০৫:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হাতুড়ির টুং-টাং শব্দে মুখরিত কামারপল্লী

কায়িক পরিশ্রমী এ পেশাজীবীদের চলছে হাপর টানা, পুড়ছে কয়লা ও জ্বলছে লোহা। হাতুড়ি পিটিয়ে কামার তৈরি করছেন গোশত কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম। কক্সবাজার শহরে চাউল বাজার সড়ককে কামার পল্লী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখন লোহা হাতুড়ির টুং-টাং শব্দে মুখরিত। হাতুড়ির আঘাতে তৈরি হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনে কাজের উপযুক্ত সামগ্রী, দা, বটি, চাকু, কুড়াল, ছুরি, চাপাতিসহ ধারালো সব যন্ত্রপাতি।

পবিত্র ঈদ-উল-আজহার (কোরবানি) ঈদকে সামনে রেখে কক্সবাজার শহরে কামাররা, দোকানে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন কামার পল্লীর শ্রমিকরা। সারা বছর কাজ সীমিত থাকলেও কোরবানির ঈদের এ সময়টাতে বেড়ে যায় তাদের কর্মব্যস্ততা। লোহালক্কড়ের শব্দ চারপাশ প্রকম্পিত করে চলেছে। কোলাহল ভেদ করেও তা শুনতে পাওয়া যায়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এমনই শব্দ পাওয়া যাচ্ছে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন কামারশালা (কামারের দোকান) থেকে।  ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ত্যাগের মহিমায় পশু কোরবানি দিয়ে থাকে মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের আশায়। তাই ঈদুল আজহা শুরুর আগেই পশু কোরবানির জন্যে চাকু, ছুরি, বটি ইত্যাদি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মুসলমানরা।

ঈদুল আজহার আর তো মাত্র ৪ দিন বাকি। এখন তড়িঘড়ি চলছে কোরবানির প্রস্তুতি। তার মধ্যেই বেড়েছে কামারদের ব্যস্ততা। একদিকে কোরবানির পশু কেনায় ব্যস্ত স্বচ্ছল পরিবারগুলো, অন্যদিকে প্রায় কয়েকগুণ বেশি সমানুপাতিক হারেই দা, বটি, চুরি কিংবা কুরবানির পশু কাবু করার  বটি, চুরি  তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কামাররা। ঈদ আসার ১০-১৫ দিন আগ থেকেই এই ব্যস্ততা বাড়ে। চলে ঈদের আগের শেষ রাত পর্যন্ত। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কক্সবাজার শহরের চাউল বাজার এলাকায় বেশ কয়েকটি কামার দোকান ঘুরে দেখা গেছে আগের তুলনায় কাজ বেড়েছে কামারীদের। অথচ সারা বছরই তাদের কাটে অলস সময়। দোকান ভাড়া, দোকানে পন্য সামগ্রির জন্য খরচ করা পুঁজি সব কিছু নিয়েই কোরবানির ঈদের জন্য একান্ত চিত্তে অপেক্ষার প্রহর গুণে কামার দোকানের মালিক ও কর্মচারীরা। পুরো বছর অত্যন্ত নিম্ন আয়েই তাদের কাটাতে হয় দিন। কেউ কেউ পাইকারি পণ্য দিয়ে কিছুটা অলস সময়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখার ও চেষ্টা করেন।

কোরবানির ঈদ ছাড়া বাকি ধান কাটার মৌসুমে কাঁচি তৈরি কিংবা কাঁচিকে ধাঁরালো করার কাজে কিছু উপার্জন হয় তাদের। দোকানিরা বলছেন, ঈদ আসায় তাদের ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে। তবে ঈদ মৌসুমে সকাল ৮টা থেকেই তাদের কর্মযজ্ঞ শুরু হয় আর চলে মধ্য রাত অব্দিও। এমনকি ঈদের আগের রাতেও তারা সারারাত অব্দি জেগে কাজ করেন। এ সময়ে কিছুটা মোটাদাগে ইনকাম কমবেশি সবারই হয়। আরও জানা যায়, সব কিছু মিলিয়ে ঈদ মৌসুমে তাদের ইনকাম ২০-৩৫ হাজারের মতো। তবে দিন প্রতি তার ২-৪ হাজার টাকার মতো উপার্জন হয়। কারো কারো এর চেয়ে কম বা বেশিও হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ছোট ও বড় ছুরি ধারালো করার কাজে কামাররা মজুরি নিচ্ছেন ৩০ টাকা আর বটি ১৩০ টাকা। কেউ কেউ ৫০-১০০ আবার বটি ১৫০ করেও নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। আবার একটি বটি কিনতে ক্রেতাদের ৭০০-৮০০ টাকার অংক গুনতে হয়। একই সঙ্গে একটি তৈরিকৃত নতুন দা কিনতেও সমপরিমাণ অর্থ গুনছেন ক্রেতারা। তবে টাকার অংক ঈদ মৌসুমে বেড়ে বা কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক কামাররা। কাজ অনুযায়ীই তারা মজুরি আদায় করেন। সময়ভেদে অর্থ বাড়িয়ে নেন না বলেই স্বীকার করছেন তারা। দেখা যায়, প্রায় সব কামারের দোকানেই লোহার সামগ্রী থরে থরে সাজানো। ক্রেতাদের অনেকে আবার নিজস্ব ধাতব পদার্থ নিয়ে আসছেন দা-বটি তৈরি করতে। কেউবা নিচ্ছেন কিনে। তবে দা বটির চাহিদা থাকা সারা বছরই। কোরবানি ঈদের আগ মুহুর্তে দা-বটির কেনাবেচা বাড়লেও নতুন মাত্রা যোগ করে নানা আকারের ছুরি, ধামা, রামদা ইত্যাদি সামগ্রী। সারা বছর বিক্রি না হওয়ায় ছুরি, ধামা, রামদা ইত্যাদি অল্প দাম হলেও ছেড়ে দেন বলেই জানা গেছে। এদিকে কামার পেশার চাহিদা কমছে দিন দিন। নতুন করে এ পেশায় আসছেন না নতুন কামাররা। সারা বছরের বিক্রিহীন সময় কাটানো, মৌসুমভিত্তিক ব্যবসায় সিমিত পরিসরে লাভ ইত্যাদি কারণে এই পেশার গুরুত্ব কমছে।

অন্যান্য বছরের তুলনায় মূল্য বৃদ্ধির কারণ জানাতে গিয়ে ব্যবসায়ী: কামার সিদুল কান্তি বলেন, পূর্বে প্রতি বস্তা কয়লা কামাররা ১০০-১১০ টাকায় কিনতেন। বর্তমানে বস্তাপ্রতি সেই কয়লা তারা কিনছেন ৮০০ টাকায়। আর লোহার দামও আগের তুলনায় অনেক বেশী। যদিও তার সাথে মজুরিও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা মূল্য বৃদ্ধি হওয়া স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন তিনি। আরেক ব্যবসায়ী বাদল দাশ বলেন, আমাদের কর্ম ব্যস্থতা বাড়লেও এখনো আশানুরূপ গ্রাহক নেই। হাতে ২/৩ দিন সময় মাত্র। আশানুরূপ সাড়া পাবো বলে মনে করি।

জনপ্রিয় সংবাদ

গণভোটের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে সমালোচনা, ব্যাখ্যা দিল প্রেস উইং

হাতুড়ির টুং-টাং শব্দে মুখরিত কামারপল্লী

আপডেট সময় : ০৫:৪৯:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

কায়িক পরিশ্রমী এ পেশাজীবীদের চলছে হাপর টানা, পুড়ছে কয়লা ও জ্বলছে লোহা। হাতুড়ি পিটিয়ে কামার তৈরি করছেন গোশত কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম। কক্সবাজার শহরে চাউল বাজার সড়ককে কামার পল্লী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখন লোহা হাতুড়ির টুং-টাং শব্দে মুখরিত। হাতুড়ির আঘাতে তৈরি হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনে কাজের উপযুক্ত সামগ্রী, দা, বটি, চাকু, কুড়াল, ছুরি, চাপাতিসহ ধারালো সব যন্ত্রপাতি।

পবিত্র ঈদ-উল-আজহার (কোরবানি) ঈদকে সামনে রেখে কক্সবাজার শহরে কামাররা, দোকানে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন কামার পল্লীর শ্রমিকরা। সারা বছর কাজ সীমিত থাকলেও কোরবানির ঈদের এ সময়টাতে বেড়ে যায় তাদের কর্মব্যস্ততা। লোহালক্কড়ের শব্দ চারপাশ প্রকম্পিত করে চলেছে। কোলাহল ভেদ করেও তা শুনতে পাওয়া যায়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এমনই শব্দ পাওয়া যাচ্ছে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন কামারশালা (কামারের দোকান) থেকে।  ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ত্যাগের মহিমায় পশু কোরবানি দিয়ে থাকে মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের আশায়। তাই ঈদুল আজহা শুরুর আগেই পশু কোরবানির জন্যে চাকু, ছুরি, বটি ইত্যাদি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মুসলমানরা।

ঈদুল আজহার আর তো মাত্র ৪ দিন বাকি। এখন তড়িঘড়ি চলছে কোরবানির প্রস্তুতি। তার মধ্যেই বেড়েছে কামারদের ব্যস্ততা। একদিকে কোরবানির পশু কেনায় ব্যস্ত স্বচ্ছল পরিবারগুলো, অন্যদিকে প্রায় কয়েকগুণ বেশি সমানুপাতিক হারেই দা, বটি, চুরি কিংবা কুরবানির পশু কাবু করার  বটি, চুরি  তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কামাররা। ঈদ আসার ১০-১৫ দিন আগ থেকেই এই ব্যস্ততা বাড়ে। চলে ঈদের আগের শেষ রাত পর্যন্ত। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কক্সবাজার শহরের চাউল বাজার এলাকায় বেশ কয়েকটি কামার দোকান ঘুরে দেখা গেছে আগের তুলনায় কাজ বেড়েছে কামারীদের। অথচ সারা বছরই তাদের কাটে অলস সময়। দোকান ভাড়া, দোকানে পন্য সামগ্রির জন্য খরচ করা পুঁজি সব কিছু নিয়েই কোরবানির ঈদের জন্য একান্ত চিত্তে অপেক্ষার প্রহর গুণে কামার দোকানের মালিক ও কর্মচারীরা। পুরো বছর অত্যন্ত নিম্ন আয়েই তাদের কাটাতে হয় দিন। কেউ কেউ পাইকারি পণ্য দিয়ে কিছুটা অলস সময়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখার ও চেষ্টা করেন।

কোরবানির ঈদ ছাড়া বাকি ধান কাটার মৌসুমে কাঁচি তৈরি কিংবা কাঁচিকে ধাঁরালো করার কাজে কিছু উপার্জন হয় তাদের। দোকানিরা বলছেন, ঈদ আসায় তাদের ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে। তবে ঈদ মৌসুমে সকাল ৮টা থেকেই তাদের কর্মযজ্ঞ শুরু হয় আর চলে মধ্য রাত অব্দিও। এমনকি ঈদের আগের রাতেও তারা সারারাত অব্দি জেগে কাজ করেন। এ সময়ে কিছুটা মোটাদাগে ইনকাম কমবেশি সবারই হয়। আরও জানা যায়, সব কিছু মিলিয়ে ঈদ মৌসুমে তাদের ইনকাম ২০-৩৫ হাজারের মতো। তবে দিন প্রতি তার ২-৪ হাজার টাকার মতো উপার্জন হয়। কারো কারো এর চেয়ে কম বা বেশিও হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ছোট ও বড় ছুরি ধারালো করার কাজে কামাররা মজুরি নিচ্ছেন ৩০ টাকা আর বটি ১৩০ টাকা। কেউ কেউ ৫০-১০০ আবার বটি ১৫০ করেও নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। আবার একটি বটি কিনতে ক্রেতাদের ৭০০-৮০০ টাকার অংক গুনতে হয়। একই সঙ্গে একটি তৈরিকৃত নতুন দা কিনতেও সমপরিমাণ অর্থ গুনছেন ক্রেতারা। তবে টাকার অংক ঈদ মৌসুমে বেড়ে বা কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক কামাররা। কাজ অনুযায়ীই তারা মজুরি আদায় করেন। সময়ভেদে অর্থ বাড়িয়ে নেন না বলেই স্বীকার করছেন তারা। দেখা যায়, প্রায় সব কামারের দোকানেই লোহার সামগ্রী থরে থরে সাজানো। ক্রেতাদের অনেকে আবার নিজস্ব ধাতব পদার্থ নিয়ে আসছেন দা-বটি তৈরি করতে। কেউবা নিচ্ছেন কিনে। তবে দা বটির চাহিদা থাকা সারা বছরই। কোরবানি ঈদের আগ মুহুর্তে দা-বটির কেনাবেচা বাড়লেও নতুন মাত্রা যোগ করে নানা আকারের ছুরি, ধামা, রামদা ইত্যাদি সামগ্রী। সারা বছর বিক্রি না হওয়ায় ছুরি, ধামা, রামদা ইত্যাদি অল্প দাম হলেও ছেড়ে দেন বলেই জানা গেছে। এদিকে কামার পেশার চাহিদা কমছে দিন দিন। নতুন করে এ পেশায় আসছেন না নতুন কামাররা। সারা বছরের বিক্রিহীন সময় কাটানো, মৌসুমভিত্তিক ব্যবসায় সিমিত পরিসরে লাভ ইত্যাদি কারণে এই পেশার গুরুত্ব কমছে।

অন্যান্য বছরের তুলনায় মূল্য বৃদ্ধির কারণ জানাতে গিয়ে ব্যবসায়ী: কামার সিদুল কান্তি বলেন, পূর্বে প্রতি বস্তা কয়লা কামাররা ১০০-১১০ টাকায় কিনতেন। বর্তমানে বস্তাপ্রতি সেই কয়লা তারা কিনছেন ৮০০ টাকায়। আর লোহার দামও আগের তুলনায় অনেক বেশী। যদিও তার সাথে মজুরিও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা মূল্য বৃদ্ধি হওয়া স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন তিনি। আরেক ব্যবসায়ী বাদল দাশ বলেন, আমাদের কর্ম ব্যস্থতা বাড়লেও এখনো আশানুরূপ গ্রাহক নেই। হাতে ২/৩ দিন সময় মাত্র। আশানুরূপ সাড়া পাবো বলে মনে করি।