০৪:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬, ২১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে অস্থির চালের বাজার

রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে। ফলে বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তারপরও অস্থির চালের বাজার। ১০ দিনের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) চালের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। পাইকারি চাল বিক্রেতারা বলছেন, মিলার ও মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীদের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এই বাড়তি দর পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সমন্বয় করছেন।

মিল মালিকরা জানিয়েছে, মিল পর্যায়ে প্রতি বস্তা আঠাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ২৯০০ থেকে ৩০০০ টাকা, যা এক সপ্তাহখানেক আগেও ২৬০০ থেকে ২৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া মোটা চাল (গুটি স্বর্ণা) প্রতিবস্তা বিক্রি হচ্ছে ২৩৫০-২৪০০ টাকা, যা সপ্তাহখানেক আগে ২২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়াও জিরাশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৩২০০ টাকায়। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছিল ২৮০০ টাকায়।

এই চাল আবার আড়ৎদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে এসে দাম বাড়ছে বস্তা প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে দাম বাড়ছে আরও ৩০০ টাকা। হঠাৎ চালের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য চাল ব্যবসায়ীরা একে অপরকে দুষছেন। পাইকারি চাল বিক্রেতারা বলছেন, মিল মালিকরা দাম বাড়াচ্ছে। মিল মালিকরা বলছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছে। এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা দোষ দিচ্ছেন পাইকারদের।

পাইকারী বিক্রেতারা বলেন, বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যে চালের বস্তা ১০দিন আগে ২৮০০ টাকায় বিক্রি করতাম, তা এখন ৩২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিআর-২৮ চাল পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি করতাম ২২০০ টাকা, যা এখন ২৪০০-২৪৫০ টাকায় বিক্রি করছি। ফলে খুচরা বাজারে চালের দাম বেড়েছে।

কামাল অটো রাইস মিলের সত্ত্বাধিকারী কামাল হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, এখন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চাল মজুদ করে রেখেছেন। তারা তাদের মূল্য না ছাড়া ধান ছাড়ছে না। তাদের কাছে বেশি দামে কিনে নিয়ে আসতে হচ্ছে ধান। আমাদের খরচও আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।

মিজান নামের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, মিলগুলো থেকে আমাদের ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাজারে চাল সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের দায়ী করছেন মিল মালিকেরা। তারা বলছেন, কৃষক পর্যায় থেকে ধানের দাম বেশি রাখায় চালের দাম বাড়ছে।

রাজশাহী চালকল মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সবুজ বাংলাকে বলেন, চালের দাম বাড়লেই আমাদের দোষ হয়। কিন্তু এখন ধানের দাম বাড়তি থাকায় চাল প্রসেসিংয়ে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। যে কারণে মিল পর্যায় থেকে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। কৃষকদের পাশাপাশি ধানের মৌসুমি ব্যবসায়ী এখন ধান মজুদ করছে। দাম বেশি না হলে তারা বাজারে ছাড়ছেন না। এ কারণে বাজারে ধানের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। জামিলুর রহমান (ছদ্ম নাম) নামের এক বিক্রেতা বলেন, সরকারকে জিম্মি করে মিল মালিকেরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা ভেবেছে সরকারের কাছে এখন টাকা নেই। দাম বাড়ালেও আমদানি করতে পারবে না। আর এ কারণে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে বাজার মনিটরিং করা হয়। যারা বাজার মনিটরিং করতে আসে, তাদের যাওয়া উচিত মিল মালিকদের কাছে। দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সেখানেই করতে হবে।

জেলা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা আফরিন হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, বেশ কিছুদিন থেকে চালের দাম বাড়ছে। ইতোমধ্যে আমরা বেশকিছু পদক্ষেপও নিয়েছি।
দুয়েকের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের রাজশাহীর উপপরিচালক ইব্রাহিম হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের অভিযান চলছে। চাল ব্যবসায়ীদের সতর্কও করা হচ্ছে। এরপরও যারা সতর্ক হচ্ছে না তাদের জরিমানা করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বগতির বাজারে নতুন করে চালের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। তারা অভিযোগ করে বলছেন, চালের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে সরকারের তদারকির অভাব ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন তারা। রাজশাহী অঞ্চলের সর্ববৃহৎ ধান উৎপাদনের জেলা হিসেবে পরিচিত নওগাঁ।

জেলাটির কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ লাখ ৪৫ হাজার টন। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তা ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর কমপক্ষে ১৫ হাজার টন বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে।

রাজশাহী কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরে চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯১ হাজার ৬২ মেট্রিক টন। তবে ছাড়িয়ে গেছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। বগুড়ায় চলতি রোপা-আমন মৌসুমে চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৩৪ মেট্রিক টন। যা গতবছরের তুলনায় লক্ষমাত্রা ছাড়িয়েছে। জয়পুরহাটে ২ লাখ ২১ হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। নাটোর জেলায় ৭৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা ছাড়িয়েগেছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার ২ লাখ ২০ হাজার ৫৭৭ টন চাল উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজশাহীতে অস্থির চালের বাজার

আপডেট সময় : ০৭:১৯:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৪

রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে। ফলে বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তারপরও অস্থির চালের বাজার। ১০ দিনের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) চালের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। পাইকারি চাল বিক্রেতারা বলছেন, মিলার ও মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীদের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর এই বাড়তি দর পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সমন্বয় করছেন।

মিল মালিকরা জানিয়েছে, মিল পর্যায়ে প্রতি বস্তা আঠাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ২৯০০ থেকে ৩০০০ টাকা, যা এক সপ্তাহখানেক আগেও ২৬০০ থেকে ২৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া মোটা চাল (গুটি স্বর্ণা) প্রতিবস্তা বিক্রি হচ্ছে ২৩৫০-২৪০০ টাকা, যা সপ্তাহখানেক আগে ২২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়াও জিরাশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৩২০০ টাকায়। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছিল ২৮০০ টাকায়।

এই চাল আবার আড়ৎদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে এসে দাম বাড়ছে বস্তা প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে দাম বাড়ছে আরও ৩০০ টাকা। হঠাৎ চালের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য চাল ব্যবসায়ীরা একে অপরকে দুষছেন। পাইকারি চাল বিক্রেতারা বলছেন, মিল মালিকরা দাম বাড়াচ্ছে। মিল মালিকরা বলছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছে। এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা দোষ দিচ্ছেন পাইকারদের।

পাইকারী বিক্রেতারা বলেন, বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যে চালের বস্তা ১০দিন আগে ২৮০০ টাকায় বিক্রি করতাম, তা এখন ৩২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিআর-২৮ চাল পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি করতাম ২২০০ টাকা, যা এখন ২৪০০-২৪৫০ টাকায় বিক্রি করছি। ফলে খুচরা বাজারে চালের দাম বেড়েছে।

কামাল অটো রাইস মিলের সত্ত্বাধিকারী কামাল হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, এখন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চাল মজুদ করে রেখেছেন। তারা তাদের মূল্য না ছাড়া ধান ছাড়ছে না। তাদের কাছে বেশি দামে কিনে নিয়ে আসতে হচ্ছে ধান। আমাদের খরচও আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।

মিজান নামের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, মিলগুলো থেকে আমাদের ঘাটতি দেখিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাজারে চাল সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের দায়ী করছেন মিল মালিকেরা। তারা বলছেন, কৃষক পর্যায় থেকে ধানের দাম বেশি রাখায় চালের দাম বাড়ছে।

রাজশাহী চালকল মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সবুজ বাংলাকে বলেন, চালের দাম বাড়লেই আমাদের দোষ হয়। কিন্তু এখন ধানের দাম বাড়তি থাকায় চাল প্রসেসিংয়ে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। যে কারণে মিল পর্যায় থেকে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। কৃষকদের পাশাপাশি ধানের মৌসুমি ব্যবসায়ী এখন ধান মজুদ করছে। দাম বেশি না হলে তারা বাজারে ছাড়ছেন না। এ কারণে বাজারে ধানের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। জামিলুর রহমান (ছদ্ম নাম) নামের এক বিক্রেতা বলেন, সরকারকে জিম্মি করে মিল মালিকেরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা ভেবেছে সরকারের কাছে এখন টাকা নেই। দাম বাড়ালেও আমদানি করতে পারবে না। আর এ কারণে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে বাজার মনিটরিং করা হয়। যারা বাজার মনিটরিং করতে আসে, তাদের যাওয়া উচিত মিল মালিকদের কাছে। দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সেখানেই করতে হবে।

জেলা বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা আফরিন হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, বেশ কিছুদিন থেকে চালের দাম বাড়ছে। ইতোমধ্যে আমরা বেশকিছু পদক্ষেপও নিয়েছি।
দুয়েকের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের রাজশাহীর উপপরিচালক ইব্রাহিম হোসেন সবুজ বাংলাকে বলেন, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের অভিযান চলছে। চাল ব্যবসায়ীদের সতর্কও করা হচ্ছে। এরপরও যারা সতর্ক হচ্ছে না তাদের জরিমানা করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বগতির বাজারে নতুন করে চালের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। তারা অভিযোগ করে বলছেন, চালের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে সরকারের তদারকির অভাব ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন তারা। রাজশাহী অঞ্চলের সর্ববৃহৎ ধান উৎপাদনের জেলা হিসেবে পরিচিত নওগাঁ।

জেলাটির কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ লাখ ৪৫ হাজার টন। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তা ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর কমপক্ষে ১৫ হাজার টন বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে।

রাজশাহী কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরে চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯১ হাজার ৬২ মেট্রিক টন। তবে ছাড়িয়ে গেছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। বগুড়ায় চলতি রোপা-আমন মৌসুমে চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৩৪ মেট্রিক টন। যা গতবছরের তুলনায় লক্ষমাত্রা ছাড়িয়েছে। জয়পুরহাটে ২ লাখ ২১ হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। নাটোর জেলায় ৭৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা ছাড়িয়েগেছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার ২ লাখ ২০ হাজার ৫৭৭ টন চাল উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।