০৮:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নীরব ঘাতক মুখরোচক খাবার

⦿রমজান উপলক্ষে সড়কের উন্মুক্তস্থানে অবাধে বিক্রি হচ্ছে বাহারি ইফতার সামগ্রী।
⦿ভাজা-পোড়া খাবারের গুণগত মান নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন।
⦿মুখরোচক এসব খাবার গ্রহণে বাড়ছে হার্টের সমস্যা ও ক্যান্সারসহ মরণব্যাধি।
⦿বাসায় তৈরি ইফতার সামগ্রী খাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।


রমজান এলেই যেন রাজধানী হয়ে ওঠে ইফতারের নগরী। পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে শুরু করে নগরীর প্রতিটি অলিগলিতেই বসে ইফতারের পসরা। প্রতিটি দোকানেই সাজানো হয় বাহারি রকমের ইফতার সামগ্রী। রাস্তার পাশের এসব দোকানে যেসব ইফতার পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই তেলে ভাজা। একই তেল বা কালো পোড়া তেলে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুচপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের মুখরোচক খাবার। এসব খাবার বিক্রির জন্য ধূলাবালির সড়কে উন্মুক্তভাবে রাখা হচ্ছে খোলা জায়গায়। বিশ্বের প্রথম সারির বায়ুদূষণের শহরে এভাবে ফুটপাতের খাবার কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা না ভেবেই অবলীলায় খেয়ে যাচ্ছে রাজধানীবাসী। এসব খাবারের গুণগত মান নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। রাস্তায় খোলা জায়গায় বিক্রি করা তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার খেয়ে হতে পারে হার্টের সমস্যা ও ক্যান্সারসহ নানান ধরনের মরণব্যাধি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসায় তৈরি ইফতার সামগ্রী খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কম থাকে। তাই এসব পণ্য খাওয়ার প্রতি আগ্রহ দেখানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। অপরদিকে পুষ্টিবিদরা বলছেন, রমজান মাস ঘিরে নীরব ঘাতক হচ্ছে রাস্তার পাশে ধুলাবালির মধ্যে অবাধে তৈরি করা তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ইফতার বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতা ও পুষ্টিবিদ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও রমজান মাস ঘিরে মুখরোচক খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন ভোজনরসিকরা।

রমজানের মুখরোচক খাবার ছাড়া ঘরে-বাইরে ইফতারি যেন জমেই না। সারা দিন রোজা রাখার পর নানা পদের খাবার না পেলে যেন পূর্ণতা পায় না ইফতার। কাদাজল আর ধুলাবালির শহর পুরান ঢাকার চকবাজারসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে ডেকোরেটরের টেবিল বিছিয়ে দুপুর থেকেই বিভিন্ন ডালায় মুখরোচক খাবার সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। তার পাশেই সিলিন্ডার গ্যাসে লোহার বেড়ি দেওয়া চুলার উপরে কড়াইয়ের গরম পোড়া তেলে ভাজা হচ্ছে আস্ত মুরগি, কবুতর, কোয়েল পাখি, ডিমচপ, খাসির রান, বেগুনি, আলুচপ, পেঁয়াজু ইত্যাদি। এসব মুখরোচক খাবার সাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ গরম গরম জিলাপি-দোপেঁয়াজু ভাজা শেষ হয়ে গেল, আসুন আসুন ভাই বলে ডাকছেন বিভিন্ন দোকানিরা। বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সাড়া দিয়ে অনেক ক্রেতাই সময় ও ঝামেলা এড়াতে কিনছেন তাদের পছন্দের মুখরোচক খাবার। কোনো কোনো হোটেল-রেস্তোর মোরগ-পোলাও, খাসি-গরু ও মুরগির তেহারি, কাচ্চি বিরিয়ানি তৈরি করে ক্রেতা আকৃষ্ট করতে পাতিলের ঢাকনা চাপড়ে চাপড়ে খাবার ফুরিয়ে গেল বলে উচ্চস্বরে ডাকছেন। চকবাজারের ইফতার সামগ্রী বিক্রেতা আলমগীর হোসেন ও ইসহাক মিয়া বলেন, ডাক না দিলে কাস্টমাররা দেখে না। পাশের দোকানে চলে যায়। তাই অনেকটাই প্রতিযোগিতা করে হাঁকডাক দিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, বাসায় রান্না করে এখানে এনে বিক্রি করলে সব খাবারই ঠান্ডা হয়ে যাবে।

ক্রেতাদের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাধ্য হয়েই খোলা জায়গায় ডুবা তেলে এসব মুখরোচক খাবার তৈরি করে পসরা সাজিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। অরিজিনাল সয়াবিন তেল দিয়ে এসব তৈরি করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতার সামগ্রী বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, মৌলভীবাজার থেকে অরিজিনাল টিনের ড্রামভর্তি তেল কিনে এনে তা ব্যবহার করছি। তবে ড্রামে যদি ভেজাল থাকে তাহলে আমরা কী করবো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক দোকান কর্মচারী বলেন, প্রতিযোগিতার বাজারে অরিজিনাল তেল দিয়ে ভাজা-পোড়া তৈরি করতে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। এতে বিক্রি অর্ধেকে নেমে যাবে। দিনশেষে লোকসান গুনতে হবে দোকানিদের। দিনশেষে কর্মচারীর বেতন দিতে হয় ৫ থেকে ৮শ টাকা। এরমধ্যে ফুটপাতের বখরাতো আছেই। একই চিত্র দেখা গেছে, লালবাগ চৌরাস্তা, ইসলামবাগ, শহীদনগর বৌ-বাজার, আজিমপুর ছাপড়া মসজিদ এলাকা, নবাবগঞ্জ বাজার, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকায়। কসমেটিক্স দোকানের মালিক বাবুল হোসেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, মুখরোচক এসব খাবারের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, এসব খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের তদারকি না থাকায় অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় বিক্রেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে ভেজাল খাদ্য তৈরি করে বিক্রি করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। এদের লাগাম টেনে ধরার সময় এখনই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাসা অনেক দূরে হওয়ায় ইফতার সামগ্রী অধিকাংশ সময়ই বাধ্য হয়ে ফুটপাতের দোকান থেকে পছন্দের ইফতার সামগ্রী ক্রয় করছি। তবে বেশিরভাগ সময়ই ভাজা-পোড়া এড়িয়ে ফল-জুস, মাঠা, শরবত ও হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে মোরগ-পোলাও, বিরিয়ানি এবং নানরুটি-গ্রিল কিনে খাই। দোকানে থাকলে মাঝেমধ্যে কাস্টমারের চাপে খেজুর দিয়েই ইফতার খুলে থাকি। ফ্রি হলে অন্য খাবার কিনে খান বলে জানান বিভিন্ন মার্কেটের দোকানিরা। তবে এসব মুখরোচক খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে মুখরোচক এসব খাবারই মানবদেহে নীরব ঘাতকে রূপ নিচ্ছে বলে দাবি করেছেন পুষ্টিবিদরা। তারা বলছেন, গত দু’দিন ধরে বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট কাদাজলে একাকার হয়ে আছে। আরেকদিকে রয়েছে ধুলাবালির বায়ুদূষণ। এরমধ্যে রাস্তার উপর তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার তৈরি ও বিক্রির কারণে মানবদেহে নানা রোগের পাশাপাশি হতে পারে ক্যান্সার ও হার্টের সমস্যার মতো ভয়াবহ মারণব্যাধিও। তবে এসব খাবারের স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে উদ্বিগ্ন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, যেসব খাবার খাওয়া হচ্ছে তার গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়ায় স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নুরুল আমিন বলেন, রমজান এলেই খাবারের সময়সূচির পরিবর্তন ঘটে। খোলা বাজার থেকে খাবার খেয়ে অনেকেই কঠিন পেটের পীড়ায় ভোগেন। এছাড়া নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। অনেকেই ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। রমজানে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটায় এবং ভোজনরসিকরা খোলা জায়গা থেকে ধুলাবালি মিশ্রিত তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার ব্যবহার করে নিজের অজান্তেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। খোলা জায়গা থেকে খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, রমজান মাসজুড়ে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোজাদারদের সচেতন হতে হবে। নিজের ঘরে ইফতার সামগ্রী তৈরি খাবারের প্রতি সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে। ঘরে তৈরি করা খাবার খেলে তেমন একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সেটা ইফতারি বা সাহরি হোক, প্রত্যেকের
জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে পুষ্টিবিদ মাহমুদা নাজনীন বলেন, লম্বা সময় আমরা যখন না খেয়ে থাকছি তখন আমাদের স্টোমাকটার অবস্থা কিন্তু নাজুক হয়ে যায়। ওই নাজুক স্টোমাকে আমাদের উচিত একটা সহজপাচ্য খাবার দেওয়া, যে খাবারটা সহজে হজম করতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা পুরোটা উল্টো কাজ করছি। আমরা তেলে ভাজা খাবার খাচ্ছি। এর ফলে আমাদের বিভিন্ন ধরনের পেটের অসুখ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এসব ভাজা-পোড়া খাবার খেতে আমরা কেন নিষেধ করছি, এর একটা মূল কারণ হচ্ছে- ভাজা-পোড়া খাবারে যে তেলটা ব্যবহার করা হচ্ছে সেই একই তেল যখন বারবার ভাজা হয় তখন এটার মধ্যে পলি অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন তৈরি হয়ে যায়। এতে করে পেটের বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভাজা-পোড়া খাওয়ায় সবাইকেই সতর্ক থাকা উচিত। শরবত জাতীয় খাবার ইফতার ও ইফতার-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি খাওয়া উচিত বলে মনেকরেন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

নীরব ঘাতক মুখরোচক খাবার

আপডেট সময় : ১১:৪৯:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০২৪

⦿রমজান উপলক্ষে সড়কের উন্মুক্তস্থানে অবাধে বিক্রি হচ্ছে বাহারি ইফতার সামগ্রী।
⦿ভাজা-পোড়া খাবারের গুণগত মান নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন।
⦿মুখরোচক এসব খাবার গ্রহণে বাড়ছে হার্টের সমস্যা ও ক্যান্সারসহ মরণব্যাধি।
⦿বাসায় তৈরি ইফতার সামগ্রী খাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।


রমজান এলেই যেন রাজধানী হয়ে ওঠে ইফতারের নগরী। পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে শুরু করে নগরীর প্রতিটি অলিগলিতেই বসে ইফতারের পসরা। প্রতিটি দোকানেই সাজানো হয় বাহারি রকমের ইফতার সামগ্রী। রাস্তার পাশের এসব দোকানে যেসব ইফতার পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই তেলে ভাজা। একই তেল বা কালো পোড়া তেলে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুচপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের মুখরোচক খাবার। এসব খাবার বিক্রির জন্য ধূলাবালির সড়কে উন্মুক্তভাবে রাখা হচ্ছে খোলা জায়গায়। বিশ্বের প্রথম সারির বায়ুদূষণের শহরে এভাবে ফুটপাতের খাবার কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা না ভেবেই অবলীলায় খেয়ে যাচ্ছে রাজধানীবাসী। এসব খাবারের গুণগত মান নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। রাস্তায় খোলা জায়গায় বিক্রি করা তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার খেয়ে হতে পারে হার্টের সমস্যা ও ক্যান্সারসহ নানান ধরনের মরণব্যাধি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসায় তৈরি ইফতার সামগ্রী খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কম থাকে। তাই এসব পণ্য খাওয়ার প্রতি আগ্রহ দেখানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। অপরদিকে পুষ্টিবিদরা বলছেন, রমজান মাস ঘিরে নীরব ঘাতক হচ্ছে রাস্তার পাশে ধুলাবালির মধ্যে অবাধে তৈরি করা তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ইফতার বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতা ও পুষ্টিবিদ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও রমজান মাস ঘিরে মুখরোচক খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন ভোজনরসিকরা।

রমজানের মুখরোচক খাবার ছাড়া ঘরে-বাইরে ইফতারি যেন জমেই না। সারা দিন রোজা রাখার পর নানা পদের খাবার না পেলে যেন পূর্ণতা পায় না ইফতার। কাদাজল আর ধুলাবালির শহর পুরান ঢাকার চকবাজারসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে ডেকোরেটরের টেবিল বিছিয়ে দুপুর থেকেই বিভিন্ন ডালায় মুখরোচক খাবার সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। তার পাশেই সিলিন্ডার গ্যাসে লোহার বেড়ি দেওয়া চুলার উপরে কড়াইয়ের গরম পোড়া তেলে ভাজা হচ্ছে আস্ত মুরগি, কবুতর, কোয়েল পাখি, ডিমচপ, খাসির রান, বেগুনি, আলুচপ, পেঁয়াজু ইত্যাদি। এসব মুখরোচক খাবার সাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ গরম গরম জিলাপি-দোপেঁয়াজু ভাজা শেষ হয়ে গেল, আসুন আসুন ভাই বলে ডাকছেন বিভিন্ন দোকানিরা। বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সাড়া দিয়ে অনেক ক্রেতাই সময় ও ঝামেলা এড়াতে কিনছেন তাদের পছন্দের মুখরোচক খাবার। কোনো কোনো হোটেল-রেস্তোর মোরগ-পোলাও, খাসি-গরু ও মুরগির তেহারি, কাচ্চি বিরিয়ানি তৈরি করে ক্রেতা আকৃষ্ট করতে পাতিলের ঢাকনা চাপড়ে চাপড়ে খাবার ফুরিয়ে গেল বলে উচ্চস্বরে ডাকছেন। চকবাজারের ইফতার সামগ্রী বিক্রেতা আলমগীর হোসেন ও ইসহাক মিয়া বলেন, ডাক না দিলে কাস্টমাররা দেখে না। পাশের দোকানে চলে যায়। তাই অনেকটাই প্রতিযোগিতা করে হাঁকডাক দিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, বাসায় রান্না করে এখানে এনে বিক্রি করলে সব খাবারই ঠান্ডা হয়ে যাবে।

ক্রেতাদের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাধ্য হয়েই খোলা জায়গায় ডুবা তেলে এসব মুখরোচক খাবার তৈরি করে পসরা সাজিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। অরিজিনাল সয়াবিন তেল দিয়ে এসব তৈরি করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতার সামগ্রী বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, মৌলভীবাজার থেকে অরিজিনাল টিনের ড্রামভর্তি তেল কিনে এনে তা ব্যবহার করছি। তবে ড্রামে যদি ভেজাল থাকে তাহলে আমরা কী করবো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক দোকান কর্মচারী বলেন, প্রতিযোগিতার বাজারে অরিজিনাল তেল দিয়ে ভাজা-পোড়া তৈরি করতে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। এতে বিক্রি অর্ধেকে নেমে যাবে। দিনশেষে লোকসান গুনতে হবে দোকানিদের। দিনশেষে কর্মচারীর বেতন দিতে হয় ৫ থেকে ৮শ টাকা। এরমধ্যে ফুটপাতের বখরাতো আছেই। একই চিত্র দেখা গেছে, লালবাগ চৌরাস্তা, ইসলামবাগ, শহীদনগর বৌ-বাজার, আজিমপুর ছাপড়া মসজিদ এলাকা, নবাবগঞ্জ বাজার, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকায়। কসমেটিক্স দোকানের মালিক বাবুল হোসেন দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, মুখরোচক এসব খাবারের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, এসব খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের তদারকি না থাকায় অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় বিক্রেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে ভেজাল খাদ্য তৈরি করে বিক্রি করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। এদের লাগাম টেনে ধরার সময় এখনই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাসা অনেক দূরে হওয়ায় ইফতার সামগ্রী অধিকাংশ সময়ই বাধ্য হয়ে ফুটপাতের দোকান থেকে পছন্দের ইফতার সামগ্রী ক্রয় করছি। তবে বেশিরভাগ সময়ই ভাজা-পোড়া এড়িয়ে ফল-জুস, মাঠা, শরবত ও হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে মোরগ-পোলাও, বিরিয়ানি এবং নানরুটি-গ্রিল কিনে খাই। দোকানে থাকলে মাঝেমধ্যে কাস্টমারের চাপে খেজুর দিয়েই ইফতার খুলে থাকি। ফ্রি হলে অন্য খাবার কিনে খান বলে জানান বিভিন্ন মার্কেটের দোকানিরা। তবে এসব মুখরোচক খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে মুখরোচক এসব খাবারই মানবদেহে নীরব ঘাতকে রূপ নিচ্ছে বলে দাবি করেছেন পুষ্টিবিদরা। তারা বলছেন, গত দু’দিন ধরে বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাট কাদাজলে একাকার হয়ে আছে। আরেকদিকে রয়েছে ধুলাবালির বায়ুদূষণ। এরমধ্যে রাস্তার উপর তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার তৈরি ও বিক্রির কারণে মানবদেহে নানা রোগের পাশাপাশি হতে পারে ক্যান্সার ও হার্টের সমস্যার মতো ভয়াবহ মারণব্যাধিও। তবে এসব খাবারের স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে উদ্বিগ্ন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, যেসব খাবার খাওয়া হচ্ছে তার গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়ায় স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নুরুল আমিন বলেন, রমজান এলেই খাবারের সময়সূচির পরিবর্তন ঘটে। খোলা বাজার থেকে খাবার খেয়ে অনেকেই কঠিন পেটের পীড়ায় ভোগেন। এছাড়া নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। অনেকেই ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। রমজানে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটায় এবং ভোজনরসিকরা খোলা জায়গা থেকে ধুলাবালি মিশ্রিত তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার ব্যবহার করে নিজের অজান্তেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। খোলা জায়গা থেকে খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, রমজান মাসজুড়ে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোজাদারদের সচেতন হতে হবে। নিজের ঘরে ইফতার সামগ্রী তৈরি খাবারের প্রতি সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে। ঘরে তৈরি করা খাবার খেলে তেমন একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সেটা ইফতারি বা সাহরি হোক, প্রত্যেকের
জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে পুষ্টিবিদ মাহমুদা নাজনীন বলেন, লম্বা সময় আমরা যখন না খেয়ে থাকছি তখন আমাদের স্টোমাকটার অবস্থা কিন্তু নাজুক হয়ে যায়। ওই নাজুক স্টোমাকে আমাদের উচিত একটা সহজপাচ্য খাবার দেওয়া, যে খাবারটা সহজে হজম করতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা পুরোটা উল্টো কাজ করছি। আমরা তেলে ভাজা খাবার খাচ্ছি। এর ফলে আমাদের বিভিন্ন ধরনের পেটের অসুখ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এসব ভাজা-পোড়া খাবার খেতে আমরা কেন নিষেধ করছি, এর একটা মূল কারণ হচ্ছে- ভাজা-পোড়া খাবারে যে তেলটা ব্যবহার করা হচ্ছে সেই একই তেল যখন বারবার ভাজা হয় তখন এটার মধ্যে পলি অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন তৈরি হয়ে যায়। এতে করে পেটের বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভাজা-পোড়া খাওয়ায় সবাইকেই সতর্ক থাকা উচিত। শরবত জাতীয় খাবার ইফতার ও ইফতার-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি খাওয়া উচিত বলে মনেকরেন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা।