➤কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়লেও তা যথেষ্ট মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা
➤কৃষিপণ্য রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাত খাতের জন্য তেমন সুবিধা রাখা হয়নি
➤উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষককে পড়তে হচ্ছে গ্যাঁড়াকলে
➤সার, সেচ ও কৃষি উপকরণের দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই
➤তিন মন্ত্রণালয়ে বাজেট বেড়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা
◈বাজেট খুব গতানুগতিক। বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও সেটি খুব অপ্রতুল- ড. জাহাঙ্গীর আলম, কৃষি অর্থনীতিবিদ
◈কৃষকদের উৎপাদন ও ফসল বিক্রির সমস্যা। তারা ন্যায্যমূল্য পায় না- ফরিদা আখতার, নির্বাহী পরিচালক, উবিনীগ
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্যনিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে বরাদ্দ বাড়লেও স্বস্তি নেই কৃষিতে। সদ্য বিদায়ি অর্থবছরের তুলনায় নতুন অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ৭ শতাংশ বরাদ্দ বেড়েছে, যার পরিমাণ ২ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। তবে সুখবর নেই কৃষিক্ষেত্রের কারিগর কৃষকের জন্য। কমানো হয়েছে ভর্তুকি। ক্রমবর্ধমান সার, সেচ ও কৃষি উপকরণের দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশে সারের দাম বেড়েছে ১০৫ শতাংশ। দাম বাড়ার তালিকায় আছে জ্বালানি তেল, বীজসহ সব কৃষি উপকরণ। এতে ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষককে পড়তে হচ্ছে গ্যাঁড়াকলে। কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও নেই কোনো বরাদ্দ। কৃষিপণ্য রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাত খাতের জন্যও তেমন কোনো সুবিধা রাখা হয়নি। এর মধ্যে তাপপ্রবাহ ও সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রিমাল কৃষিতে ক্ষত তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হুমকির মুখে কৃষি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কৃষকের উৎকণ্ঠার মধ্যে এসেছে নতুন বাজেট। আশা ছিল, কৃষকদের উদ্বেগ প্রশমনে নেই তেমন কিছু। তবে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে বরাদ্দ বাড়ানো ছাড়া আর তেমন কোনো সুখবর নেই। ভর্তুকিও গত অর্থবছরের মতো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারও কৃষিখাতের বাজেট গতানুগতিক। কৃষক ও কৃষি খাতের স্বার্থ রক্ষায় নতুন কিছু নেই।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩৮ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মন্ত্রণালয়ে বাজেট বেড়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে মোট বাজেটের মাত্র ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অথচ গত মে মাসে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
ভর্তুকি ও প্রণোদনায় বরাদ্দ আগের অর্থবছরের তুলনায় কম ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগির টেকসই জাত উন্নয়ন, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উৎপাদন দ্বিগুণ করার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন, খামারি ও জেলেদের সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত বাজেটে ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে কৃষকরা কতটুকু উপকৃত হবে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাজেট খুব গতানুগতিক। বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও সেটি খুব অপ্রতুল। আবার শস্যখাতের ভর্তুকি কমানো হয়েছে। এটি অনাকাক্সিক্ষত। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। কৃষি উৎপাদন বিঘ্নিত হবে। জলবায়ু নিয়ে কৃষি অনেক সমস্যায় রয়েছে। তারও কোনো খবর নেই। কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া হয় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। এটি ন্যূনতম এক শতাংশ হওয়া উচিত।
বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণার (উবিনীগ) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন, কৃষকদের উৎপাদন ও ফসল বিক্রির সমস্যা। তারা ন্যায্যমূল্য পায় না। ফসল সংরক্ষণও করতে পারে না টাকার অভাবে। সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড চড়া দামে সেসব কৃষিপণ্য কিনছে। বাজেটে এসব প্রতিরোধের জন্য কোনো উদ্যোগ নেই।
প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দেশের অর্থনীতিতে এ খাতের প্রত্যক্ষ অবদানের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। গত একযুগে কৃষি খাতে বাজেটে বরাদ্দ নেমেছে অর্ধেকে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিখাতের হিস্যা ছিল ১১ শতাংশের ঘরে।

























