- শ্রমিক অধিকারের বিশ্ব মানদণ্ড ও সংশ্লিষ্ট শ্রম আইন মানা হচ্ছে না ঠিকমতো
- মৌলিক মানবাধিকার থেকেও বঞ্চিত অনেক প্রবাসী শ্রমিক
- কষ্ট সইতে না পেরে দেশে ফিরছেন অনেকে
- সরকারি ও বেসরকারি এজেন্সি কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান
দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ ভূমিকা রাখছে প্রবাসী শ্রমিকরা। স্বাধীনতা পরবর্তী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানে অভাব আর আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রবাসে কর্মসংস্থানে আগ্রহীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। তবে নানা কারণে বিদেশে গিয়েও স্বস্তিতে নেই এসব রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। মৌলিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডতো দূরের কথা, সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইনানুযায়ীও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না অনেকে। কাঙ্ক্ষিত চাকরি ও সুযোগ-সুবিধাও মিলছে না অনেকের ভাগ্যে। তবুও নিজ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নানা বঞ্চনা আর দুঃখ-কষ্ট উপেক্ষা করেই দিনের পর দিন পার করছেন প্রবাস জীবন। অনেকে আবার কষ্ট সইতে না পেরে দেশে ফিরে আসছেন। প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের লেবার উইংগুলো মূলত কাজ করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বপালন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
আজ সারা বিশ্বে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন- মহান মে দিবস পালনের মধ্য দিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মজীবন নিশ্চিতে সরকারি- বেসরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ দৃষ্টি কামনা করা হচ্ছে। প্রবাসজীবনের কষ্টের কথা স্বীকার করে সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে আসা এক কর্মী জানান, বিদেশে যাওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পদে পদে ভোগান্তির শিকার হতে হয় কর্মীদের। কারণ অন্য দেশ থেকে যে খরচে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক আসতে পারেন, বাংলাদেশ থেকে আসতে তার চেয়ে অনেক বেশি খরচ লাগে। আর মালয়েশিয়ায় যে কাজের কথা বলে আনা হয়, বাস্তবে তা জোটে না। কুয়ালালামপুরে কিছুদিন রাখার পর কাজ খুঁজে নিতে ছেড়ে দেয় সংশ্লিষ্টরা দালালরা। আর উপায় না পেয়ে অনেকে পথে পথে ঘুরে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। একপর্যায়ে বাংলাদেশি অন্য কর্মীদের সহায়তায় কষ্টকর ও কম বেতনের কোনো কাজ খুঁজে পেলে কষ্ট উপেক্ষা করেই সেখানে থাকার চেষ্টা করেন। অনেকে আবার এসব কষ্ট সইতে না পেরে দেশে ফিরতে চান। সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরতে আগ্রহীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশি দূতাবাসে পাসপোর্ট রিনিউসহ অন্যান্য কাজে নানা দুর্ভোগের শিকার হতে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি জাতিসংঘের এক বিবৃতিতেও মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নির্যাতনের বিষয়টির সত্যতা প্রকাশ পেয়েছে। মালয়েশিয়ায় শোষণের শিকার বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অবশ্যই রক্ষা করতে হবে বলে এক বিবৃতিতে জানান জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। সংস্থাটির জেনেভা থেকে পাঠানো ওই বিবৃতিতে দেশটিতে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে হতাশাও ব্যক্ত করা হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কর্মসংস্থানের আশায় সরকারি নিয়ম মেনেই যারা দেশটিতে গিয়েছিল তারা চরম দুরবস্থায় রয়েছেন। বিগত কয়েক মাস ধরেই দেশটিতে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা অসম্মানজনক অবস্থায় বসবাস করছেন। দেশটিকে অভিবাসী শ্রমিকদের এমন ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং তাদের শোষণ, অপরাধীকরণ এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করতে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে জোর তাগাদা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বেশিরভাগ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেখেন যে, তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মসংস্থান নেই। এমন অবস্থায় প্রায়ই তাদের ভিসা শেষ করতে বাধ্য করা হয়। ফলে এই অভিবাসীরা গ্রেপ্তার, আটক, দুর্ব্যবহার এবং নির্বাসনের ঝুঁকিতে রয়েছেন- বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই অবস্থা সৌদি আরব, কাতার, আরব- আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিরাজ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা) এর যুগ্ম মহাসচিব এম টিপু সুলতান গতকাল সবুজ বাংলাকে বলেন, শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক একটি মানদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব একটি শ্রম আইন আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হয় না। বিশেষ করে আমাদের প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। যেমন আট ঘণ্টার বেশি কর্মঘণ্টা ব্যয় করতে হবে, যথাযথ বিশ্রাম দেয়া হয় না, অন্যায়ভাবে নির্যাতন করা হয়।
এছাড়া মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলো যেমন- চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয় না। সব মিলিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের যথাযথ অধিকার সবক্ষেত্রে সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কিছু সমস্যা আছেই। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও লেবার উইংকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রয়োজনে জনবল আরও বৃদ্ধি করতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে প্রথমে আমাদের রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে, তারপর বেসরকারি এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব আছে। সবাইকে নিয়েই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ বষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (মিশন ও কল্যাণ অনুবিভাগ) মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঞা গতকাল মিটিংয়ে ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। পরে মোবাইলে আবার যোগাযোগ করা হলেও আর রিসিভ করেননি তিনি।


























