০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ওয়াসার পনিতে বদলেছে বস্তিবাসীর জীবন মান

◉ বৈধ সংযোগ সংখ্যা বাড়ছে, কমছে চুরি
◉ পানিবাহিত রোগ কমেছে বস্তিতে
◉ ভেঙেছে পানি নিয়ে গড়ে ওঠা চক্র

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বাস করছেন সাবানা বেগম। পেশায় গৃহকর্মী সাবানার এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিদিন নিজের সংসার আর বাড়ি বাড়িতে কাজ সামলে আবার রাতের বেলা ১-২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হতো খাওয়া, রান্না ও গৃহস্থালীর কাজের জন্য পানি সংগ্রহে। তবে এখন আর পানি সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না তার। বস্তিতে এখন রয়েছে ওয়াসার বৈধ লাইন। সেখান থেকেই নিয়মিত প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করেন তিনি।
সাবানা বলেন, সারাদিন লোকের বাড়ি কাম করে, নিজের ঘরের কাম সেরে আবার রাততিরে পানি আনতে যাতি হতো। লাইন দিয়ে দাঁড়ায় থেকে পানি নিতে হতো। কলসিতে পানি নিয়ে আবার ঘরে এসে ড্রাম ভরতাম। পানি না আনতি পারলি খাওনা-দাওন হতো না, গোসলও হতো না। আবার লাইনি দাঁড়ানো নিয়ে মারামারি, ঝগড়া বাঁধতো প্রতিদিনই। এহনতো দিনের বেলা পানি পায় ওয়াসার কলে।

শুধু সাবানা নয় কড়াইল বস্তির কয়েক হাজার মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে ওয়াসার বৈধ সংযোগে। সেখান থেকেই ওয়াসার নিয়মিত দামে পানি পাচ্ছেন তারা। প্রতিটি সংযোগে পানি পাচ্ছেন ৬ থেকে ৮টি পরিবার। তবে ওয়াসার পানি আসার আগে পানি সংগ্রহ ছিল তাদের ভোগান্তির অন্যনাম। বস্তিবাসী জানান, ওয়াসার সংযোগ আসার আগে অনেকে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি ও মহল ওয়াসার সংযোগ থেকে চোরাই লাইনে পানি নিয়ে বিক্রি করত। প্রতি কলস পানি বিক্রি হতো পাঁচ থেকে দশ টাকা, তাও কয়েক কলসির বেশি পানি নেওয়া যেতো না। এছাড়াও অবৈধ লাইন হওয়ায় পানি নিতে হতো শুধুমাত্র রাতের বেলায়। পানি নিতে এসে ঝগড়া-মারামারি ছিলো নিত্যদিনের বিষয়। যৌন হয়রানির মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বীকার হতেন নারীরাও। আর সুপেয় পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ তো ছিলই।

শুধু কড়াইল বস্তি নয়, রাজধানীর প্রায় ৩০০ বস্তিতে এখন রয়েছে ওয়াসার বৈধ পানি সংযোগ। যার প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ সুযোগ নিচ্ছেন বস্তিতে বাস করা কয়েক লক্ষ মানুষ। বস্তিতে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে ওয়াসার সংযোগ দেওয়ার দাবি বিভিন্ন সময় উঠলেও তা স¤ভব হয়নি। কারণ অধিকাংশ বস্তিগুলোর অবস্থান সরকারি জমিতে হওয়ায় বৈধভাবে পানির লাইন দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে এই সমস্যার সমাধানে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ খুঁজে নেয় ভিন্ন রাস্তা। বস্তিবাসীর মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা (এনজিও)। তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করে ওয়াসা। বেসরকারি এসব সংস্থা ও বস্তিবাসীকে নিয়ে গঠন করা হয় ‘কমিউনিটি বেসড অরগাইনাইজেশন’ (সিবিও)। এর মাধ্যমে বস্তিতে দেওয়া হয় পানির সংযোগ।
এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায় জানান, বস্তিতে চোরাই লাইনগুলো আমাদের মূল লাইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করত। যখন কেউ চুরি করে সংযোগ নিত, সংযোগ ত্রুটি থাকত, সেখান থেকে পাইপে ময়লা ঢুকত। ফলে বৈধ সংযোগ যাদের, তারা আবার ময়লা পানির অভিযোগ তুলত। আবার চোরাই লাইনের পানি একটা সিন্ডিকেট বেশি দামে বিক্রি করত। এই সমস্যার সমাধান খুঁজছিলাম আমরা। লো ইনকাম কমিউনিটি (এলআইসি) নামে শাখা খুলে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ২০১৩ সাল থেকে বস্তিগুলোতে পানি সরবরাহ শুরু করা হয়। এখন পর্যন্ত এ শাখার অধীনে ৯ হাজারের বেশি সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা নিজেরা বস্তিতে যাই। যেয়ে বলি কারো অবৈধ লাইন থাকলে জানাতে, আমরা কোনো জরিমানা বা শাস্তি ছাড়া সেটাকে বৈধ করব। এখন অবৈধ লাইনের সংখ্যাও কমছে। যেসব এলাকায় ময়লা পানির অভিযোগ ছিল, এখন অভিযোগও নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

ওয়াসার পনিতে বদলেছে বস্তিবাসীর জীবন মান

আপডেট সময় : ০৫:৫১:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মার্চ ২০২৪

◉ বৈধ সংযোগ সংখ্যা বাড়ছে, কমছে চুরি
◉ পানিবাহিত রোগ কমেছে বস্তিতে
◉ ভেঙেছে পানি নিয়ে গড়ে ওঠা চক্র

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বাস করছেন সাবানা বেগম। পেশায় গৃহকর্মী সাবানার এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিদিন নিজের সংসার আর বাড়ি বাড়িতে কাজ সামলে আবার রাতের বেলা ১-২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হতো খাওয়া, রান্না ও গৃহস্থালীর কাজের জন্য পানি সংগ্রহে। তবে এখন আর পানি সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না তার। বস্তিতে এখন রয়েছে ওয়াসার বৈধ লাইন। সেখান থেকেই নিয়মিত প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করেন তিনি।
সাবানা বলেন, সারাদিন লোকের বাড়ি কাম করে, নিজের ঘরের কাম সেরে আবার রাততিরে পানি আনতে যাতি হতো। লাইন দিয়ে দাঁড়ায় থেকে পানি নিতে হতো। কলসিতে পানি নিয়ে আবার ঘরে এসে ড্রাম ভরতাম। পানি না আনতি পারলি খাওনা-দাওন হতো না, গোসলও হতো না। আবার লাইনি দাঁড়ানো নিয়ে মারামারি, ঝগড়া বাঁধতো প্রতিদিনই। এহনতো দিনের বেলা পানি পায় ওয়াসার কলে।

শুধু সাবানা নয় কড়াইল বস্তির কয়েক হাজার মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে ওয়াসার বৈধ সংযোগে। সেখান থেকেই ওয়াসার নিয়মিত দামে পানি পাচ্ছেন তারা। প্রতিটি সংযোগে পানি পাচ্ছেন ৬ থেকে ৮টি পরিবার। তবে ওয়াসার পানি আসার আগে পানি সংগ্রহ ছিল তাদের ভোগান্তির অন্যনাম। বস্তিবাসী জানান, ওয়াসার সংযোগ আসার আগে অনেকে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি ও মহল ওয়াসার সংযোগ থেকে চোরাই লাইনে পানি নিয়ে বিক্রি করত। প্রতি কলস পানি বিক্রি হতো পাঁচ থেকে দশ টাকা, তাও কয়েক কলসির বেশি পানি নেওয়া যেতো না। এছাড়াও অবৈধ লাইন হওয়ায় পানি নিতে হতো শুধুমাত্র রাতের বেলায়। পানি নিতে এসে ঝগড়া-মারামারি ছিলো নিত্যদিনের বিষয়। যৌন হয়রানির মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বীকার হতেন নারীরাও। আর সুপেয় পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ তো ছিলই।

শুধু কড়াইল বস্তি নয়, রাজধানীর প্রায় ৩০০ বস্তিতে এখন রয়েছে ওয়াসার বৈধ পানি সংযোগ। যার প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ সুযোগ নিচ্ছেন বস্তিতে বাস করা কয়েক লক্ষ মানুষ। বস্তিতে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে ওয়াসার সংযোগ দেওয়ার দাবি বিভিন্ন সময় উঠলেও তা স¤ভব হয়নি। কারণ অধিকাংশ বস্তিগুলোর অবস্থান সরকারি জমিতে হওয়ায় বৈধভাবে পানির লাইন দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে এই সমস্যার সমাধানে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ খুঁজে নেয় ভিন্ন রাস্তা। বস্তিবাসীর মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা (এনজিও)। তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করে ওয়াসা। বেসরকারি এসব সংস্থা ও বস্তিবাসীকে নিয়ে গঠন করা হয় ‘কমিউনিটি বেসড অরগাইনাইজেশন’ (সিবিও)। এর মাধ্যমে বস্তিতে দেওয়া হয় পানির সংযোগ।
এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায় জানান, বস্তিতে চোরাই লাইনগুলো আমাদের মূল লাইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করত। যখন কেউ চুরি করে সংযোগ নিত, সংযোগ ত্রুটি থাকত, সেখান থেকে পাইপে ময়লা ঢুকত। ফলে বৈধ সংযোগ যাদের, তারা আবার ময়লা পানির অভিযোগ তুলত। আবার চোরাই লাইনের পানি একটা সিন্ডিকেট বেশি দামে বিক্রি করত। এই সমস্যার সমাধান খুঁজছিলাম আমরা। লো ইনকাম কমিউনিটি (এলআইসি) নামে শাখা খুলে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ২০১৩ সাল থেকে বস্তিগুলোতে পানি সরবরাহ শুরু করা হয়। এখন পর্যন্ত এ শাখার অধীনে ৯ হাজারের বেশি সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা নিজেরা বস্তিতে যাই। যেয়ে বলি কারো অবৈধ লাইন থাকলে জানাতে, আমরা কোনো জরিমানা বা শাস্তি ছাড়া সেটাকে বৈধ করব। এখন অবৈধ লাইনের সংখ্যাও কমছে। যেসব এলাকায় ময়লা পানির অভিযোগ ছিল, এখন অভিযোগও নেই।