ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গতকাল শনিবার বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর আজ রোববার অভিজ্ঞ রাজনীতিক আলী লারিজানি জানিয়েছেন, দেশে একটি ‘অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ’ গঠন করা হবে, যা নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।
গত এক বছরে লারিজানি ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পারমাণবিক আলোচনা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।
অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারক লারিজানি
ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেওয়া লারিজানি শুরু থেকেই শাসনব্যবস্থার ভেতরের মানুষ। গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও, একই সময়ে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি–সংক্রান্ত আলোচনা তদারকিতে যুক্ত ছিলেন।
আজ রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ মাথাচাড়া দিলে তাদের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদুর রহিম মুসাভি নিহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।
খামেনির বিশ্বস্ত সহযোগী
গত আগস্টে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি)-এর সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই লারিজানি খামেনির একজন বিশ্বস্ত কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। গত মাসে তিনি ওমানে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ পরমাণু আলোচনায় অংশ নেন। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদারে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার মস্কো সফর করেছেন।
পারমাণবিক ইস্যুতে লারিজানি তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান দেখিয়েছেন। ওমানি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ যদি কেবল ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি নিয়ে হয়, তবে সেই বিষয়ে আলোচনা সম্ভব।”
লারিজানির প্রভাব ও ভূমিকা (সংক্ষেপে)
নিরাপত্তাপ্রধান হিসেবে তিনি খামেনির অন্যতম বিশ্বস্ত অনুসারী ছিলেন।
কট্টরপন্থী ব্যবস্থার ভেতর থেকেও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
সাবেক এই পরমাণু আলোচক একসময় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমপ্রধান ও পার্লামেন্ট স্পিকার ছিলেন।
নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে মিত্রদেশ রাশিয়ায় একাধিকবার সফর করেছেন।
বিক্ষোভ দমন ও নিষেধাজ্ঞা
বাস্তববাদী ভাবমূর্তি থাকলেও, গত জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে চলা ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে লারিজানির ভূমিকা ছিল কঠোর। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জনগণের ন্যায়সংগত দাবির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের পক্ষে তিনিই ছিলেন প্রথম সারির নেতাদের একজন। পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ওই বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হন।
যদিও লারিজানি অর্থনৈতিক দুরবস্থাজনিত আন্দোলনকে ‘জনগণের প্রতিবাদ’ হিসেবে স্বীকার করেছেন, তবে সশস্ত্র বিক্ষোভকারীদের তিনি ‘শহুরে আধা সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
সাবেক রেভোল্যুশনারি গার্ড সদস্য
পরমাণু আলোচক (২০০৫–২০০৭): ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির কট্টর সমর্থক
পার্লামেন্ট স্পিকার (২০০৮–২০২০): এই সময়েই ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়
পারিবারিক পরিচয়: ১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম; প্রভাবশালী আলেম পরিবারের সন্তান
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। তবে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হওয়া এই চরম সংকটময় সময়ে লারিজানি নিজেকে একজন দক্ষ ‘পাওয়ার ব্রোকার’ বা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
শু/সবা

























