❖ ঋণ বিতরণ কমেছে ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ
❖ লেনদেন কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ
➤ ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে না পারলে মানুষের আস্থা হারাবে- ড. আহসান এইচ মনসুর, অর্থনীতিবিদ
দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর আর্থিক লেনদেনের জনপ্রিয় মাধ্যম এজেন্ট ব্যাংকিং। কয়েক বছর ধরে বেড়েছে এজেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা। তৃণমূলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ। বেড়েছে হিসাব ও আমানত। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কমেছে লেনদেন ও ঋণ বিতরণ। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মার্চের তুলনায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কমেছে ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। লেনদেন কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে এজেন্টগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল ৮৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। আর পরের মাস এপ্রিলে এজেন্টগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৭২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এপ্রিলে ঋণ বিতরণ কম হয়েছে ১৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
এছাড়া গত ডিসেম্বরে এক মাসের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, গত অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৭৫৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর আগের মাসে বিতরণ করা হয় ৮৫৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কমেছে ৯৯ কোটি টাকা। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ঋণ বিতরণের মধ্যে শহরের চেয়ে গ্রামে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ বেশি। তথ্য মতে, চলতি বছরের এপ্রিলে শহরের এজেন্টগুলো বিতরণ করেছে ২৪৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আর গ্রামের এজেন্টগুলো বিতরণ করেছে ৪৭৮ কোটি শূন্য ৪ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এপ্রিলে শহরের চেয়ে গ্রামে ঋণ বিতরণ বেশি হয়েছে ২৩৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ৭২ হাজার ৯৫৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। আর পরের মাস এপ্রিলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৬৭ হাজার ৪৫৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এপ্রিলে লেনদেন কমেছে ৫ হাজার ৪৯৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এসব লেনদের মধ্যে আবার শহরের তুলনায় গ্রামে লেনদেন অনেক বেশি হয়েছে। তথ্য মতে, চলতি বছরের এপ্রিলে শহরের এজেন্টগুলোতে লেনদেন হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর গ্রামের এজেন্টগুলোতে লেনদেন হয়েছে ৫১ হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এপ্রিলে শহরের চেয়ে গ্রামে লেনদেন বেশি হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৪৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৯৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আর পরের মাস এপ্রিল শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এপ্রিলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত বেড়েছে ৮৫০ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ৩১টি ব্যাংকে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সেবা চালু রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্টের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৮৩৫টি। আর পরের মাস এপ্রিল শেষে এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮৪০টিতে। এর মধ্যে শহরের এজেন্ট রয়েছে ২ হাজার ৫০৫টি এবং গ্রামে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শাখা রয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৫টি।
অপরদিকে, মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ছিল ২১ হাজার ৬১৩টি। আর এপ্রিল শেষে আউটলেটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৫১৭টিতে। এসব এজেন্ট ও আউটলেটের প্রায় অধিকাংশই গ্রামে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব ছিল ২ কোটি ২২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৩টি। আর পরের মাস এপ্রিল শেষে হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৩২ হাজার ১৪৭টিতে। সেই হিসাবে এপ্রিলে হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ৮৩ হাজার ১১৪টি। হিসাবগুলোর মধ্যে শহরের হিসাবের সংখ্যা ৩১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪ টি এবং গ্রামে রয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩টি হিসাব।
হঠাৎ করে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত ও ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন অর্থনীতিবিদরা। ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও তছরুপকে দায়ী করছেন তারা। সম্প্রতি বগুড়াসহ বেশ কিছু জেলায় ব্যাংক এজেন্ট ও আউটলেটের গ্রাহকের জমাকৃত আমানতের টাকা তছরুপের ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্রাহকরা উদ্বিগ্ন, এজেন্ট ব্যাংকে কমিয়েছে লেনদেন। চলতি বছর বরিশালের একজন বাসিন্দা অভিযোগ করছেন যে, সেখানকার একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার হিসেব থেকে ৯ লাখ টাকা ‘উধাও’ হয়ে গেছে। এ নিয়ে ব্যাংকের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও পুরো বিষয়টি উল্টো তার উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এর আগে গত বছর গ্রাহকের ৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন জনতা ব্যাংক শাহজাদপুর শাখার এক পিওন। চলতি বছরের মার্চে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার জনতা ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৫ কোটি টাকা উধাও হয়েছে- এখন খবর পাওয়া যায়। হরহামেশা এসব ঘটনা ঘটলেও অনেকটা উদাসীন দেখা গেছে এসব ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনার দায় ব্যাংক কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আস্থা হারাবে ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, নানা অনিয়মের কারণের গ্রাহকরা আস্তা হারাচ্ছে ব্যাংক খাতে। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে না পারলে মানুষের আস্থা থাকবে না। গুটিকয়েক অসাধু ব্যক্তির জন্য এই ব্যাংকিং বন্ধ হতে পারে না।
























