১২:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জ্বালানির দাম নির্ধারণে নিয়মের তোয়াক্কা নেই

➤ বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয়ে দাম বাড়ানো হলেও কমে না সবসময়
➤ মানা হচ্ছে না দাম নির্ধারণ নীতিমালা
➤ জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব আছে -ম তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
➤ মূল্য নির্ধারণে প্রচুর পরিমাণে লুণ্ঠনমূলক মূল্যের সংযোজন হয় -এম শামসুল আলম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও বাড়ানো হয়। কিন্তু কমে গেলে সবসময় কমানো হয় না। এই মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এদিকে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করছে সরকার। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে নীতিমালা মানা হচ্ছে না। নীতিমালা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে কমানো এবং বাড়ানোর কথা। তা না করে তেল বিক্রিতে নির্দিষ্ট লাভের চেয়ে বেশি রাখা হচ্ছে। সরকার তার নিজের করা নীতি নিজেই মানছে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি প্রাইস সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও সেই প্রভাব দেশের বাজারে পড়েনি। মে মাসের শুরুতে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ছয় ডলার কমলেও দেশের বাজারে সেই চিত্রটা উল্টো। ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববাজারে গড়ে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ৮০ ডলার। সেই ফর্মুলা অনুসারে প্রথমবার দেশে ডিজেলের দাম ১০৯ টাকা থেকে কমিয়ে ১০৮ টাকা, পেট্রোলের দাম ১২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১২২ টাকা ও অকটেনের দাম ১৩০ টাকা থেকে কমিয়ে ১২৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মার্চ মাসে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য ছিল ৮৩.৫ ডলার, সে অনুসারে এপ্রিল মাসে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বিগত মাসের তুলনায় ডিজেলে ২ টাকা কমানো হয়। পেট্রোল (১২২ টাকা) ও অকটেনের (১২৬ টাকা) দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। এপ্রিল মাসে বিশ্ববাজারের তেলের দাম কিছুটা বেড়ে পৌঁছায় ৮৮ ডলারে। সে অনুসারে মে মাসে ডিজেলের দাম ১ টাকা, পেট্রোলের দাম ২ টাকা ৫০ পয়সা ও অকটেনের দাম ২ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত লাভ রেখে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে প্রতিমাসে জ্বালানি তেল এবং এলপি গ্যাসের দাম ঠিক করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই দুই পণ্যই সাধারণত এক সাথে বাড়ে বা কমে। কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে দুটি পণ্যেরই দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় এলপি গ্যাসের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু একই প্রেক্ষাপট হলেও পর পর দুই মাস জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বিইআরসির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা উচিত জানিয়ে ম তামিম বলেন, নীতিমালা বিইআরসির কাছে দিয়ে দিলে সেই অনুযায়ী তারা দাম নির্ধারণ করলে এনিয়ে প্রশ্ন থাকবে না। যেমন এলপি গ্যাসের দাম ঠিক করছে তেমনি জ্বালানি তেলেরটাও করতে পারে। ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকায় উৎপাদনকারী দেশ সৌদিআরব কিছু প্রকল্প পুনমূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে দাম কমানো হয়নি। জ্বালানি তেলে ভর্তুকি প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতেই বিশ্ববাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। যদিও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রভাব ফেলে মূল্যস্ফীতিতে, বেড়ে যায় জীবনযাত্রার খরচ। যদিও সে সময় বলা হয়েছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

দেশে জ্বালানি তেলের আমদানি ও বাজারজাতকরণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমা সত্ত্বেও দেশের বাজারে কেন কমেনি, এর কারণ হিসেবে ওঠে এসেছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলারের দামে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও বিপিসির আরও স্বস্তিদায়ক মূল্য ফর্মুলাটা নির্ধারণের সুযোগ ছিল। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকরা আরও কম দামে জ্বালানি তেল ক্রয়ের সুযোগ পেতেন। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, যেভাবে তারা মূল্য নির্ধারণ করে, সেখানে প্রচুর পরিমাণে লুণ্ঠনমূলক মূল্যের সংযোজন হয়। সুতরাং, এটি দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষা করা যাবে না; বরং জনগণকে লুণ্ঠন করার আরও একটি মাত্রা যোগ হবে।

জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব আছে বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম। তিনি বলেন, তেলের দাম নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে কোন প্রেক্ষাপটে কত দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে তা স্বচ্ছ নয়। কেন কীভাবে দাম নির্ধারণ হচ্ছে তা স্বচ্ছ নয়। নীতিমালা অনুযায়ী ডিজেল কেরোসিনের চেয়ে পেট্রোলের দাম ১০ টাকা বেশি রাখার কথা। কিন্তু প্রথম থেকেই সে নিয়ম মানা হয়নি।

জনপ্রিয় সংবাদ

আপিল শুনানির অষ্টম দিনে ৪৫ আবেদন মঞ্জুর করল ইসি

জ্বালানির দাম নির্ধারণে নিয়মের তোয়াক্কা নেই

আপডেট সময় : ০৬:১৭:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুলাই ২০২৪

➤ বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয়ে দাম বাড়ানো হলেও কমে না সবসময়
➤ মানা হচ্ছে না দাম নির্ধারণ নীতিমালা
➤ জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব আছে -ম তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
➤ মূল্য নির্ধারণে প্রচুর পরিমাণে লুণ্ঠনমূলক মূল্যের সংযোজন হয় -এম শামসুল আলম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও বাড়ানো হয়। কিন্তু কমে গেলে সবসময় কমানো হয় না। এই মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এদিকে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করছে সরকার। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে নীতিমালা মানা হচ্ছে না। নীতিমালা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মিল রেখে কমানো এবং বাড়ানোর কথা। তা না করে তেল বিক্রিতে নির্দিষ্ট লাভের চেয়ে বেশি রাখা হচ্ছে। সরকার তার নিজের করা নীতি নিজেই মানছে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি প্রাইস সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও সেই প্রভাব দেশের বাজারে পড়েনি। মে মাসের শুরুতে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ছয় ডলার কমলেও দেশের বাজারে সেই চিত্রটা উল্টো। ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববাজারে গড়ে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ৮০ ডলার। সেই ফর্মুলা অনুসারে প্রথমবার দেশে ডিজেলের দাম ১০৯ টাকা থেকে কমিয়ে ১০৮ টাকা, পেট্রোলের দাম ১২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১২২ টাকা ও অকটেনের দাম ১৩০ টাকা থেকে কমিয়ে ১২৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মার্চ মাসে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য ছিল ৮৩.৫ ডলার, সে অনুসারে এপ্রিল মাসে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বিগত মাসের তুলনায় ডিজেলে ২ টাকা কমানো হয়। পেট্রোল (১২২ টাকা) ও অকটেনের (১২৬ টাকা) দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। এপ্রিল মাসে বিশ্ববাজারের তেলের দাম কিছুটা বেড়ে পৌঁছায় ৮৮ ডলারে। সে অনুসারে মে মাসে ডিজেলের দাম ১ টাকা, পেট্রোলের দাম ২ টাকা ৫০ পয়সা ও অকটেনের দাম ২ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত লাভ রেখে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে প্রতিমাসে জ্বালানি তেল এবং এলপি গ্যাসের দাম ঠিক করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই দুই পণ্যই সাধারণত এক সাথে বাড়ে বা কমে। কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে দুটি পণ্যেরই দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় এলপি গ্যাসের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু একই প্রেক্ষাপট হলেও পর পর দুই মাস জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বিইআরসির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা উচিত জানিয়ে ম তামিম বলেন, নীতিমালা বিইআরসির কাছে দিয়ে দিলে সেই অনুযায়ী তারা দাম নির্ধারণ করলে এনিয়ে প্রশ্ন থাকবে না। যেমন এলপি গ্যাসের দাম ঠিক করছে তেমনি জ্বালানি তেলেরটাও করতে পারে। ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকায় উৎপাদনকারী দেশ সৌদিআরব কিছু প্রকল্প পুনমূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে দাম কমানো হয়নি। জ্বালানি তেলে ভর্তুকি প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতেই বিশ্ববাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। যদিও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রভাব ফেলে মূল্যস্ফীতিতে, বেড়ে যায় জীবনযাত্রার খরচ। যদিও সে সময় বলা হয়েছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

দেশে জ্বালানি তেলের আমদানি ও বাজারজাতকরণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমা সত্ত্বেও দেশের বাজারে কেন কমেনি, এর কারণ হিসেবে ওঠে এসেছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলারের দামে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও বিপিসির আরও স্বস্তিদায়ক মূল্য ফর্মুলাটা নির্ধারণের সুযোগ ছিল। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকরা আরও কম দামে জ্বালানি তেল ক্রয়ের সুযোগ পেতেন। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, যেভাবে তারা মূল্য নির্ধারণ করে, সেখানে প্রচুর পরিমাণে লুণ্ঠনমূলক মূল্যের সংযোজন হয়। সুতরাং, এটি দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষা করা যাবে না; বরং জনগণকে লুণ্ঠন করার আরও একটি মাত্রা যোগ হবে।

জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব আছে বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম। তিনি বলেন, তেলের দাম নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে কোন প্রেক্ষাপটে কত দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে তা স্বচ্ছ নয়। কেন কীভাবে দাম নির্ধারণ হচ্ছে তা স্বচ্ছ নয়। নীতিমালা অনুযায়ী ডিজেল কেরোসিনের চেয়ে পেট্রোলের দাম ১০ টাকা বেশি রাখার কথা। কিন্তু প্রথম থেকেই সে নিয়ম মানা হয়নি।