জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম ও তার আশেপাশের এলাকায় বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। দু’একটি সংসদীয় এলাকার গুটিকয়েক কেন্দ্রে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটলেও বেশীর ভাগ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনের মধ্যে নয়টি সংসদীয় আসনে নৌকার প্রার্থীর সাথে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীর ভোটযুদ্ধ হয়েছে।
চট্টগ্রামের ১০ নং সংসদীয় আসনের পাহাড়তলী কলেজ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ মনজুর আলমের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সকালে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রে একক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ দুইজন হলেন শান্ত বড়ুয়া (৩০) ও মোঃ জামাল উদ্দীন (৩২)। দুইজনকে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর পুরাতন চান্দগাঁও থানা এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সকাল ৯ টার দিকে বিএনপি কর্মী – সমর্থকরা নির্বাচন বর্জনের দাবীতে মিছিল করার সময় পাশের ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার সময় লোকজনকে বাঁধা দিতে চাইলে, পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। এসময় পুলিশের সাথে বিএনপি নেতা কর্মীদের ধাওয়া ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে বিজিবি ও পুলিশের টহল টীম এসে ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনেন।
চট্টগ্রামের যেসকল সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীর সাথে বিভিন্ন দলের ডামি প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সেইসব নির্বাচনী এলাকায় ছোট ছোট দলের ডামি প্রার্থীদের এজেন্ট বসানো হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে। ফলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, নগরীর কোতোয়ালী, আনোয়ারা ও সীতাকুণ্ড সংসদীয় আসনের নৌকার প্রার্থীদের ভোট গ্রহণ হয়েছে অনেকটা নীরবে। এসব সংসদীয় আসনে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকলেও প্রতিটি কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট কাস্ট করা হয়েছে সুকৌশলে। চট্টগ্রামের প্রতিটি সংসদীয় আসনের ভোট কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটারদের স্বতস্ফুর্ত উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। প্রতিটি কেন্দ্রের সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে নারী – পুরুষ সকলেই অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রয়োগ করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম – ৮ ( বোয়ালখালী, চান্দগাঁও ) সংসদীয় আসনে জোটের প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন জাতীয় পার্টির নাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মোঃ সোলায়মান আলম শেঠ। তাকে সমর্থন দিয়ে নৌকার প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তবে এই আসনে আওয়ামী লীগের দুইজন হেভিওয়েট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। দুই প্রার্থীর চাপে এই আসনের কেন্দ্র গুলোতে জাল ভোটসহ নানা ভাবে ভোট প্রদান করা গেলেও কোন প্রার্থীর সমর্থনে কেন্দ্রে একক ভাবে ব্যালেটে সিল মারার সুযোগ হয়নি। একই ভাবে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ডবলমুরিং, মিরসরাই, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, হাটহাজারী সংসদীয় আসনে নৌকা ও নাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীর সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ভোটে প্রতিদ্বদ্বিতা করা বিভিন্ন প্রতীকের প্রার্থীর সাথে দ্বিমুখী – ত্রিমুখী ভোটযুদ্ধ হয়েছে। চট্টগ্রামের ১৬ টি সংসদীয় আসনের মধ্যে যে নয়টি সংসদীয় আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, সেইসব আসনের ভোট কেন্দ্রে ভোট কাস্ট হয়েছে অনেক কম। এবার ভোট গ্রহণের সিস্টেম পাল্টে কেন্দ্র দখল ছাড়াই নৌকার একক প্রার্থীগণের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রের বাহিরে ভাড়াটিয়া নারী ও পুরুষ ভোটারকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে একাধিক এজেন্টের মাধ্যমে ব্যালেটে সিল মেরে নির্দিষ্ট হারে ভোট কাস্ট করে বাক্স ভর্তি করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন।
সকাল ৮ টায় ভোট গ্রহণ শুরু হলেও চট্টগ্রামের বেশীর ভাগ কেন্দ্র ছিল সকাল ৮ টার দিকে ফাঁকা। বেলার বাড়ার সাথে সাথে কোন কোন ভোট কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা বাড়লেও তা এক ঘণ্টার মধ্যে আবারো ফাঁকা হয়ে পড়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। অনেক ভোট কেন্দ্রে শিশু – কিশোররাও বড়দের সাহায্যে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দুপুর এক টার পর থেকে ভোট কেন্দ্রের বেশীর ভাগ কেন্দ্রই ছিল ফাঁকা। বিকাল ৪ টায় ভোট গ্রহণ বন্ধ করে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু করেছেন কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি কেন্দ্রের বাহিরে প্রার্থীর কর্মী – সমর্থকরা নিজ নিজ প্রার্থীর সমর্থন নিয়ে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রামের ১৬ টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬৩ লক্ষ ১৪ হাজার ৩৯৭ জন। এতে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৩২ লক্ষ ৮৯ হাজার ৫৯০ জন। মহিলা ভোটার সংখ্যা ৩০ লক্ষ ২৪ হাজার ৭৫১ জন। ১৬ টি সংসদীয় আসনে মোট কেন্দ্র সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৩ টি। এসব কেন্দ্রে ভোটারদের ভোট গ্রহণ করার জন্য বুথ রাখা হয়েছিল ১৩ হাজার ৭৩২ টি। ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণ রাখতে প্রতিটি কেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া বিজিবি, র্যাব, পুলিশের টহল টীম ছিল বেশ সক্রিয়। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন সজাগ দৃষ্টি রেখেই। বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া চট্টগ্রামের সবক’টি সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে।


























