের পরিবারের
একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সেদিন তিনি বাজার করে ইজিবাইক থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে
ছিলেন। হঠাৎ দ্রুত গতিতে ছুটে আসা আরেকটি ইজিবাইক বাবাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। পরে
রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ইজিবাইক আমাদের জীবনটা শেষ করে
দিয়েছে। সরকারের উচিত বেপরোয়া গতির ঝুঁকিপূর্ণ এসব ইজিবাইক বন্ধ করে দেওয়া।
ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নুরুল ইসলাম বলেন, অদক্ষ চালকরা শহরজুড়ে অবৈধ ইজিবাইক নিয়ে দাপিয়ে
বেড়াচ্ছে। শহরে যে পরিমাণ অটো ও চার্জাররিকশা বেড়েছে তা হিসাব ছাড়া এদের মধ্যে
অধিকাংশ চালকের বয়স কম, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি বেশির ভাগ চালকেরও ড্রাইভিং
লাইসেন্স নেই। তারা আইন-কানুন মানেন না। যাত্রী হাত তুললেই যেখানে-সেখানে ব্রেক দিচ্ছে,
যাত্রী ওঠানামা করছে। এসব তো পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কিন্তু প্রশাসন এসব দেখেও না
দেখার ভান করে। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, যানজট নিরসনের জন্য
আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সেই সাথে অনুমোদন দেওয়া অটোরিকশার জন্য
স্ট্যান্ড করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আর যেসব অটোরিকশার অনুমোদন নেই সেগুলোর বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পঞ্চগড়ের আব্দুর রহিম বলেন, আগে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল।
এখন ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক চালিয়ে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করা যায়। তবে
দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় থাকে। যাত্রী মাহমুদা বেগম বলেন, ভাড়া কম বলে অটোতে যাতায়াত
সহজ। কিন্তু চালকদের বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণে সবসময় দুর্ঘটনার ভয় থাকে।
অটোরিকশার লাগাম টানতে ব্যর্থ প্রশাসন
আবুল কাশেম নামে এক বেসরকারি চাকুরিজীবি বলেন, রংপুর বিভাগের জেলা ও উপজেলা শহর
যানজট মুক্ত করতে হলে অবশ্যই ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার নিয়ন্ত্রণে আনতে
হবে। নিবন্ধনহীন যানবাহন বন্ধ না করলে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে। কিন্তু অটোরিকশার
লাগাম টানতে ট্রাফিক পুলিশ ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ। আমরা চাই নিরাপদ সড়ক, যান
চলাচলে সচেতনতা ও সড়কে শৃঙ্খলা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এখন সচেতনতার অভাবে সাথে ঘন ঘন
দুর্ঘটনার কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে সড়কগুলো। গাইবান্ধা ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ
আলতাফ হোসেন বলেন, শহরে যানজট সৃষ্টির জন্য বেশিরভাগ দায়ী ইজিবাইক। একদিকে যানজট
সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে ছোটখাটো দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইজিবাইকের কারণে
যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, যে সড়কে ধারণক্ষমতা ৩ হাজার, সেখানে
যদি ৫ হাজার যানবাহন চলে, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই যানজট লেগে থাকবে। লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ
চালক, ইজিবাইকের সহজলভ্যতা এবং কোনো নির্ধারিত দপ্তরের কার্যকর তদারকি না থাকায় এর
সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ঠাকুরগাঁও শহরে অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণে পৌরসভাকে কার্যকর উদ্যোগ
নেওয়া উচিত বলে মনে করছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। শহরে যাত্রী ছাউনি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড
তৈরি করা গেলে যানজট সহনীয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও ট্রাফিক
পুলিশের শহর ও যানবাহন বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক হাসান আসকরী। তিনি বলেন, সবসময় চেষ্টা
করা হয় শহরকে যানজটমুক্ত রাখতে। পৌরসভা সড়কে চলাচল করার জন্য অটোরিকশার ট্রেড লাইসেন্স
দিয়েছে। তারপর অসংখ্য অবৈধ অটোরিকশা চলাচল করছে। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এসব অটোরিকশার
জন্য যাত্রী ছাউনি ও স্ট্যান্ড করে দিলে যানজটমুক্ত করা সম্ভব।
ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে বিদ্যুতের ওপর ব্যাপক চাপ
সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হয়, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল
করে তুলেছে। গাইবান্ধা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (নেসকো-২) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ
আসিফ বলেন, প্রতিটি ইজিবাইক একবার পূর্ণ চার্জ দিতে ১০ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ
হয়। ব্যাটারি ভেদে এটি কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। একটি জেলায় যদি ৩০ হাজার ইজিবাইক
থাকে, সেই হিসেবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়। যদিও ইজিবাইকের জন্য সরকার
ইউনিট প্রতি ৭ টাকা ট্যারিফ নির্ধারণ করে দিয়েছে, তবুও বিদ্যুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে
ইজিবাইক। কুড়িগ্রামে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে
অটোরিকশার চার্জে ব্যবহৃত বিদ্যুৎকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। নেসকো সূত্রে জানা যায়,

কুড়িগ্রাম পৌর শহরে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট। অথচ সরবরাহ
আছে ১০ থেকে ১১ মেগাওয়াট। শহরে বিভিন্ন গ্যারেজ ও বাড়িতে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার
ব্যবস্থা রয়েছে। জেলার চিলমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ি, ভূরুঙ্গামারী, রাজারহাট ও
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ১০৮ মেগাওয়াট, এখন সরবরাহ ৮০ থেকে ৮৫
মেগাওয়াট। ঘাটতি ও চাহিদার সমন্বয়ে কখনো কখনো হচ্ছে লম্বা লোডশেডিং। ঠাকুরগাঁও
পৌর এলাকার অটোরিকশার গ্যারেজ মালিকরা বলেন, রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে তারা ৮০ টাকা
থেকে ১০০ টাকা গ্রহণ করেন। এছাড়াও ব্যাটারি চালিত রিকশার চালককে দৈনিক ৩০০ টাকা দিতে
হয় মালিককে। ঠাকুরগাঁও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই (নেসকো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের ওপর অনেকটা
প্রভাব পড়েছে। দিন-রাতের চাহিদা অনুযারী বিদ্যুৎ সাপ্লাই দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন
চারপাশে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার গ্যারেজ দেখা যায়। একটা অটোরিকশা প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টা
চার্জ দিতে হয়। আবার সময় মতো বিদ্যুৎ বিল পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ বিল না পেয়ে আমাদের
লাইনম্যানরা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে ঝামেলার সৃষ্টি হয়।
দায়সারা আশ্বাস দিয়ে নীরব কর্তৃপক্ষ
ব্যাটারি চালিত এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও তেমন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করায়
কমেনি জনভোগান্তি। বরং যত দিন যাচ্ছে ততই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়সারা আশ্বাসে সচেতন
মহলসহ যাত্রী সাধারণের মনে বাড়ছে বিরক্তি ও ক্ষোভ। যদিও নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা আদায়সহ
নানা রকম সচেতনতামূলক কার্যক্রম করার কথা বলছে ট্রাফিক বিভাগ। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার
প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, যানজট নিরসনের জন্য আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ
করেছি। সেই সাথে অনুমোদন দেওয়া অটোরিকশার জন্য স্ট্যান্ড করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। যেসব
অটোরিকশার অনুমোদন নেই সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পঞ্চগড় পৌরসভার নির্বাহী
কর্মকর্তা রাশেদুর রহমান বলেন, নিবন্ধিত অটোর বাইরের যানগুলোই মূল সমস্যা সৃষ্টি করছে।
এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করা হচ্ছে। গাইবান্ধা পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক আবদুল আহাদ
মিয়া বলেন, গাইবান্ধা পৌরসভা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার বিষয়টি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।
অটোরিকশাগুলো একদিকে যেমন স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকার উৎস, তেমনি শহরের জন্য এক বড়
সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিবন্ধিত গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। চালকদের সচেতন করার
চেষ্টা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট রুটে চলাচলের জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু জনবল ও আইনের
সীমাবদ্ধতার কারণে সফল হতে পারছি না। এ সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। আমাদের একটি
সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ ও পৌরসভাসহ সকলে একসঙ্গে
কাজ করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডাকাতি মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

স্বল্প আয়ের মানুষ জীবিকার উৎস হলেও ইজিবাইকের জন্যই যানজট

আপডেট সময় : ০৩:৪৩:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

কয়েক বছর আগেও যানজট-কোলাহলমুক্ত নিরাপদ ছিল রংপুর বিভাগের শহরগুলো।
আধুনিকতার ছোয়া ও সময়ের সঙ্গে যান্ত্রিক প্রযুক্তি সংযোজিত দ্রুতগতির তিন চাকার
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক যেন কেড়ে নিয়েছে সেই সুনাম। শুধু বিভাগীয় নগরী রংপুরই নয় বরং
গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম,পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলা শহরের
চিত্রটাও বদলে গেছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকের দাপটে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক
থেকে শুরু করে অলিগলি, এমনকি মহাসড়কেও রয়েছে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকের দৌরাত্ম্য।
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার কারণে সড়কে বেড়েছে দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে
বেড়েছে মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব। গত কয়েক বছরে রংপুরের আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে ব্যাটারি
চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার ব্যাপক হারে বেড়েছে দাপট। পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা শহরে
অদক্ষ চালকের কারণে যত্রতত্র বেড়েছে ব্যাপক যানজট। যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ।
বেড়েছে বিদ্যুতের ওপর চাপ। এসব যানবাহন কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাই, খুনসহ সংঘটিত হচ্ছে
নানা অপরাধ। শান্তির শহরগুলোতে এখন যেন অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব যানবাহন। ঢাকা
থেকে সড়ক পথে রংপুর বিভাগের প্রবেশদ্বার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা। এক সময়ে
যানজটের সাথে পরিচিত না থাকা সেই গাইবান্ধা জেলা শহরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে
অন্তত ৩০ হাজার ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক চলাচল করছে। এর মধ্যে অনিবন্ধিত অর্ধেকেরও বেশি।
আর চার্জার রিকশার সংখ্যা যেন হিসাব ছাড়া। এমনটাই জানিয়েছে গাইবান্ধা পৌরসভার
লাইসেন্স শাখাসহ বিভিন্ন উপজেলাগুলোতেও সহজলভ্য বাহন হিসেবে পরিচিত দ্রুতগতির ব্যাটারি
চালিত ইজিবাইক, ভ্যান ও চার্জাররিকশা। ব্রহ্মপুত্র নদের উপনদী ধরলা তীরে অবস্থিত কুড়িগ্রাম
জেলায় ৪০ হাজারের বেশি ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক, ভ্যান, মিশুক ও চার্জাররিকশা রয়েছে। এর
মধ্যে বেশির ভাগই রেজিস্ট্রেশনবিহীন। চালকেরও নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। তারপরও বেপরোয়া
দ্রুতগতিতে চলছে অলিগলি থেকে সড়ক-মহাসড়কে। এসব যানবাহনের লাগাম টানতে নেই
আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এ কারণে সড়কে নেই শৃঙ্খলা। যত্রতত্র পার্কিং আর যানজট নিত্যদিন
বাড়াচ্ছে ভোগান্তি। প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনাও। জেলায় ব্যাটারি চালিত এসব
বাহনের সংখ্যা ৪০ হাজার ৫০০টি। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় প্রায় ৯ হাজার, নাগেশ্বরীতে ৭
হাজার, কুড়িগ্রাম সদরে ৮ হাজার, উলিপুরে ৮ হাজার, রাজারহাটে ৪ হাজার, চিলমারীতে ২ হাজার,
রৌমারীতে ২ হাজার ও রাজিবপুর উপজেলায় প্রায় ৫০০টি ব্যাটারি চালিত বাহন রয়েছে।
কুড়িগ্রামে ১৩টি শো-রুমে প্রতিদিন গড়ে অন্তত অর্ধশত ব্যাটারি চালিত বাহন বিক্রি
হচ্ছে। এছাড়া জেলার বাইরের শো-রুম থেকেও ক্রয় করে আনা হচ্ছে নিত্যনতুন অটোরিকশা।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়েও লাগাম ছাড়া বেড়েছে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও
চার্জাররিকশা। পঞ্চগড় পৌরসভার তথ্যমতে, পৌর এলাকায় বর্তমানে নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা
প্রায় দেড় হাজার। তবে প্রতিদিন শহরের বাইরে থেকে আরও দুই হাজার ব্যাটারি চালিত থ্রি-হুইলার
প্রবেশ করে ২০ টাকা ফি দিয়ে। এছাড়াও জেলার অনিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা ৫ হাজারের
অধিক। এসব যানবাহনের কারণে প্রতিদিন শহরে তীব্র যানজট দেখা দিচ্ছে। এদিকে ঠাকুরগাঁও
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন শহরে প্রায় ১০ হাজার ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও
চার্জাররিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে পৌরসভা থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মতো
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে সড়কে চলাচল করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর বাহিরে ৭
হাজার অটোরিকশা অবৈধভাবে চলাচল করে শহর এলাকায় যানজট সৃষ্টি করছে।
হতাহতের চিত্র
গত এক বছরে গাইবান্ধায় ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার কারণে ছোট-বড়
মিলিয়ে শতাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
আর পঙ্গুত্ববরণ করেছেন প্রায় ২০ জন। এছাড়াও এক বছরে ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক
ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৩০টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন চালক।
কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছেন, কুড়িগ্রামে গত বছরের জুলাই থেকে
চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে ৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব
দুর্ঘটনার বেশির ভাগ ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার কারণে সংঘটিত হয়েছে।
পঞ্চগড় বিআরটিএ এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ২৭টি
সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন, আহত হয়েছে অন্তত ২৫ জন। স্থানীয়দের
অভিযোগ, এ দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে ব ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশর
কারণে। বিভাগের অন্যান্য জেলার মতো ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে
ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা কারণে কি পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটেছে, কতজন এর শিকার তার
কোনো সঠিক তথ্য জানা নেই পৌরসভা ও পুলিশের কাছে।
যা বলছেন চালক ও যাত্রীরা
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে
জনজীবন। এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল ও সড়কে যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে

যানজট। ট্রাফিক আইন অমান্য করে যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই
নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে প্রায় ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। আর এসব
দুর্ঘটনায় কখনো প্রাণহানিসহ শারীরিক ক্ষতির হচ্ছে যাত্রীসহ সাধারণ পথচারীদের। ব্যাটারি
চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার লাগাম টানতে ট্রাফিক পুলিশ ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টরা
ব্যর্থ। মানুষ চায় নিরাপদ সড়ক, যান চলাচলে সচেতনতা ও সড়কে শৃঙ্খলা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এখন
সচেতনতার অভাবে সাথে ঘন ঘন দুর্ঘটনার কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে সড়কগুলো। গাইবান্ধার
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মনোয়ার হোসেন বলেন, গত মে মাসে গাইবান্ধা-নাকাইহাট সড়কের
হাওয়া দিঘির মোড় এলাকায় দ্রুতগতির ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ধাক্কায় কাসেম মিয়া নামে
এক পথচারী গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার
অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
তিনি মারা যান। নিহত পথচারীর বড় ছেলে শাহজামাল মিয়া বলেন, বাবা ছিলেন আমাদের পরিবারের
একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সেদিন তিনি বাজার করে ইজিবাইক থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে
ছিলেন। হঠাৎ দ্রুত গতিতে ছুটে আসা আরেকটি ইজিবাইক বাবাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। পরে
রংপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ইজিবাইক আমাদের জীবনটা শেষ করে
দিয়েছে। সরকারের উচিত বেপরোয়া গতির ঝুঁকিপূর্ণ এসব ইজিবাইক বন্ধ করে দেওয়া।
ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নুরুল ইসলাম বলেন, অদক্ষ চালকরা শহরজুড়ে অবৈধ ইজিবাইক নিয়ে দাপিয়ে
বেড়াচ্ছে। শহরে যে পরিমাণ অটো ও চার্জাররিকশা বেড়েছে তা হিসাব ছাড়া এদের মধ্যে
অধিকাংশ চালকের বয়স কম, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি বেশির ভাগ চালকেরও ড্রাইভিং
লাইসেন্স নেই। তারা আইন-কানুন মানেন না। যাত্রী হাত তুললেই যেখানে-সেখানে ব্রেক দিচ্ছে,
যাত্রী ওঠানামা করছে। এসব তো পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কিন্তু প্রশাসন এসব দেখেও না
দেখার ভান করে। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, যানজট নিরসনের জন্য
আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সেই সাথে অনুমোদন দেওয়া অটোরিকশার জন্য
স্ট্যান্ড করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আর যেসব অটোরিকশার অনুমোদন নেই সেগুলোর বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পঞ্চগড়ের আব্দুর রহিম বলেন, আগে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল।
এখন ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক চালিয়ে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করা যায়। তবে
দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় থাকে। যাত্রী মাহমুদা বেগম বলেন, ভাড়া কম বলে অটোতে যাতায়াত
সহজ। কিন্তু চালকদের বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণে সবসময় দুর্ঘটনার ভয় থাকে।
অটোরিকশার লাগাম টানতে ব্যর্থ প্রশাসন
আবুল কাশেম নামে এক বেসরকারি চাকুরিজীবি বলেন, রংপুর বিভাগের জেলা ও উপজেলা শহর
যানজট মুক্ত করতে হলে অবশ্যই ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার নিয়ন্ত্রণে আনতে
হবে। নিবন্ধনহীন যানবাহন বন্ধ না করলে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে। কিন্তু অটোরিকশার
লাগাম টানতে ট্রাফিক পুলিশ ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ। আমরা চাই নিরাপদ সড়ক, যান
চলাচলে সচেতনতা ও সড়কে শৃঙ্খলা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এখন সচেতনতার অভাবে সাথে ঘন ঘন
দুর্ঘটনার কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে সড়কগুলো। গাইবান্ধা ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ
আলতাফ হোসেন বলেন, শহরে যানজট সৃষ্টির জন্য বেশিরভাগ দায়ী ইজিবাইক। একদিকে যানজট
সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে ছোটখাটো দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইজিবাইকের কারণে
যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, যে সড়কে ধারণক্ষমতা ৩ হাজার, সেখানে
যদি ৫ হাজার যানবাহন চলে, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই যানজট লেগে থাকবে। লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ
চালক, ইজিবাইকের সহজলভ্যতা এবং কোনো নির্ধারিত দপ্তরের কার্যকর তদারকি না থাকায় এর
সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ঠাকুরগাঁও শহরে অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণে পৌরসভাকে কার্যকর উদ্যোগ
নেওয়া উচিত বলে মনে করছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। শহরে যাত্রী ছাউনি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড
তৈরি করা গেলে যানজট সহনীয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও ট্রাফিক
পুলিশের শহর ও যানবাহন বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক হাসান আসকরী। তিনি বলেন, সবসময় চেষ্টা
করা হয় শহরকে যানজটমুক্ত রাখতে। পৌরসভা সড়কে চলাচল করার জন্য অটোরিকশার ট্রেড লাইসেন্স
দিয়েছে। তারপর অসংখ্য অবৈধ অটোরিকশা চলাচল করছে। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এসব অটোরিকশার
জন্য যাত্রী ছাউনি ও স্ট্যান্ড করে দিলে যানজটমুক্ত করা সম্ভব।
ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ
ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও চার্জাররিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে বিদ্যুতের ওপর ব্যাপক চাপ
সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হয়, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল
করে তুলেছে। গাইবান্ধা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (নেসকো-২) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ
আসিফ বলেন, প্রতিটি ইজিবাইক একবার পূর্ণ চার্জ দিতে ১০ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ
হয়। ব্যাটারি ভেদে এটি কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। একটি জেলায় যদি ৩০ হাজার ইজিবাইক
থাকে, সেই হিসেবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়। যদিও ইজিবাইকের জন্য সরকার
ইউনিট প্রতি ৭ টাকা ট্যারিফ নির্ধারণ করে দিয়েছে, তবুও বিদ্যুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে
ইজিবাইক। কুড়িগ্রামে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে
অটোরিকশার চার্জে ব্যবহৃত বিদ্যুৎকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। নেসকো সূত্রে জানা যায়,

কুড়িগ্রাম পৌর শহরে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট। অথচ সরবরাহ
আছে ১০ থেকে ১১ মেগাওয়াট। শহরে বিভিন্ন গ্যারেজ ও বাড়িতে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার
ব্যবস্থা রয়েছে। জেলার চিলমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ি, ভূরুঙ্গামারী, রাজারহাট ও
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ১০৮ মেগাওয়াট, এখন সরবরাহ ৮০ থেকে ৮৫
মেগাওয়াট। ঘাটতি ও চাহিদার সমন্বয়ে কখনো কখনো হচ্ছে লম্বা লোডশেডিং। ঠাকুরগাঁও
পৌর এলাকার অটোরিকশার গ্যারেজ মালিকরা বলেন, রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে তারা ৮০ টাকা
থেকে ১০০ টাকা গ্রহণ করেন। এছাড়াও ব্যাটারি চালিত রিকশার চালককে দৈনিক ৩০০ টাকা দিতে
হয় মালিককে। ঠাকুরগাঁও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই (নেসকো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের ওপর অনেকটা
প্রভাব পড়েছে। দিন-রাতের চাহিদা অনুযারী বিদ্যুৎ সাপ্লাই দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন
চারপাশে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার গ্যারেজ দেখা যায়। একটা অটোরিকশা প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টা
চার্জ দিতে হয়। আবার সময় মতো বিদ্যুৎ বিল পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ বিল না পেয়ে আমাদের
লাইনম্যানরা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে ঝামেলার সৃষ্টি হয়।
দায়সারা আশ্বাস দিয়ে নীরব কর্তৃপক্ষ
ব্যাটারি চালিত এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও তেমন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করায়
কমেনি জনভোগান্তি। বরং যত দিন যাচ্ছে ততই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়সারা আশ্বাসে সচেতন
মহলসহ যাত্রী সাধারণের মনে বাড়ছে বিরক্তি ও ক্ষোভ। যদিও নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা আদায়সহ
নানা রকম সচেতনতামূলক কার্যক্রম করার কথা বলছে ট্রাফিক বিভাগ। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার
প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, যানজট নিরসনের জন্য আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ
করেছি। সেই সাথে অনুমোদন দেওয়া অটোরিকশার জন্য স্ট্যান্ড করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। যেসব
অটোরিকশার অনুমোদন নেই সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পঞ্চগড় পৌরসভার নির্বাহী
কর্মকর্তা রাশেদুর রহমান বলেন, নিবন্ধিত অটোর বাইরের যানগুলোই মূল সমস্যা সৃষ্টি করছে।
এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করা হচ্ছে। গাইবান্ধা পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক আবদুল আহাদ
মিয়া বলেন, গাইবান্ধা পৌরসভা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার বিষয়টি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।
অটোরিকশাগুলো একদিকে যেমন স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকার উৎস, তেমনি শহরের জন্য এক বড়
সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিবন্ধিত গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। চালকদের সচেতন করার
চেষ্টা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট রুটে চলাচলের জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু জনবল ও আইনের
সীমাবদ্ধতার কারণে সফল হতে পারছি না। এ সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। আমাদের একটি
সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ ও পৌরসভাসহ সকলে একসঙ্গে
কাজ করতে হবে।