০৬:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল যুগেও এনালগে চলছে ট্রাফিক ব্যবস্থা

কমছেই না ঢাকার যানজট

❖ দুই যুগে কয়েকটি প্রকল্পে ব্যয় ২০০ কোটি টাকা
❖ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেমের দুটি প্ল্যান নিয়ে কাজ চলছে : মো. মুনিবুর রহমান, অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক)
❖সড়কের সক্ষমতার সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যাগত মিল থাকতে হবে : অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বুয়েট
❖ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর হচ্ছে সরকার

বাংলাদেশের মেগাসিটি হিসেবে পরিচিত রাজধানী ‘ঢাকা’র ট্রাফিক ব্যবস্থায় এখনো কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ডিজিটালের এই যুগে এখনো এনালগ পদ্ধতিতেই (হাতের ইশারায়) চলছে ঘনবসতিপূর্ণ ব্যস্ততম ‘ঢাকা’র ট্রাফিক ব্যবস্থা। বছরের পর বছর চেষ্টা করেও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ব্যস্ততম এ সড়কে চলাচল করতে গিয়ে চালকরা ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারা দেখতে না পেয়ে অনেক সময়ই মানছেন না ট্রাফিক সিগন্যাল। হাতের ইশারায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ট্রাফিক ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করতে গেল দুই যুগে কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করে ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করলেও তা আদৌ আলোর মুখ দেখেনি। এমন পরিস্থিতিতে আবারো স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।

 

বুয়েটের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, যানজট নিরসনে সড়কের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যাগত মিল থাকতে হবে। পলিসি লাগবে। সমন্বয়হীন হলে শুধু অবকাঠামো তৈরি করে যানজট নিরসন করা সম্ভব নয়। এদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। যানজট নিরসনে ঢাকা শহরে সব ধরনের ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক-অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলো ধ্বংস করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘড়ির কাটা তখন সাড়ে ১০টা। পুরান ঢাকার লালবাগের আজিমপুর-নবাবগঞ্জ সেকশন রোডের পোস্ট অফিস মোড়ে প্যাডেলচালিত রিকশা, ইজিবাইক, পিকআপ, প্রাইভেটকার, কাভার্ডভ্যান, ঠেলাগাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন। সরু রাস্তাটির দুই লেনের মাঝ দিয়ে নিউমার্কেটের দিকে ছুটে যাচ্ছে মোটরসাইকেল। চালকের হেলমেট থাকলেও বাইকে থাকা আরও দুই যাত্রীর হেলমেট নেই। প্রতিটি মোটরসাইকেল কে কার আগে যাত্রী তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দিবে, এমন লক্ষ্য নিয়েই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করছেন। জানা যায়, প্রতিটি মোটরসাইকেলই দুজন করে যাত্রী তুলে নেয় কামরাঙ্গীরচরের সেকশন বেড়িবাঁধ থেকে। ট্রাফিক পুলিশ রহস্যজনকভাবেই নির্বিকার। আজিমপুর মোড় পেরোতেই আধাঘণ্টা লেগে যায়। লেগুনার চালক রাজু বলেন, ভাই, বুঝেন নাই, সবই সিস্টেম করে চলে। ইজিবাইক- মোটরসাইকেলের সংখ্যা দুই শতাধিক। লেগুনা রয়েছে দেড় শতাধিক। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমারও লাইসেন্স নেই। সেকশন-গুলিস্তান ও হাজারীবাগ-গুলিস্তান রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ লেগুনা চালকেরই লাইসেন্স নেই।

 

ট্রাফিক ও ফাঁড়ি পুলিশ ম্যানেজ করেই এই রুটে নিত্যদিন গাড়ি চলছে। দুপুর ১২টার দিকে তপ্ত রোদের মধ্যেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় নিউমার্কেট থেকে সায়েন্সল্যাব মোড় পর্যন্ত। ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্টদের যানচলাচল স্বাভাবিক করতে নিরন্তর চেষ্টা চালাতে ব্যস্ত দেখা যায়। ট্রাফিক পুলিশ সদস্য হাসান বলেন, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মতে যানজট নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি। আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না। বিকাল ৩টার দিকে বঙ্গবাজার মোড়ে দেখা যায়, সব ধরনের যানবাহনে ঠাঁসা সড়কের চারপাশ। পথচারী রাস্তার পার হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তপ্ত রোদের নিচে দাঁড়িয়ে লাঠি হাতে দায়িত্ব পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আব্দুর রহমানসহ দুজন। হাতের ইশারায় সড়কে সিগন্যাল দিলেও অনেক লেগুনা, রিকশাচালক ও সিএনজি অটোরিকশা সেই সিগন্যাল উপেক্ষা করে সামনে ছুটে যায়। এসময় ট্রাফিক সদস্য আব্দুর রহমান একটি লেগুনা আটক করে। পরে যাত্রীদের অনুরোধে লেগুনা ছেড়ে দেন আব্দুর রহমান।

একই সময় অপর একটি কাভার্ড ভ্যান ও সিএনজি অটোরিকশা সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুত চলে যায়। সাধারণ পথচারীরা জানান, কারো মধে ধৈর্য্য নেই, সিগন্যাল দিলেও কেউ তা মানছে না। গুলিস্তানের গোলাপশাহ মোড়েও একই চিত্র দেখা যায়। রাজধানীর বিজয় সরণী মোড়। যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত ৮-১০ জন ট্রাফিক সদস্য। ভিভিআইপি চলাচল আর যানবাহনের চাপ থাকায় আছেন সিনিয়র কর্মকর্তারাও। তবে সবই চলছে হাতের ইশারায়। বিজয় সরণি মোড়ের এক গাড়িচালক বলেন, আগের ট্রাফিক লাইটই ভালো ছিল। আমরা দূর থেকে দেখে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতাম। কিন্তু এখন ট্রাফিক পুলিশের হাত দেখতে অসুবিধা হয়। ঠিক সময় ব্রেক করতে পারি না। আমাদের টাইমিংয়ে সমস্যা হয়। অপর এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, গাড়ি এবং বাইকের সবসময় গতিটা বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা ফলো করা যায় না। ফলে সিগন্যাল অবমাননা বেশি হয়। দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে অকেজো হয়ে পড়ে আছে ট্রাফিক সিগনালের বাতিগুলো। কিছু জায়গায় যা ঢাকা পড়েছে গাছের আড়ালে। বাতিগুলো শেষ কবে জ্বলেছে তাও মনে করতে পারেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বলেন, পিটিসি-ঢাকার যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের কাজে গত দুই যুগে কয়েকটি প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু যানবাহন চলে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে ও সমন্বয়হীনতার কারণে কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, স্বয়ংক্রিয় বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার যে কথাগুলো বলা হচ্ছে, এ শব্দটা অনেক ভারী। এর কার্যকরিতাও বিশে^র বিভিন্ন দেশে রয়েছে। আমাদের দেশের সড়কের যে ইকো সিস্টেম, তাতে স্বয়ংক্রিয়ের বিষয়টি প্রস্তুত নয়। এর জন্য প্রস্তুতি লাগে। প্রতিদিনই একসঙ্গে একই সড়কে চলাচল করছে উচ্চগতির-ধীরগতির রিকশা, ঠেলাগাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, বাস-লরি। দক্ষ চালকের বড় অভাব রয়েছে। সড়কগুলো যানজটমুক্ত করতে হলে কিছু পলিসি দরকার। তিনি বলেন, সড়কের সক্ষমতার সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যাগত মিল থাকতে হবে। যেসব যানবাহনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে, অর্থাৎ ২০ থেকে ৫০ বছর হয়েছে সেসব যানবাহন পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে। ট্রাফিক সিস্টেম স্বয়ংক্রিয় করতে হলে আগে থেকেই বিজ্ঞানসম্মত পলিসি গ্রহণ করতে হবে। সড়কে গাড়ির সক্ষমতা নিয়ে ভাবতে হবে। অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করে সড়কের যানজট নিরসন করা সম্ভব নয়। আমাদের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নীতির পরিবর্তন আনতে হবে। তবেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মনিবুর রহমান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেমে যেতে আমাদের দুইটা প্ল্যান আছে। একটা অটোমেটিক সিস্টেমে যাওয়ার প্ল্যান আছে। এটা নিয়ে কাজকর্ম চলছে। এটা নিয়ে কমিটি হয়েছে। এটা পর্যালোচনার পর্যায়ে আছে। এটা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে। এটা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে মিটিং হচ্ছে। মিটিং থেকে সিদ্ধান্ত আসতে আরও কিছু সময় লাগবে। তারপর সেই মোতাবেক পাইলট আকারে চালু করার পর সেটা সার্থক হলে আমরা পরবর্তীতে সারাদেশে চালু করতে পারব। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালটি রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এর প্রযুক্তিগত টেকনিক্যাল দিকগুলো তারা দেখবে, ম্যানপাওয়ারও তাদের। কাজেই এখানে মেইনটেন্যান্স ঠিক থাকলে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টটা আমাদের। এখানে ডুয়েল এডমিনিস্ট্রেশন। মো. মনিবুর রহমান বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে আইন ভঙ্গের দায়ে কোনো না কোনো যানবাহনের চালককে জরিমানা করছে ট্রাফিক পুলিশ। প্রতিদিন আমাদের ৮টা বিভাগে প্রায় হাজার খানেকের মতো মামলা হয়। মাসে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার মামলা হয়।

এদিকে গতকাল বুধবার বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৭ এর অধীনে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়ক-মহাসড়কের এমন বিশৃঙ্খলায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০ বছরের পুরোনো বাস কীভাবে সড়কে চলাচল করে? সড়কে শৃঙ্খলা না ফিরলে দুর্ঘটনাও কখনোই কমবে না। সমতল থেকে পাহাড়ে আজকে সুন্দর সুন্দর রাস্তা। তারপরও শৃঙ্খলা আসে না। ওবায়দুল কাদের বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়িকে রাস্তা থেকে তুলে দিয়ে স্ক্রাপ হিসেবে ধ্বংস করবে প্রশাসন। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আজ থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। মন্ত্রী বলেন, ফিটনেস ঠিক রেখে গণপরিবহনগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করতে হবে। এসময় সড়ক পরিবহন ও শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান মেয়াদোত্তীর্ণ ও লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোকে ডাম্পিং নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসের সুপারিশ করেন।

রাজশাহীতে কৃষি প্রযুক্তি মেলায় প্রদর্শিত হচ্ছে ১৩৫ প্রজাতির আম

ডিজিটাল যুগেও এনালগে চলছে ট্রাফিক ব্যবস্থা

আপডেট সময় : ০৮:০৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪

❖ দুই যুগে কয়েকটি প্রকল্পে ব্যয় ২০০ কোটি টাকা
❖ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেমের দুটি প্ল্যান নিয়ে কাজ চলছে : মো. মুনিবুর রহমান, অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক)
❖সড়কের সক্ষমতার সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যাগত মিল থাকতে হবে : অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, বুয়েট
❖ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর হচ্ছে সরকার

বাংলাদেশের মেগাসিটি হিসেবে পরিচিত রাজধানী ‘ঢাকা’র ট্রাফিক ব্যবস্থায় এখনো কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ডিজিটালের এই যুগে এখনো এনালগ পদ্ধতিতেই (হাতের ইশারায়) চলছে ঘনবসতিপূর্ণ ব্যস্ততম ‘ঢাকা’র ট্রাফিক ব্যবস্থা। বছরের পর বছর চেষ্টা করেও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ব্যস্ততম এ সড়কে চলাচল করতে গিয়ে চালকরা ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারা দেখতে না পেয়ে অনেক সময়ই মানছেন না ট্রাফিক সিগন্যাল। হাতের ইশারায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ট্রাফিক ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করতে গেল দুই যুগে কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করে ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করলেও তা আদৌ আলোর মুখ দেখেনি। এমন পরিস্থিতিতে আবারো স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।

 

বুয়েটের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, যানজট নিরসনে সড়কের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যাগত মিল থাকতে হবে। পলিসি লাগবে। সমন্বয়হীন হলে শুধু অবকাঠামো তৈরি করে যানজট নিরসন করা সম্ভব নয়। এদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। যানজট নিরসনে ঢাকা শহরে সব ধরনের ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক-অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলো ধ্বংস করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘড়ির কাটা তখন সাড়ে ১০টা। পুরান ঢাকার লালবাগের আজিমপুর-নবাবগঞ্জ সেকশন রোডের পোস্ট অফিস মোড়ে প্যাডেলচালিত রিকশা, ইজিবাইক, পিকআপ, প্রাইভেটকার, কাভার্ডভ্যান, ঠেলাগাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন। সরু রাস্তাটির দুই লেনের মাঝ দিয়ে নিউমার্কেটের দিকে ছুটে যাচ্ছে মোটরসাইকেল। চালকের হেলমেট থাকলেও বাইকে থাকা আরও দুই যাত্রীর হেলমেট নেই। প্রতিটি মোটরসাইকেল কে কার আগে যাত্রী তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দিবে, এমন লক্ষ্য নিয়েই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করছেন। জানা যায়, প্রতিটি মোটরসাইকেলই দুজন করে যাত্রী তুলে নেয় কামরাঙ্গীরচরের সেকশন বেড়িবাঁধ থেকে। ট্রাফিক পুলিশ রহস্যজনকভাবেই নির্বিকার। আজিমপুর মোড় পেরোতেই আধাঘণ্টা লেগে যায়। লেগুনার চালক রাজু বলেন, ভাই, বুঝেন নাই, সবই সিস্টেম করে চলে। ইজিবাইক- মোটরসাইকেলের সংখ্যা দুই শতাধিক। লেগুনা রয়েছে দেড় শতাধিক। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমারও লাইসেন্স নেই। সেকশন-গুলিস্তান ও হাজারীবাগ-গুলিস্তান রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ লেগুনা চালকেরই লাইসেন্স নেই।

 

ট্রাফিক ও ফাঁড়ি পুলিশ ম্যানেজ করেই এই রুটে নিত্যদিন গাড়ি চলছে। দুপুর ১২টার দিকে তপ্ত রোদের মধ্যেই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় নিউমার্কেট থেকে সায়েন্সল্যাব মোড় পর্যন্ত। ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্টদের যানচলাচল স্বাভাবিক করতে নিরন্তর চেষ্টা চালাতে ব্যস্ত দেখা যায়। ট্রাফিক পুলিশ সদস্য হাসান বলেন, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মতে যানজট নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি। আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না। বিকাল ৩টার দিকে বঙ্গবাজার মোড়ে দেখা যায়, সব ধরনের যানবাহনে ঠাঁসা সড়কের চারপাশ। পথচারী রাস্তার পার হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তপ্ত রোদের নিচে দাঁড়িয়ে লাঠি হাতে দায়িত্ব পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আব্দুর রহমানসহ দুজন। হাতের ইশারায় সড়কে সিগন্যাল দিলেও অনেক লেগুনা, রিকশাচালক ও সিএনজি অটোরিকশা সেই সিগন্যাল উপেক্ষা করে সামনে ছুটে যায়। এসময় ট্রাফিক সদস্য আব্দুর রহমান একটি লেগুনা আটক করে। পরে যাত্রীদের অনুরোধে লেগুনা ছেড়ে দেন আব্দুর রহমান।

একই সময় অপর একটি কাভার্ড ভ্যান ও সিএনজি অটোরিকশা সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুত চলে যায়। সাধারণ পথচারীরা জানান, কারো মধে ধৈর্য্য নেই, সিগন্যাল দিলেও কেউ তা মানছে না। গুলিস্তানের গোলাপশাহ মোড়েও একই চিত্র দেখা যায়। রাজধানীর বিজয় সরণী মোড়। যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত ৮-১০ জন ট্রাফিক সদস্য। ভিভিআইপি চলাচল আর যানবাহনের চাপ থাকায় আছেন সিনিয়র কর্মকর্তারাও। তবে সবই চলছে হাতের ইশারায়। বিজয় সরণি মোড়ের এক গাড়িচালক বলেন, আগের ট্রাফিক লাইটই ভালো ছিল। আমরা দূর থেকে দেখে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতাম। কিন্তু এখন ট্রাফিক পুলিশের হাত দেখতে অসুবিধা হয়। ঠিক সময় ব্রেক করতে পারি না। আমাদের টাইমিংয়ে সমস্যা হয়। অপর এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, গাড়ি এবং বাইকের সবসময় গতিটা বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা ফলো করা যায় না। ফলে সিগন্যাল অবমাননা বেশি হয়। দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে অকেজো হয়ে পড়ে আছে ট্রাফিক সিগনালের বাতিগুলো। কিছু জায়গায় যা ঢাকা পড়েছে গাছের আড়ালে। বাতিগুলো শেষ কবে জ্বলেছে তাও মনে করতে পারেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বলেন, পিটিসি-ঢাকার যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের কাজে গত দুই যুগে কয়েকটি প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু যানবাহন চলে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে ও সমন্বয়হীনতার কারণে কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। তবে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, স্বয়ংক্রিয় বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার যে কথাগুলো বলা হচ্ছে, এ শব্দটা অনেক ভারী। এর কার্যকরিতাও বিশে^র বিভিন্ন দেশে রয়েছে। আমাদের দেশের সড়কের যে ইকো সিস্টেম, তাতে স্বয়ংক্রিয়ের বিষয়টি প্রস্তুত নয়। এর জন্য প্রস্তুতি লাগে। প্রতিদিনই একসঙ্গে একই সড়কে চলাচল করছে উচ্চগতির-ধীরগতির রিকশা, ঠেলাগাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, বাস-লরি। দক্ষ চালকের বড় অভাব রয়েছে। সড়কগুলো যানজটমুক্ত করতে হলে কিছু পলিসি দরকার। তিনি বলেন, সড়কের সক্ষমতার সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যাগত মিল থাকতে হবে। যেসব যানবাহনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে, অর্থাৎ ২০ থেকে ৫০ বছর হয়েছে সেসব যানবাহন পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে। ট্রাফিক সিস্টেম স্বয়ংক্রিয় করতে হলে আগে থেকেই বিজ্ঞানসম্মত পলিসি গ্রহণ করতে হবে। সড়কে গাড়ির সক্ষমতা নিয়ে ভাবতে হবে। অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করে সড়কের যানজট নিরসন করা সম্ভব নয়। আমাদের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নীতির পরিবর্তন আনতে হবে। তবেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মনিবুর রহমান দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেমে যেতে আমাদের দুইটা প্ল্যান আছে। একটা অটোমেটিক সিস্টেমে যাওয়ার প্ল্যান আছে। এটা নিয়ে কাজকর্ম চলছে। এটা নিয়ে কমিটি হয়েছে। এটা পর্যালোচনার পর্যায়ে আছে। এটা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে। এটা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে মিটিং হচ্ছে। মিটিং থেকে সিদ্ধান্ত আসতে আরও কিছু সময় লাগবে। তারপর সেই মোতাবেক পাইলট আকারে চালু করার পর সেটা সার্থক হলে আমরা পরবর্তীতে সারাদেশে চালু করতে পারব। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালটি রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এর প্রযুক্তিগত টেকনিক্যাল দিকগুলো তারা দেখবে, ম্যানপাওয়ারও তাদের। কাজেই এখানে মেইনটেন্যান্স ঠিক থাকলে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টটা আমাদের। এখানে ডুয়েল এডমিনিস্ট্রেশন। মো. মনিবুর রহমান বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে আইন ভঙ্গের দায়ে কোনো না কোনো যানবাহনের চালককে জরিমানা করছে ট্রাফিক পুলিশ। প্রতিদিন আমাদের ৮টা বিভাগে প্রায় হাজার খানেকের মতো মামলা হয়। মাসে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার মামলা হয়।

এদিকে গতকাল বুধবার বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৭ এর অধীনে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়ক-মহাসড়কের এমন বিশৃঙ্খলায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০ বছরের পুরোনো বাস কীভাবে সড়কে চলাচল করে? সড়কে শৃঙ্খলা না ফিরলে দুর্ঘটনাও কখনোই কমবে না। সমতল থেকে পাহাড়ে আজকে সুন্দর সুন্দর রাস্তা। তারপরও শৃঙ্খলা আসে না। ওবায়দুল কাদের বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়িকে রাস্তা থেকে তুলে দিয়ে স্ক্রাপ হিসেবে ধ্বংস করবে প্রশাসন। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আজ থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। মন্ত্রী বলেন, ফিটনেস ঠিক রেখে গণপরিবহনগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করতে হবে। এসময় সড়ক পরিবহন ও শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান মেয়াদোত্তীর্ণ ও লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোকে ডাম্পিং নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসের সুপারিশ করেন।