10:07 pm, Monday, 29 June 2026

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর বাস্তবায়নে পিছিয়ে বাংলাদেশ: বছরে হারাচ্ছে ২২১ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ

ভয়েস আয়োজিত ”বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয় শীর্ষক” অ্যাডভোকেসি মতবিনিময় সভা।

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক বিধিমালা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো এর কার্যকর বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ টন ঝুঁকিপূর্ণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্পদ।

রোববার (২৯ জুন) ঢাকায় অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনস (এপিসি)-এর সহায়তায় ভয়েস আয়োজিত “বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয়” শীর্ষক অ্যাডভোকেসি সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সভায় ভয়েস ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত মূল্যায়নের ফলাফল উপস্থাপন করে। এতে দেখা যায়, বিধিমালার আনুষ্ঠানিক অনুসরণ এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া সব প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত এবং প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করলেও বাস্তব কার্যক্রমে চিত্র অত্যন্ত দুর্বল। মাত্র ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের টেক-ব্যাক (Take-back) ব্যবস্থা রয়েছে এবং একই সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বিপজ্জনক ঝুঁকির মানদণ্ড অনুসরণ করে। গত অর্থবছরে কোনো প্রতিষ্ঠানই মেয়াদোত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ করেনি কিংবা সংরক্ষণ ও রেকর্ড ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে বজায় রাখেনি।

মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর ১০ শতাংশেরও কম আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রতিবছর আনুমানিক ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে।

মূল্যায়নের ফলাফল উপস্থাপন করে ভয়েসের বন্ধন দাস বলেন, “বাংলাদেশ ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো তৈরি করলেও এর বাস্তবায়ন এখনো অনেকাংশেই অকার্যকর। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, উৎপাদকদের জবাবদিহি এবং কার্যকর সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ছাড়া বিধিমালার প্রত্যাশিত পরিবেশগত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না।”

ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভয়েস গবেষণা, অ্যাডভোকেসি এবং নীতিগত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে। ২০২১ সালের বিধিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) আমিনুর রসুল বলেন, “ই-বর্জ্য শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়, এটি সম্পদ ব্যবস্থাপনারও বড় চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মূল্যও সৃষ্টি করা সম্ভব।”

বাংলাদেশ উইসো সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা আক্তার ঊল আলম বলেন, “বাংলাদেশে আমদানিকৃত অনেক ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্যবান উপাদান বিদেশেই পুনরুদ্ধার ও পরিশোধিত হয়। ফলে অর্থনৈতিক সুবিধা বিদেশে থেকে যায়, আর পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় বাংলাদেশকে।”

ভয়েসের উপপরিচালক (প্রোগ্রামস) মোশাররাত মাহেরা বলেন, “বর্তমান সরকারের জলবায়ু কার্যক্রমের অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে সঠিক ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এটি সবার যৌথ দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব নয়।”

সভায় অংশ নেওয়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, উৎপাদকদের সম্প্রসারিত দায়িত্ব (Extended Producer Responsibility) নিশ্চিত করা এবং মানুষ ও পরিবেশবান্ধব সার্কুলার ইকোনমিতে অধিক বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শু/সবা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

12 + fourteen =

About Author Information

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ছাত্রশিবিরের ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর বাস্তবায়নে পিছিয়ে বাংলাদেশ: বছরে হারাচ্ছে ২২১ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ

Update Time : ০৫:০৪:৫২ pm, Monday, ২৯ জুন ২০২৬

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক বিধিমালা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো এর কার্যকর বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ টন ঝুঁকিপূর্ণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্পদ।

রোববার (২৯ জুন) ঢাকায় অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনস (এপিসি)-এর সহায়তায় ভয়েস আয়োজিত “বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয়” শীর্ষক অ্যাডভোকেসি সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সভায় ভয়েস ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত মূল্যায়নের ফলাফল উপস্থাপন করে। এতে দেখা যায়, বিধিমালার আনুষ্ঠানিক অনুসরণ এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া সব প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত এবং প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করলেও বাস্তব কার্যক্রমে চিত্র অত্যন্ত দুর্বল। মাত্র ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের টেক-ব্যাক (Take-back) ব্যবস্থা রয়েছে এবং একই সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বিপজ্জনক ঝুঁকির মানদণ্ড অনুসরণ করে। গত অর্থবছরে কোনো প্রতিষ্ঠানই মেয়াদোত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ করেনি কিংবা সংরক্ষণ ও রেকর্ড ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে বজায় রাখেনি।

মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর ১০ শতাংশেরও কম আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রতিবছর আনুমানিক ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে।

মূল্যায়নের ফলাফল উপস্থাপন করে ভয়েসের বন্ধন দাস বলেন, “বাংলাদেশ ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো তৈরি করলেও এর বাস্তবায়ন এখনো অনেকাংশেই অকার্যকর। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, উৎপাদকদের জবাবদিহি এবং কার্যকর সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ছাড়া বিধিমালার প্রত্যাশিত পরিবেশগত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না।”

ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভয়েস গবেষণা, অ্যাডভোকেসি এবং নীতিগত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে। ২০২১ সালের বিধিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) আমিনুর রসুল বলেন, “ই-বর্জ্য শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়, এটি সম্পদ ব্যবস্থাপনারও বড় চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মূল্যও সৃষ্টি করা সম্ভব।”

বাংলাদেশ উইসো সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা আক্তার ঊল আলম বলেন, “বাংলাদেশে আমদানিকৃত অনেক ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্যবান উপাদান বিদেশেই পুনরুদ্ধার ও পরিশোধিত হয়। ফলে অর্থনৈতিক সুবিধা বিদেশে থেকে যায়, আর পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় বাংলাদেশকে।”

ভয়েসের উপপরিচালক (প্রোগ্রামস) মোশাররাত মাহেরা বলেন, “বর্তমান সরকারের জলবায়ু কার্যক্রমের অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে সঠিক ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এটি সবার যৌথ দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব নয়।”

সভায় অংশ নেওয়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, উৎপাদকদের সম্প্রসারিত দায়িত্ব (Extended Producer Responsibility) নিশ্চিত করা এবং মানুষ ও পরিবেশবান্ধব সার্কুলার ইকোনমিতে অধিক বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শু/সবা